ঈদের ছুটিতে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে প্রাণের মেলা

ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যেন মানুষের ঢল নেমেছে। লাখো পর্যটক সমাগমে মুখোরিত কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, রাঙামাটি জেলার পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগে বিভিন্ন স্পটে উচ্ছ্বাসে মেতেছেন দর্শনার্থীরা। সিলেট এবং খুলনার বিভিন্ন কেন্দ্রেও উপচেপড়া ভিড়।

coxsbazar

সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে বিস্তারিত:

কক্সবাজার :  কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতেছেন পর্যটকরা। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেখা যায় অভাবনীয় দৃশ্য। সমুদ্রে গা ভাসিয়েছেন হাজারো পর্যটক। সৈকতজুড়ে নানা বয়সী নারী-পুরুষ-শিশুর অপূর্ব মিলনমেলা। ভাটার সতর্ক সংকেত হিসেবে লাল পতাকা থাকলেও অনেকে মানছেন না এ সংকেত। উদ্ধারকর্মীদের অবিরাম বাঁশির শব্দও নিবৃত্ত করতে পারছে না তাদের।

বর্ষা শেষে পর্যটকের পদভারে কক্সবাজার মুখরিত হয়ে ওঠায় হোটেল-মোটেল মালিকসহ পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আনন্দিত। পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রশাসনও গ্রহণ করেছে বাড়তি ব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বুধবার কক্সবাজারে আসতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই উপচেপড়া ভিড়। চার শতাধিক হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস পরিপূর্ণ। হোটেল-মোটেলগুলোকে বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে অনেকে হোটেল-মোটেলে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ছাড়াও ইনানীতে পাথরে সৈকত, হিমছড়ির ঝর্ণা, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, সীমান্ত শহর টেকনাফ, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরসহ জেলার অন্য পর্যটন স্পটগুলোতেও ভিড়।

পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করেছেন, কক্সবাজারে এ বছর ঈদের ছুটি দিয়েই পর্যটন মৌসুম চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি ওমর সোলতান জানিয়েছেন, ঈদের আগেই প্রায় ৭০ ভাগ কক্ষ বুকিং হয়েছে।

তিনি জানান, কক্সবাজার শহরে ছোট-বড় ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেলে এক লাখ মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যবসায়ীরাও নানাভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। সাজিয়ে তুলছেন তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

তারকা মানের হোটেল সি-গালের প্রধান নির্বাহী ইমরুল ইসলাম রুমি জানান, ‘ঈদের পরের দিন থেকে ৪ দিনের জন্য ৭০ ভাগ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। আশা করছি এখন থেকে পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকবে কক্সবাজার।’

কক্সবাজারে পর্যটন মোটেল লাবণীর ম্যানেজার রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বুধবার সকাল থেকে পর্যটকরা আসছেন।

সমুদ্রসৈকতের কিটকট (ছাতা) ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, সৈকতে পর্যটক আসায় তারা খুশি।

ঢাকার শাহজাহানপুর থেকে সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছেন ব্যবসায়ী শফিকুল করিম। তিনি জানান, পর্যটকের ভিড় থাকায় কিছু হোটেল ও গেস্টহাউস বেশি ভাড়া আদায় করছে।

জেলা প্রশাসক আলী হোসেন জানিয়েছেন, হোটেল-মোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পর্যটকদের ভিড়ের কারণে বেশকিছু বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ।

তিনি জানান, সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে পুলিশের নিরাপত্তা বলয় রয়েছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী সুপার রায়হান কাজমী জানিয়েছেন, সৈকতের ৩টি পয়েন্টে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। সেখান থেকে পর্যটকদের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।

kuakata-beach

কুয়াকাটা: দেশি-বিদেশি নানা বয়সের পর্যটকের আগমনে ১৮ কিলোমিটার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ।

ঈদের দিন থেকে শুক্রবার দিনভর সৈকতে যেন তিল ধরনের ঠাঁই ছিল না। আবাসিক হোটেল-মোটেল, খাবার ঘর ও শপিংমলসহ পর্যটনমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে।

এদিকে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে স্পটগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে বলে ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের সিনিয়র সহকারী সুপার মীর ফসিউর রহমান জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাখাইন মার্কেট, ঝিনুকের দোকান, খাবারঘর, চটপটির দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বাস, টেম্পো, প্রাইভেটকার, মাইক্রোতে দলে দলে পর্যটকরা আসছেন।

kuakata

দেখা গেছে, সৈকতে পাতা বেঞ্চ ও ছাতার নিচসহ বিভিন্ন পয়েন্টে নানা বয়সের মানুষ গল্প, গান আর আড্ডায় মেতে রয়েছেন। আবার কেউ কেউ সৈকতে ফুটবল ও হাডুডু খেলায়ও মেতে রয়েছে।

এ ছাড়া সৈকতলাগোয়া নারিকেল বাগান, ইকোপার্ক, জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার, সীমা বৌদ্ধবিহার, সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চল খ্যাত ফাতরার বনাঞ্চল, গঙ্গামতি, কাউয়ার চর, লেম্বুর চর, শুঁটকি পল্লী, লাল কাঁকড়ার চর, সৈকতের জিরো পয়েন্ট ও ইলিশ পার্কে শিশু কিশোরসহ নানা বয়সী পর্যটকের পদচারণায় এখন মুখরিত।

খুলনা থেকে কুয়াকাটায় এসেছেন এলিজাবেদ। তিনি বলেন, এখানকার সবকিছুই ভালো। এখন কুয়াকাটায় আসার জন্য যোগাযোগ আরও উন্নত হয়েছে। তবে বিভিন্ন দর্শনীয় স্পটে যাওয়ার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো একেবারেই অনুপযোগী। এ ছাড়া সৈকত আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর ছাত্রী মোনালিসা জানান, প্রথমবারের মতো কুয়াকাটায় এসেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সৈকতে রাতে কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই।

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট বোর্ড মালিক সমিতির পরিচালক হোসাইন আমির জানান, একের পর এক নৌ-তরীতে পর্যটকদের নিয়ে সমুদ্র ঘুরে দেখানো হচ্ছে। কুয়াকাটা ইলিশ পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, পর্যটকদের সমাগম বেড়েছে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরিফ জানান, পর্যটকদের আগমনে হোটেল-মোটেলগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে।

rangamati-brige

রাঙামাটি: জেলার পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে। ঝুলন্ত ব্রিজ, শুভলং ঝর্ণা আর কাপ্তাই হ্রদ ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। এ ছাড়া রাজবন বিহার, জেলা প্রশাসনের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিসৌধ, বালুখালী কৃষি খামার, টুকটুক ইকোভিলেজ, সাংপাং রেস্টুরেন্ট এবং আদিবাসী শান্ত-সবুজ গ্রাম ও তাদের জীবনযাত্রা আকর্ষণ করে পর্যটকদের।

রাঙামাটি শহরের বাইরে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মনোরম পর্যটন স্পট, কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা স্পট, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানেও ভিড় করছেন অনেকে। সরকারি পর্যটন নৌ-ঘাটের ইজারাদার রমজান আলী জানান, এবার ঈদের লম্বা ছুটিতে রাঙামাটিতে অনেক পর্যটকের আগমন ঘটেছে।

রাঙামাটি সরকারি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, বিশেষ করে ঝুলন্ত সেতুতে পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন।

sylhet-bichanakandi

সিলেট: পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নতুন করে জেগেছে সিলেট বিভাগের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। ভারতের মেঘালয় পর্বতের পাদদেশে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রকৃতিকন্যা জাফলং ভরে উঠেছে প্রাণের ছোঁয়ায়। বিছনাকান্দিতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট ও পান্তুমাইয়ের ফাটাছড়া ঝর্ণাধারাও হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর। জাফলং পর্যটন এলাকার কোথাও যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

সরেজমিন দেখা গেছে, পর্যটন এলাকার প্রবেশমুখ মামার বাজারের মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে বল্লাঘাট পর্যন্ত কয়েকশ’ পর্যটকবাহী গাড়ি, রাস্তাঘাট, রেস্টুুরেন্টের সম্মুখ ছাড়াও পাথর রাখার ফিল্ড ও ক্রাশার মেশিন জোন এলাকায়ও প্রচুর গাড়ি।

টাঙ্গাইল সদর এলাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আমিনুল ইসলাম জানান, জাফলংয়ে বেড়াতে এসে খুব ভালো লাগছে। তবে রাস্তার বেহাল দশা অনেকটা দুর্ভোগে ফেলে।

জাফলং পিকনিক সেন্টারের ইজারা গ্রহীতা সিরাজ আহমেদ জানান, খানাখন্দে ভরা রাস্তার কারণে জাফলংয়ে পর্যটকের আগমন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

জাফলং ছাড়াও ঈদের ছুটিতে মুখর সিলেটের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র বিছনাকান্দি, লালাখাল, লোভাছড়া, রাতারগুলের মতো অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থানগুলো। এসব এলাকায় মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ান পর্যটকরা। জৈন্তাপুরের লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর দুই ধারের অপরূপ সৌন্দর্য, দীর্ঘ নৌপথ ভ্রমণ পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কানাইঘাট উপজেলার প্রাকৃতিক নৈসর্গের আরেক রূপ লোভাছড়ায়ও পর্যটকরা ভিড় করছেন।

এ ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানে দেখা মেলে পর্যটকদের। শহরতলির লাক্কাতুরা, মালনীছড়া, দলদলি, খাদিম বরজানসহ বিভিন্ন চা বাগানে ছিল পর্যটকদের ভিড়।

দেশের একমাত্র জলারবন রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টেও ঢল নামে পর্যটকদের। সেখানে যাওয়ার রাস্তায় তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত। অনেক স্থানে পর্যটকদের যানবাহন আটকে থাকতে দেখা গেছে। ধোপাগুলের ব্যবসায়ী আলী কামাল বলেন, আল্লাহ জানেন কবে এ সড়ক মেরামত হবে।

এদিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, বড়লেখার মাধবকুণ্ড, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেও পর্যটকরা ভিড় করছেন। শ্রীমঙ্গলের শীতেশের চিড়িয়াখানায় যাচ্ছেন পর্যটকরা।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জে হাসন রাজার মিউজিয়াম দেখতে ভিড় করছেন পর্যটকরা। সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওর ছাড়াও বিভিন্ন হাওরে নৌবিহারেও বের হচ্ছেন অনেক পর্যটক। এদিকে হবিগঞ্জে দেশের দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যেও আছে পর্যটকদের ভিড়। হোটেল ও পর্যটন ব্যবসা প্রসঙ্গে নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার হোটেল নির্ভানা ইন-এর স্বত্বাধিকারী তাহমিন আহমেদ সমকালকে বলেন, এবার পর্যটক আসছেন বেশি।

khulna-rupsha-bridge

খুলনা : গতকাল বিকেলে তিল ধারণের জায়গা ছিল না খুলনার বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। অনেকে ভিড় জমান রূপসা সেতুতে। ভিড় ছিল জাহানাবাদ সেনানিবাসের চিড়িয়াখানা, নগরীর ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্ক, এসএস ওয়ার্ল্ড শিশু পার্ক এবং জাতিসংঘ শিশু পার্কের ঈদ মেলায়।

রূপসা সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। রিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা রাত ১১টা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান।

khan-jahan-ali-bridge

সেতুতে বেড়াতে আসা শাকিব ও তার বান্ধবী নাজনীন বলেন, ছুটি পেলেই রূপসা সেতুতে বেড়াতে আসি। আর এখন ঈদের সময় বন্ধুরা মিলে বেড়াতে এসেছি। তীরে ঠাঁই না পেয়ে অনেককে দেখা গেল নদীতে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতে। ফরেস্ট ঘাট এলাকায়ও মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.