এই মাত্র:

কঠোর কর্মসূচিহীন নিস্তরঙ্গ রাজনীতির বছর ২০১৬

সিটিজিবার্তা নিউজ ডেস্ক  ।  বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬

২০১৬ সালে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি সরকারকে। সংঘাতময় আন্দোলনে যায়নি বিরোধী দলগুলো। প্রধান বিরোধী দলসহ কোনো রাজনৈতিক দলই কোনো হরতাল পালন করেনি। তবে বছরজুড়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নানা ধরনের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ কর্মসূচি নতুন একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অন্য বছরগুলোর তুলনায় বিদায়ী বছরে রাজনীতির মাঠ অনেক শান্ত ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সংগঠন গোছানোয় ব্যস্ত থেকেছে। তবে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। ২০১৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলির দিকে আরেকবার ফিরে তাকানো হয়েছে কয়েকটি প্রতিবেদনে

তবে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের কঠোর কর্মসূচিহীন নিস্তরঙ্গ রাজনীতি সত্ত্বেও ২০১৬ সালে ভিন্ন এক অস্থিরতার জন্ম দেয় জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর উত্থান। এসব সংগঠনের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে ভিন্নধর্মাবলম্বী, সংখ্যালঘুসহ ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ, ব্লগার ও বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিসহ বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বারবার রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান এবং এ বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক ও কঠোর মনোভাব ছিল বিদায়ী বছরের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বছরজুড়ে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল রাজনীতির মাঠ।

জনমনে স্বস্তি ছিল, ছিল হতাশাও: বিদায়ী বছরের রাজনীতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজনৈতিক হানাহানি ছিল না। হরতাল-অবরোধ হয়নি। মানুষ তুলনামূলক শান্তি ও স্বস্তিতে ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য চলেছে অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে।

তবে একপেশে রাজনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা ছিল। বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন বা তাদের সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার বিষয়টি অনেকেই পছন্দ করেনি। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কথা উঠলেও রাজনৈতিক বিভাজনের উপরে উঠে কোনো দলই সে পথে হাঁটেনি।

জাতীয় সংসদ ছিল অনেকটাই নিষ্প্রাণ। আগের বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদকে ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা’ বলার পর সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং এ বছর এরই ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক অনুদান পাওয়া বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য কঠোর আইন করা হয়।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বছরভর সমালোচনার মুখে ছিল। পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত পদে থাকা, বিরোধী দলের নেত্রী রওশন এরশাদের ভূমিকা, এরশাদ-রওশনের তুমুল বিরোধ ও তা মিটিয়ে ফেলা এবং বিরোধী দলের সাংসদদের মন্ত্রী হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই দলের নেতাদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত ছিল।

পরিবেশবাদী ও শিক্ষক আন্দোলন: জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বা রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি গত বছর সেই অর্থে কোনো দাবি নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি। তবে এই সময়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনই ছিল দেশের অন্যতম আন্দোলন। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে সুন্দরবন তথা পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা ঘিরে গড়ে ওঠে এই আন্দোলন। এর সঙ্গে ইউনেসকোর প্রতিবেদন আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে এমন হুমকিও দেয়া হয় যে, রামপাল প্রকল্প বাদ দেওয়া না হলে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সুন্দরবন বাদ পড়তে পারে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টিও ছিল বছরজুড়ে বিশেষভাবে আলোচনার বিষয়। বেতন সর্বোচ্চ শতভাগ বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় সবাই খুশি হয়েছেন। তবে বাংলাদেশের ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষকেরা বেতন বৈষম্য এবং জাতীয় বেতনকাঠামোতে তাঁদের মর্যাদাহানির অভিযোগ তুলে আন্দোলন ও ক্লাস বর্জন করেছেন। শেষ পর্যন্ত সরকার তাঁদের দাবি মেনে নেয়।

জঙ্গিবাদ ঘিরে দোষারোপের রাজনীতি: বিদায়ী বছরের রাজনীতির আলোচনায় ঘুরেফিরে ছিল জঙ্গিবাদ। একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনায় দেশে-বিদেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশিরা বাংলাদেশ ছাড়তে শুরু করেন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নেমে আসে একধরনের স্থবিরতা। বিশেষ করে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনায় ১৭ জন বিদেশিসহ ২২ জন নাগরিক, ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান। অভিযানে নিহত হয় ৫ জন হামলাকারী।

ওই ঘটনার পর বাংলাদেশে আইএস আছে কি নেই—সেই বিতর্ক জোরদার হয়, যা এখনো চলছে। খোদ আইএসের পক্ষ থেকে এ দেশে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণের নানা চেষ্টা হয়েছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে জোর গলায় এ দেশে আইএস নেই বলা হচ্ছে। তবে সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী বলেছেন, এ দেশে বেড়ে ওঠা জঙ্গিরা আইএসের মতাদর্শের অনুসারী।

বছরভর রাজনৈতিক বিতর্কও হয়েছে জঙ্গিবাদ ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের অনেকেই জঙ্গি হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সরকারকে দায়ী করেছে।

সভা-সমাবেশ নিয়ে বছরভর বিতর্ক: সভা-সমাবেশের অনুমতি চাওয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রধান বিরোধী দলের ‘রাজনৈতিক নাটক’ চলেছে বছরের বিভিন্ন সময়ে। সর্বশেষ বিএনপি ৭ নভেম্বর উপলক্ষে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করতে চেয়েও অনুমতি পায়নি। অথচ এর কদিন আগেই সেখানে জাতীয় কাউন্সিল করেছে আওয়ামী লীগ, যেখানে কয়েক হাজার র‍্যাব-পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর বিএনপি তাদের নয়াপল্টনের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েও পায়নি। অনুমতি না পেলেও বড় দল হিসেবে একটি সমাবেশ করতে না পারায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বছরজুড়ে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, নারায়ণগঞ্জ ব্যতিক্রম: বিদায়ী বছরের সব কটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রাণহানীর ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। কমিশন ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে এবং সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। তবে বছর শেষে ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ভালো হয়েছে। তবে বছরের একেবারে শেষে ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় সরকারি দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে নির্বাচনী আমেজ।

রাজনীতিতে আরও যেসব বিষয় আলোচিত: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আলোচনা ছিল বছরভর। ফাঁসি কার্যকর হয়েছে দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও ধনকুবের মীর কাসেম আলীর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা এবং গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়।

বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাউন্সিল হয়েছে বিদায়ী বছরে। মাঠে রাজনীতি না থাকলেও কাউন্সিলকেন্দ্রিক দলীয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চর্চা হয়েছে।

পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতু হত্যা, কুমিল্লা সেনানিবাসে তনু হত্যা, খাদিজাকে হত্যার ঘটনাগুলো অপরাধের গণ্ডি পার হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করার মুহূর্তে রানওয়েতে ধাতব বস্তু দেখতে পাওয়া, হাঙ্গেরি সফরে যাওয়ার পথে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা হয়েছে।

বিদায়ী বছরে সরকারের দুই মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও আ ক ম মোজাম্মেল হককে আদালত অবমাননার দায়ে সাজা দেওয়া হয়। দুর্নীতির মামলায় আরেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া উচ্চ আদালতের রায়ের পর বিপাকে পড়েন। এসব ঘটনায় এই তিন মন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিদায়ী বছরে বিচার বিভাগের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়েছে। রুবেল হত্যা মামলার এক যুগের বেশি সময় পর উচ্চ আদালত ৫৪ ধারা বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন। উচ্চ আদালতে বিচারকদের অপসারণ নিয়ে একটি আইন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলেও তা আটকে গেছে। সরকার ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন বক্তব্যে একধরনের দূরত্ব আঁচ করা যাচ্ছে।

সংলাপে স্বস্তি, তবে সুফল নিয়ে সংশয়: বছর শেষে একটি রাজনৈতিক সংলাপ রাজনীতিতে একধরনের স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। গত তিন বছর সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের যে দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েই চলছিল, তাতে লাগাম টেনেছে ওই সংলাপ, যদিও এর সুফল নিয়ে সংশয় আছে কারও কারও মধ্যে। তবে এই সংলাপের মাধ্যমে আলোচনার বরফ গলতে শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image