গ্রাম বনাম নগরায়ন

সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮

কামরুল হাসান

গ্রাম বনাম নগরায়ন

কামরুল হাসান

“এমন দেশটি কোথাও
খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী সেজে
আমার জন্মভ‚মি…”

আসলে আমি আমার প্রিয় জন্মভুমি ধলঘাটার কথাই বলছিলাম। গানের কলির আবেগ ধরেই বলছি ধলঘাটার এই রূপ, এই গন্ধ আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তার ম‚ল কারণ – কোথাও কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ তাপ কেন্দ্র হচ্ছে, আবার কোথাও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে, কোথাও পেট্রোলিয়াম পাইপ কিংবা গ্যাস লাইন যাচ্ছে, শুনছি সমুদ্র বন্দর ও হতে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে হয়তো দুবাই সিঙ্গাপুরের মত আলোকিত হয়ে উঠবে আমাদের ধলঘাটা, হয়তো মানুষের জীবন যাত্রার আমুল পরিবর্তন হবে, কিংবা এলাকার অধিকাংশ মানুষ কর্মজীবি কিংবা ব্যবসা গড়ে তোলবে কেউ কেউ। উঁচু উঁচু দালান করবে কিংবা লাল নীল সাদা রঙ এর প্রাইভেট গাড়ি হাকাবে।

মোদ্দাকথা গ্রাম রুপ নেবে আধুনিক নগরীতে কি মহা খুশি!!! কিন্তু চলে যাবে আমার বাব দাদার শত কষ্টে গড়া, ভিটা বাড়ী কিংবা শত বছরের বটবৃক্ষ যে বৃক্ষের ছায়ায় বসে ক্লান্ত মানুষ গুলো বিশ্রাম নিতো, ম্লান হয়ে যাবে বৃক্ষের ডালে ডালে পাখির সব কলরব আর শীতল পরশ।

বাপ দাদার জমিতে যে রূপালী রং এর লবন চাষে মাঠের পর মাঠ মনে হত এক অপরূপ সাদা বিছানার চাঁদর। বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে আমাদের জীবন জীবিকার সেই অপরূপ লবনের মাঠ।

শুনতে পাবোনা কোহেলিয়ার নদীর প্রাণ বন্ত স্রোতের কলধনী। হারিয়ে যাবে সাগরের আসল গর্জন। দেখতে পাবোনা সমুদ্র পাড়ের চিক চিক বালির মাঝে লাল কাকড়ার দৌঁড়ঝাপ।
শুনতে পাবোনা সারি সারি গাংচিলের কোলাহল, আর দেখতে পাবোনা মনরোম মাছ ধরা দৃশ্য। ভেসে আসবেনা পাল তোলা চলমান নৌকা থেকে মাঝির সুরেলা কন্ঠে ভাটিয়ারী গানের সুর কিংবা হৃদয়নিংড়ানো বাসির সুর।

দেখবোনা জেলেদের জালে ধরা জ্যান্ত মাছের লাফালাফি। চিংড়ী ঘেরে বসবেনা আর সাদা সাদা বক প¶ি কিংবা পানকড়ি মাছ শিকারের জন্য।

চোখে পড়বেনা বড় বড় বাগদা চিংড়ী আর নানান মাছের নৃত্যের অপরূপ দৃশ্য। দেখতে পাবোনা সাত সাগর পাড়ি দিয়ে অতিথি পাখির আগমন। পারবোনা ইচ্ছে করলেও নদীতে সাঁতার কাটতে কিংবা বৈঠা ধরে নৌকা চালাতে। সব অতীত হবে—

বিলুপ্ত হয়ে যাবে গ্রাম বাংলার আবহমান বৈশাখী মেলা, হারিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় ঘুড়ি উড়া, ইচ্ছে করবেনা প্রিয় লাটিম টি ঘুরাতে। প্রিয় বন্ধুর সাথে ঝগড়া হবেনা মারবেল খেলতে গিয়ে কিংবা ডাংগুলি খেলা নিয়ে।

এইভাবেই আমাদের প্রিয় গ্রাম বাংলার হাজার হাজার বছরের লালিত সুখময় বৈচিত্রময় ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে শুধু মাত্র নগরায়নের কারণে।

পৃথিবীর সাথে পাল্লা দিতে দরকার নগরায়ন। কারণ যুগে যুগে কালে কালে যে দেশ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্পায়নে ভাল করেছে সেই দেশ এবং সেই দেশের জাতি তত বেশি উন্নত হয়েছে।

আবার প্রাণ, উচ্ছাস, প্রকৃতি, প্রেম ভালবাসা ছাড়া মানুষ বেশিদিন প্রশান্তি নিয়ে বাঁচতে পারেনা। আর সেই ভালবাসা রয়েছে বাংলার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে আর প্রকৃতির মাঝে।
একদিকে নগরায়ন! আরেকদিকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য! আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় দুটির মধ্যে কোনটা চাই? উত্তরে বলব দুটাই চাই- নগরায়নের মধ্যে গ্রাম,
আর গ্রামের মধ্যেই নগরায়ন।

চেয়ারম্যান, ধলঘাটা ইউনিয়ন,
মহেশখালী, কক্সবাজার।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.