ছোট ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ বড় ভাইয়ের ওপর!

জোরে গাড়ির হর্ন বাজানোর জেরে চট্টেশ্বরীতে যুবক খুন

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম নিউজ ডেস্ক

মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮

ছোট ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ বড় ভাইয়ের ওপর!

চট্টগ্রাম : ছোট ভাইয়ের সাথে দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ নেয়া হল বড় ভাইয়ের ওপর। গত রোববার রাতে বাড়ির কাছে পিতার সামনে খুন হন মো. অনিক (২৬) নামে এক যুবক। রাত ১০ টার দিকে শহরের চট্টেশ্বরী মোড়ে মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটে। গাড়ির হর্ন জোরে বাজানো নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। নিহত যুবক নগরীর দামপাড়া পল্টন রোডের বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের ছেলে। পেশায় গাড়িচালক হলেও নগর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ছিল তার।

গতকাল সোমবার নিহত মো. অনিকের (২৬) বাবা বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন– মহিউদ্দীন তুষার (৩০), মিন্টু (৩২), ইমরান শাওন (২৬), ইমন (১৬), শোভন (২৪), রকি (২২), অপরাজিত (২২), অভি (২১), বাচা (২২), এখলাস (২২), দুর্জয় (২১) এবং অজয় (২১)। আসামিদের গ্রেফতার করতে পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযানে নেমেছে ।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসিন জানান, অনিকের ছোট ভাই রনিক রোববার বিকালে মোটরসাইকেল নিয়ে ব্যাটারি গলিতে ঢোকার সময় জোরে হর্ন দেন। এ নিয়ে স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও মারামারি হয় তার। পরে পুলিশ গেলে উভয়পক্ষ সরে যায়। তুচ্ছ এ ঘটনার জের ধরে ওই এলাকার তুষার, ইমনসহ ১০–১২জন যুবক সংঘবদ্ধ হয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রায় ১৫টি মোটর বাইকে করে অনিকের বাড়ির কাছে চট্টেশ্বরী মোড়ে আসেন। সেখানে অনিকের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় তুষার প্রকাশ্যে রিভলবার থেকে গুলি ছুড়তে থাকলে উপস্থিত অনিকের বাবা নাছিরসহ এলাকার অন্যান্যরা তাকে নিবৃত করার চেষ্টা চালান। এমন সময় তুষারের এক সহযোগী অতর্কিতভাবে অনিকের বুকের বাম পাশে ছুরি ঢুকিয়ে দিলে অনিক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক মো. আমির জানিয়েছেন, ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর অনিকের বাবা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ব্যাপারে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, এটা তাৎক্ষণিক একটি হত্যাকান্ডের ঘটনা। এটার সাথে রাজনৈতিক কোন ঘটনা জড়িত নেই বলে আমরা ধারণা করছি।

তিনি আরো বলেন, যারা হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে তারা মূলত এলাকায় বখাটে টাইপের ছেলে। কোন কোন সময় এরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করত কিন্তু ঘনিষ্টভাবে তারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় বিকেল ৫টার দিকে। এই সময় স্থানীয় চট্টেশ্বরী পল্টন রোড এলাকায় গাড়ির হর্ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে রনিকের সাথে তুষার নামের এক যুবকের কথা কাটাকাটি হয়। পুলিশ বিকেলে সমাধান করে দিলেও তুষার গ্রুপ তা মানে নি। তাই প্রতিশোধ নিতে রাত সাড়ে নয়টার দিকে ১৫–২০ জন যুবক মোটরবাইক যোগে এসে বেটারিগলির পল্টন সড়কের মুখে অবস্থান নিয়ে এ হামলা চালায়।

পুলিশের তথ্য মতে অনিক হত্যায় অভিযুক্ত মো. মহিউদ্দিন তুষার একই এলাকার ব্যাটারি গলির বাসিন্দা। তার পাসপোর্টে মালয়শিয়ার ভিসা আছে এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তার মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে। যদি অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া না হয় তাহলে সে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, তুষার–ঈমনরা মারামারির মধ্যে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। এতে লোকজন সরে গেলে তারা অনিককে ছুরি মারে।

তিনি বলেন, তুষার নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করেন। তবে সংগঠনে তার কোনো পদ নেই। গিয়াস আরো জানান, আমাদের এলাকায় এমন ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। যে ছেলেটিকে আজ হত্যা করা হয়েছে তার বাবা পরিশ্রম করে সন্তানকে বড় করেছেন।

নিহতের পিতা নাছির উদ্দিন চকবাজার থানা আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত প্রাণ সদস্য উল্লেখ করে কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন বলেন, যে ছেলেগুলো এমন হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তারা কেউই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান নয়। অথচ তাদের সবার কাছে দামি মোটর বাইক, দামি মোবাইল। তারা প্রতি মাসে দেশের বাইরে গিয়ে ফেসবুকে লাইভও দেয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়রা জানান, মহিউদ্দিন তুষার চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী নেতার অনুসারী পরিচয় দিয়ে এক ঝাঁক মোটর সাইকেলসহ ছেলেদের নিয়ে চলাফেরা করতো।

তাদের বেশির ভাগ বাইকের কোন নাম্বার প্লেট নেই উল্লেখ করে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এরা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। ইতিপূর্বে তুষারের ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে নাছির ও তার ছেলে অনিক এলাকাবাসীর সাথে প্রতিবাদে শরীক হয়েছিলেন। তাই স্থানীয় অনেকেই সন্দেহ করছেন, মাদকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সাথে মিলিত হওয়ায় গাড়ির হর্ণ বাজানোকে অজুহাত দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবেই অনিককে হত্যা করা হয়েছে।

নগর যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এক নেতা জানিয়েছেন, এ খুনের পেছনে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা থাকতে পারে। যেস্থানে অনিক খুন হন সেখানে প্রায় সময় অনিক বন্ধুদের সাখে আড্ডা মারেন। তিনি বলেন, তুষার নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করেন। আসলে সে সংগঠনের কেউ নয়। কোন নেতার অনুসারী কিংবা সমর্থকও নয় সে। সে একজন সন্ত্রাসী। আর এটার সাথে রাজনৈতিক কোন ইস্যুও জড়িত থাকতে পারে না বলে দাবি করেছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুর জহুর আহম্মদ চৌধুরীর সন্তান জসিম উদ্দিন জানান, সম্প্রতি এই পল্টন রোড়ের মুখে কিছু উঠতি ছেলেদের আড্ডা লক্ষ্য করা গেছে। ওরা কারা, কি তাদের পেশা সেই ব্যাপারে আমরাও ভালো করে বলতে পারিনা। অথচ তারা কিনা নিজেদের বিভিন্ন আওয়ামী সংগঠনের নেতা পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। নিহত অনিক সম্পর্কে জসিম উদ্দিন বলেন, ছেলেটি অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিল। তার বাবাও গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করে ঘর চালিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জোর দাবি জানান।

এদিকে গতকাল বিকালে অনিকের জানাজা সম্পন্ন হয়। নগরীর লালখান বাজারে আলাদি জমিদার মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ওই জানাজায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের বিভিন্ন সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি অনিকের স্বজন ও শুভাকাঙ্খীদের ঢল দেখা যায়।

জানাজায় অংশগ্রহণ করেন কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যরিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী, শ্রমিক লীগের উপদেষ্টা শফর আলী, নগর আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল লতিফ টিপু, নগর যুবলীগের যুগ্ম–আহবায়ক ফরিদ মাহমুদ, হেলাল উদ্দিন তুফান, কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিন, এস এম সাইফুদ্দিন, জসিম উদ্দিন চৌধুরী, দিদারুল আলম দিদার, হাসান মনছুর, মো. ওয়াসিম উদ্দিন, শ্রমিক লীগের আবুল হোসেন আবু আসিফ উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন দেলু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলে উদ্দিন সুজন প্রমুখ।

তথ্যসূত্র : দৈনিক আজাদী

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.