ব্রেকিং নিউজ:
Search

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ

বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

চারিদিকে রাবার বাগানে ঘেরা থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে কাঠের তৈরি ছোট একটি ঘর। সে ঘরে বসেই ২৮ বছর বয়সী ফাদেল এবং সঙ্গীরা প্রায়ই মাদক সেবন করে। অদ্ভুত এক মিশেলে এ মাদক তৈরি করা হয়। এর নাম ক্রাতোম।

এ মাদকের উপাদানের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় একটি গাছের পাতা, কফ সিরাপ, কোকা-কোলা এবং বরফ। এসব উপাদান একসাথে মিশিয়ে মাদক তৈরি করা হয়। ১০০ থাই বাথ অর্থাৎ প্রায় তিন ডলারে এ মাদক বিক্রি হয়।

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে মাদকের বিস্তার এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদক বিরোধী নানা তৎপরতার পরেও মাদকসেবীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

মাদকসেবী ফাদেল বলেন, ” আগে আমরা পাতাগুলো সিদ্ধ করে করে নিজেরাই এটা তৈরি করতাম। কিন্তু এখন আর সেটা করতে হয় না। এখন এটা আমরা সরাসরি কিনে সেবন করতে পারি।”

মাদকসেবী ফাদেল যেখানে দাঁড়িয়ে এ কথা বলছিলেন, তার আশপাশে কোকা-কোলার অসংখ্য ক্যান ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে। গত ১১ বছর ধরে মাদক সেবন করছে ফাদেল।তিনি নানা ধরনের মাদক সেবন করেন যার মধ্যে ইয়াবাও রয়েছে।


এ ধরনের ঘরে বসেই চলে মাদক সেবন

ফাদেলের মতো এ ধরেনর আরো বহু মাদকাসক্ত মানুষ আছে থাইল্যান্ডের মুসলিম অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলে আশি হাজার থেকে এক লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যেটি মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ। অধিকাংশ মাদকসেবীর বয়স ১৪ থেকে ত্রিশ বছর।

থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনীর হিসেব মতে পাট্টানি, ইয়ালা ও নরাথিওয়াথ এলাকায় মাদকের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। প্রতি পাঁচজন কিশোরের মধ্য একজন মাদকাসক্ত।

সাম্প্রতিক এক জরীপে দেখা গেছে, এসব এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণ মনে করেন মাদক হচ্ছে তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় সমস্যা। সেজন্য তারা চান সরকার যেন এ সমস্যার সমাধান করে।

গ্রামবাসীরা বিবিসিকে বলেন, এসব জায়গায় মাদকসেবীরা তাদের অর্থ জোগাড়ের জন্য এখন মরিয়া। তারা নানা ধরেনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। মাদকের এ সমস্যা সেখানকার সামাজিক এবং পারিবারিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অতীতে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ পাট্টানির মুসলমানদের ভেতর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে অনেক দাম্পত্য বিচ্ছেদ হতো। কিন্তু এখন মূল সমস্যা হচ্ছে মাদক।

পাট্টানি ইসলামিক কাউন্সিলের সেক্রেটারি আহামা হায়দারমী বলেন, ” এখন যদি কোন মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে, তখন তার বাবা-মা প্রথমেই জানতে চায় পাত্র মাদকাসক্ত কি না।”

ইসলামিক কাউন্সিল গত বছর ৫২৫টি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন পেয়েছে যার মধ্যে আশি শতাংশ মাদকাসক্তিকে কেন্দ্র করে।

কাউন্সিল বলছে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন আসলে তারা মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাতে কোন লাভ হয় না। নরাথিওয়াত একটি গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল। তিনি বিবিসিকে জানান, গত বছর তার ছেলে জাবেদ বিয়ে করেছিল।

কিন্তু সে বিয়ে চার মাসের বেশি টেকে নি। মাদকাসক্ত হবার কারণে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। নয় বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন ধরেনের মাদকের প্রতি তার ঝোঁক তৈরি হয়। একটু বড় হবার পরে সে মারিজুয়ানায় আসক্ত হয়ে পড়ে।

এরপর ইয়াবার প্রতি তার আসক্তি তৈরি হয়। মাদকাসক্তির হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে ১৬ বছর বয়সে তাকে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল।


মুসলিম কাউন্সিল অফিসে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন বাড়ছে

মাদকের এ থাবা কেন বিস্তৃত হচ্ছে সে বিষয়ে কোন ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই।

ইসলামিক সেন্টারের হায়দারমি বলেন, “আমি সৈন্যদের আগে জিজ্ঞেস করতাম কেন আমাদের এখানে মাদকের বিস্তার হয়েছে? কিন্তু তাদের কাছে কোন উত্তর ছিল না।”

মাদকের বিস্তার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা

থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী বলছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা থাকায় তারা মাদক সমস্যার দিকে খুব একটা নজর দিতে পারছে না। কারণ বেশিরভাগ সময় তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়।

২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল দেশটির মন্ত্রী পরিষদে এক দেয়া এক গোপন প্রতিবেদনে বলেছ, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তরুণদের দলে টানার জন্য মাদকের ব্যবহার করছে।

মাদক ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চালানো হয় বলে সে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে দায়িত্বে থাকা এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সময় যখন মাদক চোরাচালানকারীদের আটক করা হয় তখন তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রও পাওয়া যায়।

কিন্তু সেনা কর্মকর্তারা যা বলছেন সেটির সাথে বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য মিলছে না।

এইড একসেস ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা বলেছে, তারা ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটি ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে দেখেছে যে মাদক ব্যবহারকারীদের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোন সম্পর্ক নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক বলেন, “সরকার প্রচার করতে চায় যে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্পর্ক আছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, মাদকের বিস্তারের সাথে সরকারের লোকজন জড়িত।”

লোকমুখে একটাই প্রশ্ন, নিরাপত্তা বাহিনীর এতগুলো তল্লাশি চৌকি পার হয়ে মাদক ঢুকছে কিভাবে?

তবে সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অনেক তল্লাশি চৌকি থাকলেও সব গাড়ি তল্লাশি করা হয় না।


কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই মাদক পাচার হচ্ছে।

কোন গাড়িতে মাদক বহনের গোপন তথ্য থাকলেই সেগুলো তল্লাশি করা হয়।

মাদক সমস্যা মোকাবেলার জন্য থাইল্যান্ডের সেনা বাহিনী ভিন্ন উপায় অবলম্বন করছে। এর মধ্যে সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিক্ষা।

একটি মাদক নিরাময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গ্রামের প্রধান, সাবেক মাদক ব্যবসায়ী ও সাবেক মাদক ব্যবহারকারীরা জড়ো হয়েছিল।

সেখানে জড়ো হয়ে তারা মাদকের বিরুদ্ধে শপথ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।

সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম চলানো হচ্ছে।

২০০৭ সালে চালু হওয়া এ প্রকল্পের আওতায় ৩৫২টি গ্রামে প্রায় ২৫০০ স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে।

আগামী বছর নাগাদ স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২১ হাজার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন দুই হাজারের বেশি গ্রামে তারা কাজ করবে।

” অভিযান চালিয়ে খুব একটা লাভ হচ্ছে না যারা একবার মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে তাদের পক্ষে সেটি ত্যাগ করা খুবই কঠিন।তাছাড়া মাদকসেবীদের কাছে সবসময় পৌঁছানো সম্ভব হয় না,” বলছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তা।

ওজন ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা বলছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার মাদক সমস্যার মোকাবেলা করতে চাইছে। কিন্তু সেখানেও অনেক সমস্যা আছে।

কখনো কখনো দেখা যাচ্ছে যে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পুরনো পেশা বাদ দিয়ে নতুন পেশায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন পেশায় সে বেশি দিন টিকে থাকতে পারছে না। অনেক সময় কিছু গ্রামবাসী মাদক সমস্যার সমাধান জন্য নিজেরাই কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। এজন্য ধর্মীয় প্রচারণাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক গ্রহণ করা পাপ। সেজন্য বিভিন্ন গ্রামে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যাতে ধর্মীয় নেতারা মাদকসেবীদের কোন কাজে না যায়। মাদক সমস্যা কবলিত গ্রামগুলোতে প্রতিনিয়ত বাসিন্দাদের বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র চুরি হয়।

সেজন্য গ্রামবাসী একটি নিয়ম করেছে, চুরি হওয়া জিনিসপত্র যারা কিনবে তারাও চোরদের মতো সমান অপরাধী হবে। এ ধরনের সতর্কবার্তা বিভিন্ন মসজিদে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে।


বিভিন্ন মসজিদে চলছে সচেতনতামূলক কাজ

রোজালি হাজিথে নামের একজন গ্রাম প্রধান জানিয়েছেন, এর ফলে তাদের গ্রামে জিনিষপত্র চুরির প্রবণতা থেমে গেছে।

কিন্তু অন্যান্য গ্রামগুলোতে চুরির প্রবণতা এখনো অব্যাহত আছে। ভিন্ন আরেকটি গ্রামের একজন বাসিন্দা জানালেন, তাদের গ্রাম প্রধান এ সমস্যাটিকে আমলেই নিচ্ছে না।

এমনকি মাদক সমস্যা নিয়ে তারা গ্রামে আলোচনাও করে না। ফলে সরকারও কোন সহায়তা করে না।

উৎসঃ   বিবিসি



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image