‘দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল’

“২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল”

শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭

মাহাবুবুল করিম

'২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় সেই ২৯ এপ্রিল বন্যার পানির নিচে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল'

‘২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় সেই ২৯ এপ্রিল বন্যার পানির নিচে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল’

ফুল ঝড়ে যায়

রেখে যায় বৃতি ।।

মানুষ মরে যায়

রেখে যায় স্মৃতি ।।

‘২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ সেই প্রলয়নকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু হান্নান। মা-বাবা-বোন কে হারিয়ে দীর্ঘদিন পর স্কুলে এসে ক্লাস রুমে দুঃখ ভরা মন নিয়ে একা বসে আছে নীরব অশ্রুসিক্ত নয়নে আর তার খাতায় উপরের এই লাইনগুলো লিখছিলো।’

পরবর্তীতে বেশি অনুরোধক্রমে সর্বনাশকারী ঘূর্ণিঝড়ে অতিপ্রিয় স্বজন হারানো সেই ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক গঠনার বর্ননা করলো কিভাবে জলোচ্ছ্বাসের তীব্র পানির স্রোতে তার বাবা-মা এবং তার তিন বছরের ছোট বোন কে প্রলয়ঙ্কারী সর্বনাশী ‘ম্যারি এন’ কোথায় ভাগিয়ে নিয়ে গেলো।

‘আজ ছাব্বিশ বছর পেরিয়েও হান্নান কল্পনা করে মাঝেমাঝে হঠাৎ একদিন প্রিয় জন্মদাতা মা-বাবা তাকে আদর করে বুকে টেনে নিবে আর একমাত্র আদরের ছোট্ট বোনটি তাকে ভাইয়া বলে একবার ডাকবে।’

বিগত ছাব্বিশটি বছর তাকে দেখেছি কিভাবে কষ্ট করে চাচার বাসায় থেকে পার্টটাইম চাকরি করে গ্রেজুয়েশন সম্পন্ন করে চট্টগ্রামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। সেদিন একটি গাছের ভাঙ্গা ডালের সাহায্যে বেঁচে যাওয়া হান্নান।

“আমি তখন তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ছি হঠাৎ রাত ১১টায় ঘুম ভাঙ্গে আম্মু আর ভাইয়াদের আতঙ্কিত চিৎকারের শব্দে। তারপর থেকে সারারাত আমি নিজের চোখের সামনে দেখেছি সে ভয়াল প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিভাবে চট্টগ্রাম শহরের একটি ৫তলা বিল্ডিং ঘূর্নিঝড়ের অগ্নি বাতাসের ফলে সৃষ্ট আগুনের বেগে দাউ দাউ করে জ্বলছিলো। জলোচ্ছাসে পানির ২০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে কিভাবে মানুষের জীবনপথ রাতারাতি পাল্টে যায় কিভাবে স্বচ্ছল পরিবারে নেমে আসে অভাব-অনটনের প্রভাব। কিভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী তারপরদিন ঋনের বোজার চাপে সর্বস্ব হারিয়ে…… শূন্য।”

সেদিনের ভূমিকম্পে কিভাবে কাঁচা-আদা পাকা বাড়ীঘরগুলো চাপা পড়ে হাজার লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো। এখানে আমার নিজের পরিবারের কিছু কথাও উল্লেখ করেছি যেহেতু ছাব্বিশ বছর আগের স্মৃতি মনে করে লিখছি তাই হয়তোবা দু’কলম নিজের কথাও লিখে ফেল্লাম।

এবার ফিরে আসি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াল সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথায়। সেদিন সরকারী হিসেবে মারা যায় ১ লাখ ৩৯ হাজার মানুষ। ঐ দিন নিরীহ, নির্জীব অবলা জাতির উপর নেমে এসেছিল এক অভিশাপ। সে নৃশংস কালো রাতে ঝড়ের ছোবলে মায়ের কোল থেকে হারিয়ে ছিল দুধের শিশু, ভাই হারিয়েছিল অতি আদরের বোন, স্বামী হারিয়েছিল প্রিয়তমা স্ত্রীকে, স্বজন হারানোর কান্না আর লাশের স্তুপে পরিনত হয়েছিল সমুদ্রপাড়সহ উপকূলীয় অঞ্চল সমূহের নদীর তীর।’

'২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

স্যাটেলাইট থেকে সংগ্রহ করা।

নিম্নচাপটি কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিলো:

১৯৯১ সালের ২২ এপ্রিল নিম্নচাপটি সৃষ্টি হয় বঙ্গোপসাগরে। বাতাসের গতিবেগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং ২৪ এপ্রিল তা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। এবং তা ধীরে ধীরে উপকূলীয়তীরের দিকে অগ্রসর হয়। এই ঝড়টি ২৭ তারিখ একটি প্রলয়করী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ২৮ এপ্রিল এটি হারিকেন পর্যায়ে উন্নীত হয়। ২৮ তারিখ রাতে ঘণ্টায় ১৫৫ কিমি গতিবেগ অতিক্রম করে এটি এফ ৫ ক্যাটাগরির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। ২৯ তারিখ এটি গতিবেগ কমে এফ ৪ ক্যাটাগরির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। আস্তে আস্তে এটি স্থল নিন্মচাপে পরিণত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

১৯৯১ সালে ঢাকার আবহাওয়া অফিসে কাজ করতেন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত আবহাওয়াবিদ সমরেন্দ্র কর্মকার। তিনি দেখেছিলেন কিভাবে একটি দুর্বল লঘুচাপ হ্যারিকেন শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়।

তাই ২৮ তারিখ চট্টগ্রামের জন্য ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত, কক্সবাজারের জন্য ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত আর মংলার জন্য ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করা হয়।

'২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

স্যাটেলাইট থেকে সংগ্রহীত ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের সে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়।

ঐ প্রলয়নকারী ঘূর্ণিঝড়ে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৬৬৬ জন নিহত হন। অধিকাংশই মারা যান জলোচ্ছ্বাসের ফলে পানিতে ডুবে। এর ভিতর শিশু আর বয়স্করা বেশি ক্ষতির শিকার হন। এত মৃত্যুর কারণ ঠিকমত সতর্কবার্তা পৌঁছে না দেয়া এবং মানুষের অসচেতনা। ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেতের ঘোষণা রেডিও, টেলিভিশন, মাইকযোগে সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রচার প্রচারনা করা হলেও অনেকেই তাতে কর্ণপাত করেনি, “এ এমন আর কি!”

সর্বনাশী ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’ :

‘ম্যারি এন’ নামে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায়। আর এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় পুরো উপকূল। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বির্স্তীণ এলাকা। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এর সংখ্যা আরো বেশি। মারা যায় ২০ লাখ গবাদিপশু।

গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদ। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০ লাখ মানুষ। ৬ লাখ ৪২ হাজার ৫২টি ঘর সম্পূর্ণভাবে এবং ৫৬ হাজার ২৭১ টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫০ টি সেতু ও কালভার্ট এবং ১১২ মাইল দীর্ঘ উপকূলীয় বাঁধ সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিল পানির নিচে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। ছবিটি স্যাটেলাইট থেকে সংগ্রহীত।

আমার নিজের ব্লগে লিখেছি সেখান থেকে নেওয়া: মাহাবুবুল করিম

‘আমার মনে আছে সেদিন আমি মাগরিবের আগে যথারীতি বাহির থেকে আম্মুর ভয়ে বাসায় চলে আসলাম, সন্ধ্যা থেকেই কারেন্ট ছিলোনা। বাসায় আসার সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল বাহিরে আর ঠান্ডা বাতাস। প্রতিদিনের মত একটু অ-আ পড়ে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তখনো কারেন্ট ছিলনা আর টিভিতে সেদিন খবরও কেউ দেখেনি। আমাদের বাড়িতে কেউই জানত না সেদিন ১০ নাম্বার সতর্ক সংকেত।’

আব্বু দেশের বাহিরে থাকতো বড় ভাই আছাদগঞ্জের দোকান এবং তখন চট্টগ্রাম শহরে হাতেগুনা দুইতিন জনের মধ্য আমরাও পোল্টি ফার্ম এবং পোল্টি ফিড পুরো সিটিতে সর্ব প্রথম আমরাই শুরু করি এ ব্যবসা। এগুলো দেখাশুনা করতো। মেঝভাই ঢাকায় ট্রাবল এজেন্সি করতেন। রফিক ভাই আর জিয়া ভাই কি করছিলো মনে নেই, রাশেদ তখন ছোট এবং সাইফুল ভাই আরাম করে অগোর ঘূমে মগ্ন, ভাইয়া ঝড়-তুফান শেষ হলে সকালে উঠে দেখে বাহিরে লন্ডভন্ড হয়েগেছে সব কিছু!

রাত তখন ১১টা আমার ঘুম ভাঙ্গে আম্মু-বড়ভাই-আপুর আতঙ্কিত চিৎকারের শব্দে। উঠে দেখি দরজা জানালা সব খোলা, তিন তলার বারান্দায় এসে বাহিরে বাতাসের বেগে গাছপালা ভেঙ্গে যাচ্ছে মানুষের বাড়ীঘরের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর পাশের বাসার ওয়াহিদ ভাই এই ঝড়-তুফানের মধ্যো একগলা পানিতে সাঁতার কেটে তার দাদা-দাদীকে নিয়ে আনছে, মিটমিটে হারিকেনের আলোতে সবাই এক ঘরে বসে দোয়া দরুত পড়ছেন আর বাইরে থেকে প্রচন্ড জোরে বাতাসের শব্দ। অবাক হয়ে আম্মুকে জিজ্ঞেস করি, কি হচ্ছে? আম্মা বলেন, “তুয়ান অর, আল্লারে ডাক”। তখনো আমি ‘তুয়ান’ কি জিনিস বুঝতে পারিনি।

এভাবে আরও প্রায় দু’ঘন্টা কেটে যাওয়ার পরে দেখি সবাই একযোগে চিৎকার করছেন আল্লাহকে ডাকছেন আর আমার কোন ভাই মনে নায় আমাদের বিল্ডিংয়ের চারতলায় আমার খালা থাকতেন তাদেরকে নিয়ে আসলেন। পাশের বাসায় একজনে আজান দিচ্ছেন। কি হচ্ছে জানতে চাইলে ফিরে দেখি আমার আম্মু রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিলেন। আমিও গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে একটা বাড়ীর ছাদে দাও দাও করে জ্বলছে আগুন। পরে বুজলাম আমাদের পোল্টি ফার্ম কয়েক হাজার মুরগী সহকারে সবকিছু আগুনে পুড়ছে হঠাৎ করে বাতাসের বেগে আগুনের উল্কার গতিবেগে উড়ে এসে রান্নাঘরের জানালার আয়নাতে স্পর্ষ করলে আমি জোরেশোরে চিল্লায়ে উঠি। পরবর্তীতে জানতে পারি সেদিনের ঘূর্ণিঝড়ে যে অল্পক্ষণ বৃষ্টি নাকি অগ্নিশিখা মিশ্রিত বতাসের সাথে নাকি আগুন ঝড় হয়েছিলো। সকালে বাহিরে অনেক গাছের পাতা জ্বলসে গেছে দেখেছি।

একটু পর কে যেনো আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে আপু কে প্রশ্ন করতেই সে আমাকে উপরে ফ্যানের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, আমি তখন শুধু ফ্যানটার প্রচন্ড দুলুনিটাই দেখেছিলাম, পরে জানতে পারি সেদিন ঘূর্ণিঝড়ের সাথে ভুমিকম্পও হয়েছিলো। সেদিন প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেনের সাথে ভূমিকম্পটি অনেক মানুষের জন্য মৃত্যুদূত হয়ে এসেছিল। অনেক লোক সেদিনের ভূমিকম্পে কাঁচাবাড়ি চাপা পড়ে মারা গিয়েছিলেন।

সকাল হতে হতে তুফানের বেগ কমে আসলে পাড়ার অনেক লোকদের দেখি নিজেদের ঘরের চালের টিন, গাছের আম কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আর আমাদের বিল্ডিংয়ের পাশের সীমানা জুড়ে গাছের বড় বড় ডাল ভেঙ্গে পড়ে পুকুরে একাকার, বন্ধু নাজমুলদের কাছারী ঘরের আস্ত টিনের চালটা একপাশে পড়ে আছে। আমার এখনো মনে পড়ে বক্কর ভাইদের পুকুরে তাদের ভাড়া ঘরগুলোর সিলিং সহ টিন উড়ে গিয়ে পড়ে পুকুরে। সেদিন আম সহ বড় বড় গাছ ভেঙ্গে পুকুরে রাস্তায়, কেউ মানা করেননি। সকাল থেকে খাবারদাবার নেই কোথাও কিছু নেই, সব কিছু তছনছ হয়ে গেছে, সকালে বড়ভাই বল্লো গোডাউনের সব মালামাল জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভিজে নষ্ট, দোকানের মালামাল সবকিছু তছনছ হয়েগেছে, আমি অল্প কিছু খাবার পেয়েছিলাম কিন্তু অন্যরা রাতে স্টোভ জালিয়ে রান্না করে খেয়েছিলেন, কারণ রান্নার উপকরণ সব ছিল রান্না ঘরে আর সবই জল-পাতায় নষ্ট। ৬ বছর পরে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেলো!!!

আমাদের স্কুল অনেকদিন বন্ধ ছিল, যেদিন স্কুলে গিয়ে দেখি পুরো অচেনা একটা জায়গা। সীমানা প্রাচীর পুরোটাই মাটিতে, স্কুল দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোন চাল নেই, পুরোচালটাই খেলার মাঠে।

কিছুদিন ক্লাস হয়েছিল গাছের ছায়াতে, সে কি মজার দিন ছিল…। এক ক্লাসে স্যার প্রশ্ন করছেন তো উত্তর দিচ্ছে অন্য ক্লাসে…..।

“আমি এতক্ষণ ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড়ের সময়ের আর তার পরের ঘটনা বলেছি, সব মনে নেই…। দশ বছরের একটা ছেলের আর কতটুকুইবা মনে থাকে। তবে এর ভয়াবহতা মনে হয় পুরো জীবন মনে থাকবে…..।”

'২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

হাজার হাজার গবাদিপশুর মৃতদেহ ভাসছে পানিতে। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া-পেকুয়া উপকূলীয় এলাকায় ১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিল।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ:

ঘূর্ণিঝড়ে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকা বাঁশখালী। শুধু বাঁশখালীতেই সেদিন ৪৫ হাজার মানুষ নিহত এবং কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সাগরপাড় থেকে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে এমন কোনো ঘর এবং পরিবার ছিল না, যে ঘর এবং পরিবারের একাধিক মানুষ সেদিন নিহত বা হারিয়ে যায়নি। সেদিনের ঝড়ো ছোবল ও অথৈ পানিতে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল পুরো উপকূলীয় এলাকা।

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

সেই প্রলয়কারী ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘ম্যারি এন’ ও জলোচ্ছাসে প্রাণ হারানো নারী-পুরুষ-শিশু সহ কুকুর ও গৃহপালিত পশুর মৃতদেহ।

ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ সেই সময়ের হিসাবে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ঝড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ১০০ টন ক্রেন উড়ে গিয়ে কর্ণফুলী ব্রিজের উপর পড়ে একে দুখণ্ড করে দেয়।

ঘূর্ণিঝড়ে যে কেবল মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল তা নয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিভিন্ন অবকাঠোমো এবং যন্ত্রপাতির। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজ।

ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর কোয়ার্টারে ছিলেন তৎকালীন সার্জেন্ট উইং কমান্ডার এ কে এম নুরুল হুদা, যিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তিনি বলছিলেন তখন নৌ এবং বিমান বাহিনীর অনেক যুদ্ধজাহাজ বিকল হয়ে পড়ে।

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

১৯৯১ এর ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের পর এভাবে হাজার হাজার মৃতদেহ পড়ে ছিলো রাস্তাঘাট-খালবিল-পুকুর ও নদী-নালায় ভেসে উটে লাশ আর লাশ।

সেদিনের স্মৃতিচারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার:

“ভয়াল সে দিনের কিশোর আজ টগবগে এক যুবক। তার নাম হারুনুর রশিদ। তবুও প্রতিদিন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও আনমনা হয়ে যায় হাীুন। ৭ বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়েছে। বছর ঘুরে প্রতিবার ২৯ এপ্রিল আসলে আদরের একমাত্র ছোট ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে এখনো কাঁদে। চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা আনোয়ারার চরণদ্বীপ থেকে ছেলেকে (২ জন) নানার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে (২৯ এপ্রিল) নিজের বাস্তু ভিটা আঁকড়ে ধরার ইচ্ছায় জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায় হারুনের মাতা-পিতা।”

‘জীবনের চরম ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া মগনামার মাস্টার আবদুল করিম বলেন, ২৮ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টায় জলোচ্ছ্বাস এল; ইয়া ঢর (এত বড়) জলোচ্ছ্বাস ১৯৬০ সালেও দেখিনি। মুহূর্তে সব কেড়ে নিয়ে গেল। বাবা, মা এমনকি কোলের ছোট ছেলেকে ঢেউয়ের তোড়ে ধরে রাখতে না পেরে অনেকে জলে সঁপে দিয়েছে। সকালের আলো যেন অভিশাপ। কারণ আমাকে নিজের চোখে দেখতে হলো মা-বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজনের লাশ। লজ্জায় কেউ কারও দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও সামনের দিকে চেয়ে ধৈর্য ও সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার প্রত্যয়ে মগনামায় সেদিন কাছে পেয়েছি ‘কারিতাস’ কে।’

ওই সময় চকরিয়াবাসী অন্তত ১৫ দিনব্যাপি এসব লাশ উদ্ধার করে গণকবর দেয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল সেই ঝড় সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে কক্সবাজারে। সরকারি হিসাবে মৃত লোকের পরিমাণ ১ লাখের কাছাকাছি। তবে, বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল আরো বেশি।

বিশেষ করে বর্ষাকালের ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ভূমিকম্প ও সুনামির শঙ্কায় রয়েছে উপকূলবাসী। এসব এলাকার লোকজন এপ্রিল আসলে এখনো আঁতকে উঠেন। প্রায় ২ যুগের কাছাকাছি সময় অতিবাহিত হলেও এ স্মৃতিকে তারা কোনভাবেই ভুলতে পারছেনা। সে কারণে স্মৃতি বিজড়িত ও বেদনা মিশ্রিত আজকের এই ভয়াল দিন।

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

‘২৬ বছর আগের দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল’

হ্যারিকেন “ম্যারি এন” আঘাত হেনে ছিল বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের মাত্র ১৭ দিনের মাথায়।ক্ষতিগ্রস্থ উপকূলকে দূর্গত এলাকা ঘোষণা করা হয়।  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্থানান্তর করা হয় চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে। দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের পদচারণায় ভরে উঠে চট্টগ্রাম। তারা নিজস্ব স্যাটালাইট সিষ্টেম দিয়ে সংবাদ প্রেরণ করে চট্টগ্রাম থেকে।

মার্কিন ত্রাণ সহায়তা।

মার্কিন ত্রাণ সহায়তা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন ফোর্স দুর্গত মানুষকে সহায়তা করার জন্যে এগিয়ে আসে। অপারেশন সি অ্যাঞ্জেলের অধীনে ২৫০০ মার্কিন মেরিন সেনা এবং ১৫ টি জাহাজ এতে অংশ নেয়। ১০ মে থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়। আমেরিকানদের ঐ সময় অবদান ছিল অত্যন্ত সহায়ক।

বিশ্বের ইতিহাসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারবাসীর জন্য আজ ভয়াল স্মৃতি ও কালো রাত:

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

লাশ আর লাশ

বিশ্বের ইতিহাসে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জন্য আজ ২৯ এপ্রিল ভয়াল স্মৃতি ও কালোরাত। কেননা ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত স্বজনেরা হারানো বেদনা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি এসব এলাকার বাসিন্দারা। সে রাত্রের দৃশ্য ছিল করুণ ও বিভৎস। শতাব্দীর ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী-ঘূর্ণিঝড় জেলার উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। সে রাতের ক্ষয়-ক্ষতিতে নিমজ্জিত উপকূলবাসী। অথচ ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ২ যুগের কাছাকাছি সময় হলে ও এখনো অরক্ষিত এসব দ্বীপাঞ্চল।

দেশের ২৫ ভাগ লোক উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করার পরও এখনো পর্যন্ত গঠন করা হয়নি আলাদা উপকূলীয় মন্ত্রণালয়। ১৯ টি জেলার ৪৮টি উপজেলার ৭১০ কিলোমিটারে বসবাসকারী ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ের লক্ষে ৩হাজার ৬ শত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণসহ সমুদ্র মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি উপকূলবাসীর। আজ পর্যন্ত এ দাবি বাস্তাবায়ন না হওয়ায় ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার লোকজন।

'দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল'

মৃত গৃহপালিত পশু পানিতে এভাবে পড়ে ছিলো। পরবর্তীতে পচে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, ও টেকনাফ উপকূলের মানুষগুলো।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮৯৭ সালে কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয় ১৭ হাজার ৫ শত লোকজন। ১৯৬০ সালে কুতুবদিয়া, হাতিয়া ও নোয়াখালীতে ২১০ কি.মি. ঘন্টা গতি সম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় ও ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছ্বাসে ৬ হাজার মানুষ মারা যায়, ১৯৬৩ সালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীতে ২০০ কি.মি. গতিসম্পন্ন ঝড়ে মারা যায় ১২ হাজার মানুষ। ১৯৬৫ সালে কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও বরিশালে ১৬০ কি. মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছ্বাসে ১৯ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৮৫ সালে কক্সবাজার চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালীতে ১৫৪ কি.মি. ঘন্টা ৪ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছ্বাসে ১২ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯১ সালে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও বরিশালে ২২৫ থেকে ২৬০ কি.মি/ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন জলোচ্ছাসে ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ মারা যায়। ১৯৯৭ সালে টেকনাফ, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম ১৮০ কি.মি/ঘন্টা ৫ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন জলোচ্ছাসে ২ শত এর অধিক মানুষ মারা যায়।

এছাড়া ১৮২২, ১৮৭৬, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৮৮, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন ধরণের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার ২৬ টি জেলায় চরমভাবে আঘাত হানে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অরক্ষিত উপকূলবাসীদেরকে রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা জেলার ১০ লক্ষ উপকুলবাসীর দাবি। চলতি অর্থ বছরে উপকূলীয় এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আলাদা বাজেট বরাদ্দেরও দাবি জানিয়েছে উপকূলীয় এলাকার অবহেলিত লোকজন।

উপকূল বাঁচলে দেশ বাঁচবে। উপকূলীয় এলাকায় জন্ম হওয়াই কি অপরাধ! এ প্রশ্ন ভুক্তভোগী অবহেলিতদের। কেননা এ এলাকার জনসাধারণরাও এ দেশের নাগরিক। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ থেকে ২০১৭ দীর্ঘ ২৬ বছরেও সরকারের উদাসীন মনোভাব হওয়াতে উপকূলবাসীকে রক্ষার বাঁধগুলো প্রায় অরক্ষিত করে রেখেছে তাতে যেকোন সময় ঘটতে পারে মারত্মক দূর্যোগের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি যা থেকে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।

এখনও মেঘ দেখলে ভয় পায় উপকূলীয় ঐ অঞ্চলের মানুষ। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ছিল গত প্রজন্মের কাছে এক ভয়াল সংকেত। ঐ সংকেতে সতর্ক হয়েছিল বলেই সিডরে প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়েছিল।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


One thought on “‘দুঃসহ স্মৃতিময় ২৯ এপ্রিল’

  1. Hasiba Ali

    ▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ ۩۞۩ ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
    Bangla Newspaper-All (Android App)
    ▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ ۩۞۩ ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
    Bangla Newspaper-All – এ বাংলাদেশের 500+ সংবাদপত্র রয়েছে। এখন সব সংবাদপত্র আপনার পকেটে থাকবে। আপনি এই App- এর মাধ্যমে সকল সংবাদপত্র পড়তে পারবেন বুকমার্ক এবং শেয়ার করতে পারবেন ।

    Bangla Newspaper-All এর বৈশিষ্ট্য -:
    ✓ 500+ সংবাদপত্র – আপনার ফোনে সব পড়ুন একসাথে
    ✓ ফেভারিট তালিকা – আপনার প্রিয় সংবাদপত্রের তালিকা তৈরি করতে পারবেন
    ✓ বুকমার্ক সুবিধা – বুকমার্ক করে পরবর্তীতে পড়তে পারবেন
    ✓ শেয়ার করার সুবিধা
    দাম: সম্পূর্ণ বিনামূল্যে
    ডাউনলোড লিঙ্ক: https://goo.gl/sL9wQb

    Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image