দোজখের লাকড়ি এবং আমি ও আপনি

hetalia_1p_vs2p__heaven_vs_hell_intro_by_halomindy-d65ki6e

 রনিয়া রহিম: আমার বয়স তখন ১৭। আমি হাইস্কুলের শেষ ক্লাসে; – বাসা পর্যন্ত বাস দেয় না স্কুল কর্তৃপক্ষ কারণ ২ মাইলের নিচে থাকি। একদম কাঁটায় কাঁটায় নিচে, আর কয়েক পা সামনে পেছনে গেলেই হয়ে যায়, কিন্তু না, বাস দেবে না স্কুল! অগত্যা, সকালে বাবা অফিস যাওয়ার আগে নামিয়ে দিয়ে যায়, আর ফেরার সময়ে হেঁটে ফিরি।একদিন দুটো প্লেন এসে গুঁড়িয়ে দিলো জমজ দুটো ভবন; ভবন তো ধসলোই, কতশত মানুষ প্রাণ হারালো, আর সেই সঙ্গে আশাবাদ থেকে নিরাপত্তাবোধ, এক নিমেষে সব হারিয়ে গেলো। আমেরিকান মুসলমানদের (বা যে কোন বাদামী চামড়ার) জন্য পরিবেশ প্রতিকূল হলো আরেকটু বেশি; আমরা আকাশে প্লেন দেখলেও ভয় পাই, খুব কাছ দিয়ে কোন শ্বেতাঙ্গ বা কৃষ্ণাঙ্গ গাড়ি চালালেও সভয়ে তাকাই, আমাকে মারবে না তো?

আশপাশের বড়রা বললো, রনিয়া! আর একা একা হেঁটে ফেরার দরকার নেই! এক বান্ধবীর মা একটু ঘুরপথে যেতে থাকলেন, তাঁর বাড়ি যাওয়ার আগে আমাকে তাঁর গাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য, যেন আমাকে একা হাঁটতে না হয়।

তার খুব অল্প কয়েক মাস পরেই আমি হিজাব পরা শুরু করি। সেটা নিয়েও কোন কোন শুভাকাঙ্খী ভয় পেল: ভীতিকর পরিবেশ তখনো কাটেনি, বরং অলিখিত একটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে যেন মুসলমানদের প্রতি। এতদিন তো কেবল বাদামী চামড়া ছিলাম, এখন তো আমি চিহ্নিত মুসলমান! ভয়টা তো আরো বেশি!

ভয় জিনিসটা খুব মন খারাপ করা, জানেন? একদমই ভালো লাগে না! মানসিক যন্ত্রণা তো দুঃখেরই, আবার প্রাণ খোয়াবার ভয়টাও আনন্দময় হয় কি করে? না নিজের জন্য, না প্রিয় কারো ক্ষেত্রে।

আমি বরাবরই একটু বোকার স্বর্গে বাস করি, আমার মাথায় এই ভয়টা খুব বেশিদিন কাজ করেনি। -আমি সমবয়সী একটা মেয়ের কথা শুনলাম নিউ ইয়র্কে, অতর্কিত ছুরিকাঘাতে যার গালের মাংস তুলে নেয়া হয়েছে, তার মাথায় ওড়না দেয়া ছিলো বলে। আমার নেকাবী এক সহপাঠিনীকে কুৎসিত ভাষায় ধমক দিলো একজন: “৯/১১ ঘটালে কেন???” এক দম্পত্তিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, যাদের ব্যবসায় লস দিয়ে তাদের শহর ছেড়ে অন্য স্থানে সরে যেতে হয়েছিলো, রাতারাতি তাদের প্রায় সব কাস্টমার তাদের দোকানে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলো বলে। রইস ভুইঁয়ার নাম অনেকেই শুনে থাকবেন; তাঁকে মৃত্যুর দুয়ারে প্রায় পৌঁছে দিয়েছিলো এক তীব্র ইসলামবিদ্বেষী, – এই মানুষটার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা খুবই উদ্দীপক, খুঁজে নিয়ে পড়ে দেখবেন কখনো।

উপরের সবাই আমেরিকার বাংলাদেশী মুসলমান; আমিও তাই, কিন্তু তবুও ভয়ে দমবন্ধ থাকিনি বেশিদিন। প্রথমত, একটু বোকাসোকা আছি ঠিকই; একটু বেশিই আশাবাদী আর মায়াবাদী মাঝেমাঝে, বেশিদিন মন খারাপ করে থাকতে পারি না! তার উপর, আমার শহরে খুব বেশি অনাকাংখিত ঘটনা ঘটেনি; আর আমার সাথে হয়নি। কেউ যদি আমাকে উল্টোপাল্টা বলার চেষ্টা করেও থাকে, সেটা ঐ কথা পর্যন্তই ছিল আর আমিও দিব্যি দাঁত কেলিয়ে পাল্টা কথা বলে গেছি!

কিন্তু আসল কারণটাতে আমার নিজস্ব কোন কৃতিত্বই নেই! আপনি যতই মায়াবাদী হন না কেন, দিনের পর দিন দুর্বিষহ দোজখে বাস করে তো আর বোকার স্বর্গে বসে থাকা যায় না! ওই বছরই, হলো কি, আপামর আমেরিকান জনসাধারণ, – যে সমাজে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু, সে আমেরিকান নাগরিকই বলুন বা ভিনদেশ থেকে আসা কেউ,- সেই অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠরা জোট বেঁধে দাঁড়ালো এই পণে, আমরা কিছুতেই আমাদের মনের অন্ধকারকে মাথাচাড়া দিতে দেবো না! তাহলে যে জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদেরই জয় হয়ে গেলো!! তারা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে তো দিক, আমাদের মনোবল আর ঐক্যতে ধ্বস নামাতে দেবো না!!

ইসলামবিদ্বেষের রেশ এখনো আছে; জঙ্গিবাদী আক্রমণ, মিডিয়ার আস্ফালন আর ট্রাম্পের মত মানুষদের কল্যাণে উস্কেও উঠেছে মাঝখানে। কিন্তু, জানেন, ২০০১/২০০২ সালে অসংখ্য অমুসলিম আমেরিকান মসজিদে গেছে; পবিত্র কুর’আন চেয়েচিন্তে পড়েছে; তার মুসলমান সহকর্মীর জন্য নামাজকক্ষের ব্যবস্থা করে দিয়েছে! আমাকে আমার এক টিচার ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, কেউ যদি তোমাকে একটা কোন কটুকথা বলে সোজা আমাকে এসে বলে দিবা! (সেই শিক্ষিকার ডাকনাম ছিলো “ড্রাগনলেডি” , সবাই যমের মতো ভয় করতো তাঁকে)! আমার বাবাকে তাঁর বস নিজে যেচে এসে আশ্বাস দিয়েছিলেন, আমরা সবাই আপনার পাশে আছি আশরাফ, আপনি কোন চিন্তা করবেন না! এক পরিচিত ব্যবসায়ীকে তাঁর শিক্ষাগুরু ব্যবস্থা করে দিলেন বিশাল একটি সমাবেশে “শান্তির ধর্ম ইসলাম” নিয়ে বক্তব্য রাখবার – আমাদের ধর্মটাকে সরাসরি চেনাবার সুযোগ করে দেয়ার।

এটা কি তাদের দাক্ষিণ্য ছিলো আমাদের প্রতি? আলগা দরদ বা লোক-দেখানো মহানুভবতা? না, মোটেও না! এটাও একরকমের যুদ্ধ ছিলো; আশপাশে যখন অনেকেই ভুল কাজটা করছে, – নিষ্পাপ মানুষদের উপর চড়াও হচ্ছে – তখন এটাই ছিলো প্রতিবাদের ভাষা: “তুমি অসহনশীল, কিন্তু আমি আমার পাশের মানুষটার অধিকার আদায় করেই ছাড়বো! কি করবা তুমি করো!” দিনশেষে, বুঝলেন, এটাই সঠিক কাজ ছিলো; – একটা গোষ্ঠী আর কারো পাপে এই মুহুর্তে মূর্খদের রোষানলে পড়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, যেটা না যৌক্তিক না মানবিক না সেটা “আমেরিকান” – “আমাদের আমেরিকা এর চাইতে শ্রেয়! আমরা সবাইকে ভালোবাসি, সবাইকে মিলেমিশে থাকবার সুযোগ করে দেই! এখানে সবারই অধিকার আছে সুখের, সাফল্যের আর স্বাধীনতার – আমরা সেটার হেরফের হতে দেবো না কিছুতেই!”

আমেরিকার ভুল আর পাপ দুটোই আছে প্রচুর, কিন্তু ঐ স্পৃহাটির উপর আমেরিকানদের বিশ্বাসও আছে! ৯/১১’র আগে অনেকেই সেটি ভুলতে বসেছিলো প্রায়, কিন্তু আমেরিকানদের উপর সমসাময়িক ইতিহাসের এই নিকৃষ্টতম আঘাত বরং আরো বেশি একতাবদ্ধ করেছিলো সবাইকে; – আমেরিকান মুসলমানদেরও, বাকি সব আমেরিকানদের সাথে। – না, সব স্থানকালপাত্র এত বেশি আদর্শ মেনে চলেনি, কিন্তু একগাদা সচেতন মানুষেরা এগিয়ে এসেছিলেন বলেই কিন্তু পরিবেশটা দোজখও হয়নি! আপনার কি মনে হয় সবাই খুব বিশ্বাস করেছে ইসলাম শান্তির ধর্ম? কারো কারো কি কুর’আন বা হাদিসের কিছু কিছু লাইন পড়ে মনে প্রশ্ন জমা হয়নি? কারো কারো কাছে কি মনে হয়নি, হিজাব জিনিসটা কী রে বাবা! খালি মেয়েদেরকেই দেখি কেন পরতে, ছেলেদের কি আলাদা স্বাধীনতা নাকি ইসলামে?

এই অমুসলিম আমেরিকানদের অনেকেরই কাছে আমাদের নবী ঈসা (আঃ) ঈশ্বর-পুত্র; অনেকেই ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত; কেউ কেউ আবার মনে করেন, যে কোন ধর্মবিশ্বাসই যত নষ্টের গোঁড়া, না থাকলেই বেশ হতো পৃথিবীটা! হয়তো আমাদের কিছু বিশ্বাসব্যবস্থা এঁদের মাথার উপর দিয়ে চলে যায়; হয়তো ব্যাকডেটেড মনে হয়; কিংবা কারো কারো কাছে হয়তো সীমাহীন পাপ’ই মনে হয়!! – কিন্তু, দিনশেষে, আমার সাথে তাঁদের যতই অমিল থাকুক না কেন, আমি যেন আমার এই ভিন্নধর্মী বিশ্বাসটাকে আমার মনের শান্তিমতো লালনপালন করতে পারি, আমার সেই অধিকার অক্ষত রাখতে এই সহনশীল, শ্রদ্ধাশীল সচেতন জনগোষ্ঠী সদা-তৎপর!!

আপনার আমার প্রিয় ধর্মটার খোলস পরে যখন মানুষ হত্যা করা হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে, যখন আপনি ভালোমানুষটা সেই হত্যাগুলোকে খারাপ বলছেন, – এটুকুই কি যথেষ্ঠ? যে মানুষদের বিশ্বাসটা বা জীবনবোধটা আপনার সাথে মিলছে না, সেটা আপনার মূল্যবোধ বা ধর্মীয়বিশ্বাসের সাথে না যদি যায়, আপনি তখন সামনাসামনি বা আড়ালে, কিংবা আপনার সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট থেকে কি বলছেন তাঁকে নিয়ে? “আমি হত্যার প্রতিবাদ করছি, কিন্তু – ……. এই মানুষটা তো দোজখের লাকড়ি হবে!!”

বহু ক্রিশ্চানের চোখে ঈশ্বর-পুত্রে অবিশ্বাসী একজন হিজাবি রনিয়া রহিমও দোজখের লাকড়ি হবে রে ভাই! এই কথাটা যদি আপনার আমার মুখের উপর এসে কেউ বলে; এই ভাবনা থেকে আমাদের অধিকারগুলো কেড়ে নিতে থাকে, এমনকি বেঁচে থাকার লাইসেন্সটাও রোধ করে দেয়, তাহলে কোথায় যাই বলেন তো! শেষ দুটো ধাপ অবধি যেতেও হবে না, সে মুখ ফুটে কটুকথাটি শোনালেও আমার শ্বাসটা যে একটু রুদ্ধ হয়ে এলো – হলো না!?

না আপনি আমি কোন মৃত্যুকে রোধ করতে পারছি, না সুবিচারের নিশ্চয়তা পাচ্ছি; কিন্তু আমরা সবাই মিলে একটা শ্রদ্ধাশীল সহনশীল পরিবেশ অতি-অবশ্যই তৈরী করতে পারি, এইটুকু ক্ষমতা আমাদের প্রত্যেকেরই আছে! – যদি অপর মানুষটার জন্য আপনার মন থেকে কোন শ্রদ্ধা বা মায়া তৈরী না হয়েই থাকে, অন্তত কটুবাক্যগুলো টাইপ করা থামাতে পারেন! কেউ করলে তাকে মানা করতে পারেন; – “তোমার অসহিষ্ণু বিদ্বেষ আমার ওয়ালে আমি কিছুতেই এলাউ করবো না,” এইটুকু বাক্য তো দৃপ্তচিত্তে আপনি বলতেই পারেন, পারেন না??

 রনিয়া রহিম- ফেইসবুকে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্পগুলো সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.