“ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম”

মাহাবুবুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

চট্টগ্রামে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংস হবে ১ লাখ ৬৮ হাজার ভবন

১৩ এপ্রিল বুধবার চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে হেলে পড়া রেয়াজউদ্দিন বাজারে আলমাস শপিং মলের ভবনটি।

প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে এবং ভারতে আবারো শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে যাচ্ছে আর এতে “ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম”। বিগত চার মাসের ব্যবধানে বড় মাত্রায় দুটি ভূমিকম্পের পর আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত কিংবা ত্রিপুরা ফল্ট লাইন এলাকা। মাটির গঠন কাঠামোর সাথে সুউচ্চ বহুতল ভবন নির্মাণের কারনে ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।

“বন্দর নগরী চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সিটিজিবার্তা২৪ডটকম কে জানিয়েছেন বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদী আনসারী”

"ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম"

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ১০টি ভবন হেলে পড়ে, আহত অর্ধশত

তিনি বলেন, ‘গত বুধবারের সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদেশ মায়ানমারের মাটির ১৩৪ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্প হওয়ায় চট্টগ্রাম ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা থেকে অনেকটা বেঁচে গিয়েছে। যদি তা অন্যান্য ভূমিকম্পগুলোর মতো ৫০ থেকে ৫৪ কিলোমিটার গভীরে হতো তাহলে ব্যাপক ক্ষতি হতো। তবে অনেক গভীরে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হওয়ায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের ঢাকাও ঝাঁকুনি খেয়েছে। কম গভীরতায় হলে এতো দূরে ঝাঁকুনি যেতো না।’

চট্টগ্রাম অঞ্চল ভূমিকম্পে এতো ঝুঁকিপূর্ণ কেন?

ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘চট্টগ্রামের পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন সিলেটের উত্তরপাশ দিয়ে শিলং হয়ে মেঘালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। গত কয়েক বছর ধরে এই ফল্ট লাইনটি সক্রিয় এবং ২০০ থেকে ২৫০ বছরের ইতিহাসে এই অঞ্চলে একটি বড় ভূমিকম্প অপেক্ষায় রয়েছে। ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়াক এবং ১৮৫৮ সালে ৭ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলের মায়ানমারের আরাকান ভূমিকম্পের পর এখন যে কোনো সময়ে একই মাত্রার আরও একটি ভূমিকম্প হতে পারে।’

চট্টগ্রামে ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি হবে!

ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনেক ভবন পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে সুউচ্চ বহুতল ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। বড় আকারের ভূমিকম্প হলে এসব মাটির ওপর গড়ে তোলা ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর চট্টগ্রামের ভূ-অভ্যন্তরে নরম মাটির পরিমাণ বেশি থাকায় তা আরও বেশি আতঙ্কের কারণ হতে পারে।’

অতীতে চট্টগ্রামের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত !

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অতীতের কয়েকটি ভবন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক বছর আগে বিবিরহাট সুন্নীয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা একটি সাততলা ভবন হেলে পড়েছিল। এছাড়া ১৯৯৭ সালে ভূমিকম্পে হামজারবাগে যে ছয়তলা ভবনটি তেবে গিয়েছিল সেটিও একটি পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠেছিল।

বড় মাত্রার ভূমিকম্প সময়ের ব্যাপার!

১৮৯৭ সালে হাইতিতে একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পর সম্প্রতি আরো শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। আর সেই হিসেবে মায়ানমারে ১৮৫৮ ও ১৯১২ সালে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পর বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ভূমিকম্প বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য! 

চট্টগ্রাম ও আশপাশ এলাকায় অনেক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩ জানুয়ারিতে ভারতের মণিপুর রাজ্যের ৬ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প, গত বছরের ২৫ এপ্রিল নেপালের বাহরামপুরে ৭ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারতের মিজোরামে ৪ দশমিক ৬ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প, ২০১৪ সালের ২০ জুলাই মায়ানমারের হাখা এলাকায় ৪ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতামত!

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড় আকারের ভূমিকম্প হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ডাউকি ও শ্রীমঙ্গল চ্যুতিতে ভূমিকম্প হতে পারে। তবে দেশের সীমানার বাইরে পূর্ব ও উত্তর প্রান্তে বিস্তৃত সাগাই ফল্ট ও চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফল্ট লাইনে হতে পারে বড় আকারে ভূমিকম্প।

ভূ-তত্ত্ববিদদের মতামত!

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া ফল্ট লাইনের একটি অংশ ভারত মহাসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং অপর অংশ ভারতের আসাম মেঘালয় হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

সুনামির আশঙ্কা

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুন্ডা খাতে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পে হয়েছিল ভয়াবহ সুনামি, যা ছিল এই ফল্ট লাইনের বর্ধিতাংশে।

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ১০টি ভবন হেলে পড়ে অর্ধশত আহত!

‘গতো বুধবার’ (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রচন্ড ভূকম্পন হলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন আংশিক হেলে পড়ে। এতে সর্বত্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ভবন থেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছে।

ঝুঁকিতে তিনটি ভবন !

এসব ভবনের মধ্যে তিনটি ভবন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) গঠিত কমিটির পর্যবেক্ষণে পাওয়া গিয়েছে।

ভবন ভেঙ্গে ফেলার পরামর্শ !

গতো বৃহস্পতিবার বিকালে কমিটির সদস্যরা নগরীর হালিশহর বি-ব্লকের এলাকায় হেলে পড়া দুটি ভবনের মালিকের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদেরকে ভবন দুটির আংশিক অংশ (যে অংশটুকু একসঙ্গে লেগে গেছে) ভেঙ্গে ফেলার পরামর্শ দেন।

তদন্ত কমিটি গঠন !

গতো বুধবার (১৩ এপ্রিল) রাতেই সংস্থার চেয়ারম্যানের নির্দেশে সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম খানকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন, সিডিএ’র দুই কর্মকর্তা মো. শামীম ও মো. ইলিয়াছ।

সোমবার গঠিত হবে টেকনিক্যাল কমিটি !

গতো বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) পরিদর্শন শেষে অপর ৭টি ভবনের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য আগামী সোমবার (১৮ এপ্রিল) প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে আরও একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হবে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

সিডিএ’র চেয়ারম্যান আবদুস ছালাম সিটিজিবার্তা২৪ডটকম কে বলেন, নগরীতে ভূমিকম্পে হেলে পড়া ভবনগুলো কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তা দেখার জন্য সরেজমিন পরিদর্শন করেছে তদন্তকারী দল। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে বুয়েট এবং চুয়েট প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে আমরা একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করব। কমিটি যে মতামত দেবে তার ভিত্তিতে সিডিএ ব্যবস্থা নেবে।

তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞের মতামত ছাড়া কোনো বিল্ডিং ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ আমরা দিতে পারি না

তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শাহীনুল ইসলাম খান সিটিজিবার্তা২৪ডটকম কে বলেন, গতো বুধবার (১৩ এপ্রিল) ভূমিকম্পে হেলেপড়া নগরীর ১০ টি ভবন আমরা পরিদর্শন করেছি, মালিক পক্ষের সাথে কথা বলেছি। এসব ভবনের ছবি তুলেছি। কোনটা কি অবস্থা এবং কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ সেই রিপোর্ট নিয়েছি। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশেষজ্ঞ টিমের কাছে উপস্থাপন করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।

এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, আমরা কোন ভবন ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়নি। হালিশহরে যে দুটি ভবন একটির উপর আরেকটি বেশি হেলে পড়েছে, শুধু হেলেপড়া অংশটুকু ভেঙ্গে ফেলতে বলেছি মালিককে।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image