মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন পাঁচটি গণকবরের সন্ধান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

বৃহস্পতিবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন পাঁচটি গণকবরের সন্ধান

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির অনুসন্ধানে মিয়ানমারে নতুন পাঁচটি গণকবর চিহ্নিত হয়েছে। রাখাইনের গু দার পাইনের একই এলাকার ওই পাঁচ গণকবরে চার শতাধিক মানুষের মরদেহ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২৪ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নতুন গণকবরের সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এপি। নিপীড়নের অভিযোগকারীদের কেউ কেউ নিজেদের দাবির পক্ষে সময়-চিহ্নিত ভিডিও সরবরাহ করেছে। পরে নির্দিষ্ট ওই অঞ্চলে গিয়ে অনুসন্ধানের চেষ্টা করলেও প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকায় ব্যর্থ হয় এপি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গণকবর থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পায়নি এপি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের সঙ্গে মিলিয়ে র্নিধারিত ওই গ্রামগুলোর স্যাটেলাইট ইমেজ সংগ্রহ করে তারা। সংগৃহীত ছবির সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার মিল পাওয়া যায়। সবমিলে গণকবরের ব্যাপারে নিশ্চিত হয় তারা।

এপিকে যারা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই গু দার পাইনের উত্তরাঞ্চলীয় প্রবেশ পথের মূল রাস্তায় তিনটি গণকবর দেখেছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করেছেন, গ্রামের পার্বত্য এলাকার কবরস্থানের কাছে আরও বড় দুটি গণকবর রয়েছে। এপির প্রতিবেদককে সরবরাহকৃত ভিডিওতে তারা ওই অঞ্চলের ভৌগলিকতা নিশ্চিত করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন সৈন্যরা সেখানে রোহিঙ্গাদের একত্রিত করে হত্যা করেছে। এছাড়া গ্রামজুড়ে বেশ কিছু ছোট ছোট গণকবর থাকার কথাও জানিয়েছে তারা।

মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন পাঁচটি গণকবরের সন্ধান

ওই রিপোর্টে লেখা হয়েছে, গু দার পাইনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কতোজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এপির পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে গ্রামটি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতারা এখন পর্যন্ত ৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তবে গ্রামবাসীদের আত্মীয়দের সাক্ষাৎকার এবং গণকবর ও আশেপাশে তাদের দেখতে পাওয়া মৃতদেহের সংখ্যা বিচার করে নিহতের সংখ্যা চারশোর বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে ওই খবরে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ২৭ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের একটি এলাকায় ঝড়ের মতো প্রবেশ করে অন্তত ২০০ সেনা। মোহাম্মদ শাহ নামে এক কৃষক ও দোকানদার জানান, ‘তিনি এক নারকেল গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলো আরও শতাধিক রোহিঙ্গা। তাদের চোখের সামনেই সেনা সদস্যরা রোহিঙ্গাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিতে থাকে। যারা পালানোর চেষ্টা করছিলো তাদের গুলি করছিল। তাদের তাণ্ডবে ধ্বংস হয় বৌদ্ধদের বাড়িও। সেনাদের অনেকের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল।

বার্তা সংস্থাটি জানায়, ‘মিয়ানমার গু দার পাইন নামের ওই জায়গায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ঠিক কতজন মানুষ মারা গেছেন তা স্পষ্ট নয়। তবে বার্তা সংস্থা এপির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় গ্রামটি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন এখন পর্যন্ত ৭৫ জন নিহত হওয়ার কথা জানেন তারা। এপি জানায়, স্থানীয়দের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মাটি থেকে অনেক দেহাবশেষ বের হয়ে আছে। মাথা ছাড়া হাত-পা, কিংবা কঙ্কালের অংশ দেখতে পান স্থানীয়রা।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো রাখাইনের ইনদিন গ্রামে দশ রোহিঙ্গাকে হত্যার স্বীকারোক্তি দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গতকাল বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার গু দার পাইনের এসব গণকবর নিয়ে তাদের মন্তব্য জানতে এপির পক্ষ থেকে কয়েকদফা যোগাযোগ করা হলেও কোনও সাড়া পায়নি তারা। স্থানীয় পৌরসভা বুথিডংয়ের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা তুন নাইন এপিকে বলেছেন, গণকবর থাকার বিষয়ে কিছু জানেন না তারা। আর মিয়ানমার সরকার সবসময়ই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিধনযজ্ঞ অস্বীকার করে আসছে।

মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন পাঁচটি গণকবরের সন্ধান

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে, আগস্টে সহিংসতার পর বাংলাদেশে ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। গত বছর ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছিল, সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞে এক মাসেই ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন। রোহিঙ্গাকে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বলে বিবেচনা করা হয়।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইন প্রদেশে সহিংসতার পর রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা ও ধর্ষণ থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।

জাতিসংঘ এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছে। একে নিধনযজ্ঞ বলেছে যুক্তরাষ্ট্রও। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার মুখে পড়েন দেশটির নেত্রী অং সান সু চি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এখনই বিষয়টি নিয়ে কঠোর হওয়া উচিত এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, এপি প্রতিবেদন দেখে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে এগিয়ে আসা উচিত।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.