মীরসরাইয়ের গ্রামীন ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে

রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০১৫

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম 

ঢেঁকি-02মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন , মীরসরাই : বেশি দিন আগের কথা নয় মাত্র আট দশ বছর আগেও মীরসরাইয়ের প্রতিটি গ্রামে প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকি ছিল।বর্তমানে এই উপজেলার গুঁটি কয়েক গ্রাম ছাড়া এই ঢেঁকির সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। যারা এখনো ঢেঁকি ভাঙ্গা চালের গুঁড়ি দিয়ে পিঠা পায়েশ খেতে চান এবং বাঙ্গালীর হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান সে সকল পরিবারেই আজ পর্যন্ত ঢেঁকি বেঁচে আছে। মীরসরাইয়ের মায়নী, মঘাদিয়া,কাটাছড়া, ইছাখালী সাহেরখালী, ডোমখালী, করেরহাট সহ কয়েকটি গ্রামে ঢেঁকির দেখা মেলে।

‘ও ধান ভানরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, পিংকী নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া । ও ধান ভানরে, ধান বেচিয়া কিনমু শাড়ী পিন্দা যাইমু বাপর বাড়ী, স্বামী যাইয়া লইয়া আইব গারুর গাড়ী দিয়া ,ও ধান ভানরে ’’। চিরায়ত বাংলার এই গান বাঙালীর ঢেঁকির আবহ আর ঐতিহ্য জানান দেয়।গানের তালে তালে ঢেঁকিতে পার দিতেন। সোবহে ছাদিক থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি শোনা যেত ঢেঁকিতে ধান ভানার ধুপধাপ শব্দ। শুধু ধানভানা নয় পিঠাপুলি তৈরির জন্য চালের গুড়াঁ তৈরি করা হতো ঢেঁকি দিয়েই। নতুন ধান বানা, সেই ঢেঁকিতে ছাঁটা নতুন চালে পিঠার গুড়ি ।
ঢেঁকিতে চিড়া কোটা আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের অংশ জুড়েই আছে । গ্রাম গঞ্জে একটার পর একটা উৎসবের আমেজে ভরপুর থাকত। বাংলায় হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব, বর্ষবরণ,বিয়ে উৎসব,পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা পূজা, গায়ের মেলাসহ নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন হত।

সেকালে মানে বছর বিশেক আগেও বাংলাদেশের প্রতিটি গৃহস্থের একটি ঢেঁকিঘর থাকত। এক সময় গ্রামবাংলায় ধান ভানার একমাত্র যন্ত্রই ছিল ঢেঁকি। চাল ভানাসহ অন্যান্য কাজে এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক।
ঢেঁকি প্রধানত ধানের তুষ ছাড়িয়ে চাল বানানো কাঠের তৈরি কলবিশেষ। ঢেঁকিতে প্রায় ছয়ফুট লম্বা এবং ছয় ইি ব্যসবিশিষ্ট একটি কাঠের ধড় থাকে। মেঝে থেকে প্রায় ১৮ ইি উচ্চতায় ধড়ের একেবারে সামনে ২ ফুট লম্বা একটি গোল কাঠ থাকে। এটিকে মোনা বলা হয়। দুটি খুঁটির ভেতর দিয়ে একটি ছোট হুড়াকা থাকে। এ হুড়াকার ওপরই ছোট খাট একটা তিমির মত, বা সেসনা বিমানেরমত একটা কাঠ উঠা নামা করে।

images (3)পিঠা পুলি তৈরির জন্য চালের গুঁড়া বানানো হতো। হালকা শীতের আবাহনে তৈরি হতো দারুণ একটা উত্সবের আনন্দ মেলা। গ্রামে গ্রামে নতুন ফসল তোলার পর ও পৌষ সংক্রান্তিতে ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠতো গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি। গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাড়িগুলোতে ঢেঁকিঘর হিসাবে আলাদা ঘর থাকতো। গৃহস্থবাড়ির মহিলারা ঢেঁকির মাধ্যমে চাল তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতেন। গরিব মহিলারা ঢেঁকিতে শ্রম দিয়ে আয় রোজগারের পথ বেছে নিতেন। ঢেঁকিতে কাজ করাই ছিল দরিদ্র মহিলাদের আয়ের প্রধান উৎস।

একজন ঢেঁকিতে পাড় দিত আর একজন ঢেকির সেই ওঠানামার তালে তালে হস্ত স ালন করে বিপদজনক অবস্থায় তার ভেতর হাত দিয়ে ধান নেড়ে চাল তৈরিতে সাহায্য করতো। এ কাজে অসতর্কতার জন্য কাউকে কাউকে ব্যাথাও পেতে হতো। এসময় তার চার পাশে হাস মুরগীরা জড়ো হতো খুদ কুড়া খাওয়ার জন্য। এ ছিল এক আনন্দ।

প্রবচনেও একদা শোনা যেত ‘‘চিরা কুটি, বারা বানি, হতিনে করইন কানাকানি । জামাই আইলে ধরইন বেশ, হড়ির জ্বালায় পরান শেষ’’।
সত্যি কথা বলতে গেলে ঢেঁকির কথা আজ যেন রূপকথার গল্পের মতো করে শুনতে হয় আমাদের নতুন প্রজন্মকে। আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো এটা স্বপ্নের মত মনে হবে।অত্যাধুনিক যুগে এখন গৃহবধূরা ঢেঁকির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক মেশিন (মোটরে) দ্বারা আটা কোটার কাজ সেরে ফেলছে।
ঢেঁকি হারিয়ে গিয়ে এর ব্যবহারও বিলুপ্ত । একদা গ্রামের বাড়িতে ঢেঁকি থাকা ছিল অনেকটাই বনেদী সমৃদ্ধ গৃহস্থ পরিবারের পরিচয় বহন করত।

এখন কালের পরিক্রমায় আমাদের ঐতিহ্যের ঢেঁকি বিলুপ্ত। তাই গ্রাম বাংলার গৃহস্থ বাড়িতে এখন আর শোনা যায়না ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ।কথায় আছে “ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে” বাংলার এ প্রবাদ বাক্যটি বহুকাল ধরে প্রচলিত হলেও ঢেঁকি আর এখন ধান ভানে না। আমরাই সম্ভবত সেই প্রজন্ম যারা কালের গর্ভে বিলিন হতে চলা এক সময়ের নিত্য ব্যবহার্য কিছু অনুসঙ্গের শেষ সাক্ষী ! বিজ্ঞানের একেক চমক জাগানিয়া আবিষ্কারের ফলে এক সময়ের অপরিহার্য অনুসঙ্গ গুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কালের অতল গর্ভে ।বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে।

মাছে ভাতে বাংগালীর ঘরে এক সময় নবান্নের উৎসব হতো ঘটা করে। উৎসবের প্রতিপাদ্যটাই ছিল মাটির গন্ধ মাখা ধান। ঢেঁকি ছাটা ধানের চালের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন। রাতের পর রাত জেগে শরীরটাকে ঘামে ভিজিয়ে ঢেকিতে ধান ভানার পর প্র্রাণখোলা হাসি।সেই ঢেকি, অতীতের বুদ্ধির ঢেঁকির এখন প্রস্থান ঘটেছে।

যতই দিন যাচ্ছে ঢেঁকিও হারিয়ে যাচ্ছে গৃহস্থের কর্মব্যস্থ সংসার থেকে। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের কাছে অপরিচিত গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি নামক শব্দটিও। ভবিষ্যতে হয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন ঢেঁকি দেখতে চাইলে জাদুঘরে যেতে হবে।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.