রামু বাঁকখালী নদীতে ঐতিহ্যবাহী জাহাজ ভাসা উৎসবে সম্প্রীতির মেলা

কক্সবাজার প্রতিনিধি,  সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

রামু বাঁকখালী নদীতে ঐতিহ্যবাহী জাহাজ ভাসা উৎসবে সম্প্রীতির মেলা

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা উৎসব ।

খালেদ হোসেন টাপু : কক্সবাজার জেলার রামুর ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর দু’পাড়ে ছিল হাজারো নর-নারীর উপচে পড়া ভিড়। নদীতে ভাসছে দৃষ্টিনন্দন কল্প জাহাজ। বাঁশ, বেত, কাঠ এবং রঙিন কাগজ দিয়ে অপূর্ব কারুকাজে তৈরী নদীতে ভাসমান এসব জাহাজে চলছে যেন বাঁধভাঙ্গা আনন্দ। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও যুবকদল নানা বাদ্য বাজিয়ে জাহাজে নাচছে, গাইছে।

আবার কোন কোন জাহাজে চলছে বুদ্ধ কীর্তন- ‘বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘের নাম সবাই বলো রে, বুদ্ধের মতো এমন দয়াল আর নাইরে….’।

সোমবার (১৭ অক্টোবর) কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফকিরা বাজারের পূর্বপাশে বাঁকখালী নদীতে চলছিল ঐতিহ্যবাহী জাহাজ ভাসা উৎসব।

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা  উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে দুই দিন ব্যাপী উৎসবের শেষ দিনে ‘সম্প্রীতির জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার’ এ শ্লোগানে জাহাজ ভাসানোর আয়োজন করা হয়।

দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে চলে ব্যতিক্রমী এ আনন্দযজ্ঞ। দুপুরে উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশে পদক প্রাপ্ত রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের।

রামু জাহাজ ভাসা উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ জাহাজ ভাসা উৎসবকে ঘিরে সকল ধর্মের মানুষের একটি সম্প্রীতির মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। এ উৎসব এখন শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। সকল ধর্মের মানুষের এই উপস্থিতিই বলে দেয় এটি সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সাত-আটটি নৌকার উপর বসানো হয়েছে এক-একটি কল্প জাহাজ।

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা  উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

আকর্ষণীয় নির্মাণ শৈলীর কারণে খুব সহজেই এসব কল্প জাহাজ মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। প্রতিটি জাহাজেই আছে একাধিক মাইক।

ক্যাসেট প্লেয়ার, ঢোল, কাঁসর, মন্দিরাসহ নানা বাদ্যের তালে তালে জাহাজের উপরে শিশু কিশোর ও যুবকেরা নেচে গিয়ে মেতেছে অন্যরকম আনন্দে।

জাহাজ নিয়ে ভাসতে ভাসতে এপার থেকে ওপারে যেতে যেতে মাইকে চলে বৌদ্ধ কীর্তন, নাচ, গানসহ নানা আনন্দায়োজন।

বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সভাপতি, রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের জানান, আজ হতে দুইশ বছর আগে মিয়ানমারে মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ সর্বপ্রথম এ জাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করেন।

প্রবারণা পূর্ণিমার একসাথে মিলিত হবার জন্য এ আয়োজন চলতো। সেখান থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলাতে এ উৎসবের প্রচলন। প্রায় শতবছর ধরে, রামুতে মহাসমারোহে এ উৎসব হয়ে আসছে।

রামু কেন্দ্রীয় শুভ প্রবারনা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি পলক বড়ুয়া আপ্পুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক স্বপন বড়ুয়ার সঞ্চালনায় উৎসবে ধর্মদেশনা করেন ঢাকা বাড্ডা মেরুল আর্ন্তজাতিক বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ভদন্ত সুনন্দ প্রিয় থের।

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা  উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

প্রবারনা পূর্ণিমা উপলক্ষে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় জাহাজ ভাসা উৎসব। ছবি: সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলী হোসেন, রামু উপজেলা নবাগত নির্বাহী অফিসার মোঃ শাহজাহান আলী, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ সরওয়ার সোহেল, উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি মোঃ নিকারুজ্জামান, রামু থানার ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধর, রামু থানার ওসি তদন্ত মোঃ কবির হোসেন, জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা, ফতেখাঁরকুল ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদের সভাপতি প্রবীর বড়ুয়া, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুন বড়ুয়া, রামু উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া, সাংবাদিক খালেদ হোসেন টাপু।

আরো বক্তব্য রাখেন, রামু উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক তপন মল্লিক, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি অপূর্ব পাল, জাগো নারী উন্নয়ন সংস্থার সভানেত্রী শিউলী শর্মা, বৌদ্ধ নেতা দীপংকর বড়ুয়া ধীমান, বিপুল বড়ুয়া আব্বু, যুবলীগ নেতা ওসমান গনি, রামু সৈনিকলীগের আহবায়ক মিজানুল হক রাজা, রামু কেন্দ্রীয় শুভ প্রবারনা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদের সমন্বয়কারি সাংবাদিক অর্পন বড়ুয়া, অর্থ সম্পাদক কেতন বড়ুয়া প্রমুখ।

উল্লেখ্য, অর্ধশতাব্দীকাল ধরে রামুতে এ উৎসবের আয়োজন করা হলেও দুই বছর ধরে এ উৎসব উদযাপন করা হয়নি। দুই বছর পর আবার সাড়ম্বরে এ উৎসব পালন করা হচ্ছে।

মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এ উৎসব আবারও অসাম্প্রদায়িক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে।

আপনার মতামত দিন....

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.