শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি করছে ‘ডিজিটাল মাদকাসক্তি’

Friday, 23 March 2018

ctgbarta24.com

শিশু বয়সে পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসর্গ। খেলাচ্ছলেই শিশুরা বিভিন্ন শিক্ষা গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘আনন্দহীন শিক্ষা কোন শিক্ষাই নয়।’ তাই শিক্ষার পাশাপাশি শিশু বয়স থেকেই ছেলেমেয়েদের জন্য আনন্দ দানের ব্যবস্থাও করতে হবে। আর শিশুদের এ আনন্দ দানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে খেলাধুলা।
একটা সময় ছিল যখন শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ছিল। দিনের পরিক্রমায় গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই মাঠের সংখ্যা কমে আসছে। তাছাড়া বাস্তবতার কারণেই বিশেষ করে শহরে মা-বাবা শিশুদের ঘরের বাইরে নিয়ে খেলাধুলার জন্য সময় ব্যয় করতে পারেন না। অবশ্য ব্যস্ততার কারণে গ্রামেও এখন মা-বাবা শিশুদের জন্য খুব বেশি সময় দিতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়েই শিশুদের আনন্দ দানের জন্য ঘরের মধ্যেই বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। আর এ ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের ডিজিটাল গেমসই বেশি পছন্দ শিশুদের।

তেমনই একটি গল্প সায়মা আক্তারের পরিবারের। তার তিন সন্তান। রাইসুলের বয়স চার বছর। রাহিকুলের ছয়। ওরা দুই ভাই এক বোন। বোন সবার ছোট বয়স দুই। তিন বাচ্চাকে পালন পালন করতে সায়মা আক্তারের জীবন বিপর্যয়ের পর্যায়ে। একজন খেতে চাইলে আর একজন টয়লেটে যায়। আর একজন কিছু ফেলে ভেঙ্গে দেয়। এই অবস্থার মধ্যে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী ননদ দুই ভায়ের জন্য দুটি ট্যাব নিয়ে এসেছেন। এখন দুই ভাই সারাদিন তাতে গেমস খেলে। নতুন নতুন গেমস নামায়। আবার খেলা শেষ হলে নিজেরা গেমসের মতো মারামারিও করে। সায়মা আক্তারের জীবনে যেন স্বস্তি ফিরে এসেছে। এতে খাওয়া, ঘুম ও পড়াশুনা বিলম্বিত হলেও দুই ভাই তাকে আর আগের মতো যন্ত্রণা দেয় না। মাঝে মধ্যে বাচ্চাদের বেশি গেমস খেলার জন্য শ্বশুর তাকে বকা দিলেও সায়মা তাতে গা করে না।
আরেকটি গল্প শামসুন নাহারের। একটি বেসকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন নাহার। তার একমাত্র মেয়ে নূসমেলা পড়ে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে স্ট্যান্ডার্ড ফাইভ-এ। মা-বাবা দু’জনে পালা করে মেয়েকে দেখা শোনা করেন। মেয়ে অনেকটা সময় বাড়িতে একা থকে। তাকে তখন এবং বাবা-মার উপস্থিতিতেও মোবাইলে গেমস খেলায় ব্যস্ত থাকতে হয়।
শামসুন নাহার বলেন, উপায় নেই। আমরা দু’জনে ওকে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারি না। শিশু একাডেমি কিংবা ছায়ানটের মত প্রতিষ্ঠানে দিতে পারি না সময়ের অভাবে যাতে তার সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারে। খেলার মাঠ নাই…… খেলবে কোথায়। তাই সে মোবাইলে ডিজিটাল গেমস খেলতে বাধ্য হয়। আপনার শৈশবের সাথে মেয়ের এই সময়টার কোন পার্থক্য আপনি লক্ষ্য করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই ওর আবেগের চেয়ে বাস্তবতা বেশি। আত্মকেন্দ্রিক হচ্ছে।
চলার পথে, কাজের ফাঁকে বোরিং হলে নিজেও মোবাইলে গেমস খেলেন মানসুরা হোসেন। তাই মেয়েদের বারণ করেন না। তবে পড়ালেখার বিষয়ে তিনি খুব গুরুত্ব দেন। তার বাইরে ওরা আসলে কি করবে? মেয়ে বলে নিরাপত্তার জন্য ঘরেই থাকতে হয় ওদের। যেহেতু তিনি কর্মজীবী তাই তার সন্তানরা বিনোদনের জন্য বেছে নিয়েছে মোবাইলে গেমস খেলা।
এভাবেই প্রায় সবাই স্মার্ট ফোন, আইফোন, ট্যাব নিয়ে ব্যস্ত ডিজিটাল গেমসে। মার্কিন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. নিকোলাস কারদারাস এ ধরনের আসক্তিকে ‘ডিজিটাল মাদক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর হল আমাদের সমাজেও ডিজিটাল মাদকের সর্বগ্রাসী থাবা শুরু হয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত। ছোট বাচ্চাদের জন্য এ ক্ষতি আরো বেশি হয়। রাস্তায় কিংবা স্কুলে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেক শিশুর চোখে সমস্যা। শিশুকালেই চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ এই ‘ডিজিটাল মাদকাসক্তি’।
ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে শিশু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৮ বছর থেকে ১৪ বছর শিশুদের চোখের সমস্যা বাড়ছে। ডাক্তারের পরীক্ষা, রোগী ও অভিভাবকদের কথায় জানা গেল মোবাইল-কম্পিউটারে অতিরিক্ত গেমস খেলা এবং টিভি দেখার কারণে শিশুর চোখে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ব্যবস্থাপত্র দিয়ে সব অভিভাবককেই চিকিৎসকের পরামর্শ-বাচ্চাদের মোবাইল, কম্পিউটার ও টিভি থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু এর যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার ফলে ব্যবহারকারী তার পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন অভিভাবক ও শিশুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- দৈনিক কী পরিমাণ সময় তারা অনলাইন কিংবা অফলাইনে মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের পেছনে ব্যয় করে?
তাদের দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, তারা গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইসের পেছনে ব্যয় করে, যার বড় অংশই একাডেমিক বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের বাইরে। অনেকেই অফিসে কিংবা বাসায় কোনো কারণ ছাড়াই সচেতন বা অবচেতনভাবে ফেসবুকে থাকছেন। আর শিশুরা খেলছে গেমস কিংবা আসক্ত হচ্ছে পর্ণগ্রাফিতে। এভাবে হয়তো মনের অজান্তেই অনেক সময় নষ্ট করে ফেলছে। রাতে ঘুমানোর সময় এ ধরনের একটা ডিভাইস হাতে নিয়ে শুতে গিয়ে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ঘুমান। এ অভ্যাস আস্তে আস্তে ঘুম না আসার কারণে পরিণত হতে পারে। ছোট শিশুরা মোবাইলে গেম খেলে অথবা কার্টুন দেখে।
বর্তমান সময়ে শিশুরা যে ভিডিও গেমস পছন্দ করে, তার অধিকাংশ জুড়েই হিংস্রতা, মারামারি, যুদ্ধ, দখল প্রভৃতি থাকে বলে উল্লেখ করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু কিশোর ও পারিবারিক বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ডিজিটাল গেমস শিশুদের ওপর মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলে। প্রথমত তাদের মাথা ব্যথা হয়। চোখের সমস্যা দেখা যায়, শিরদারে সমস্যা দেখা দেয়। দ্বিতীয়ত-এসব গেমসে শিশুরা সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বেশিরভাগ সময় জয়ী হতে চায়। পরাজয় মেনে নেয়া বা সইতে পারার মানসিকতা তাদের তৈরি হয় না। ফলে পরাজয় না সইতে পেরে তারা নিজেরদের শেষ করার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। সামাজিকভাবে তারা বিকশিত হয় না।
তিনি বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ শিশু আত্মকেন্দ্রীক হয়ে বেড়ে ওঠছে। এই চিকিৎসক বলেন, এ ধরনের আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে। শিশুদেরকে পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও নির্মল বিনোদন প্রদানের পরামর্শ দেন তিনি।
‘ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৬৪ শতাংশ স্কুলে খেলাধুলার কোনো ক্লাসই নেয়া হয় না। বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ নাই, ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছাকাছি খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নাই, ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু কোনো খেলাধুলাই করে না এবং ৪৭ শতাংশ শিশু দিনে গড়ে তিন ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টেলিভিশন দেখে কাটায়। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এক জরিপে ৪,২০০ শিশুর কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা জানতে চাওয়া হয়। জরিপে অংশ নেয়া ৮৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় একটি খেলার মাঠ তৈরি করে দেয়া হোক। ৭৩ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা চায় এলাকায় সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠুক। ৭৬ শতাংশ শিশু বলেছে, এলাকায় শিশু পার্ক গড়ে তোলা হোক, ৬৭ শতাংশ শরীর চর্চা কেন্দ্র, ৩ শতাংশ পাঠাগার ও ২ শতাংশ চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার কথা বলে।
মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক শিশু বিনোদনের ভয়াবহ পরিনতির চিত্র পাওয়া গেছে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে। এতে দেখা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্ণোগ্রাফি দেখে। প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অষ্টম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ঢাকার ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ছেলে শিশুরা সব সময় যৌন মনোভাব সম্পন্ন থাকে। যা নারীর জন্য যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এজন্য শিশুদের কল্পনাশক্তি, চিন্তা শক্তিও বাড়ানোর ওপর জোর দেন বাংলাদেশে পাপেটশো-এর প্রর্বতক ও শিল্পী মোস্তাফা মনোয়ার। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে মায়েরদের বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদেরকে গল্প শোনাতে হবে। চিত্রকলা, গান, নাচ প্রভৃতির সাথে যুক্ত করতে হবে। নগরে খেলার মাঠ, বেড়ানোসহ শিশুদের জন্য নিরাপদ বিনোদনের ব্যবস্থা করার ওপরও জোর দেন তিনি। শিশুদেরকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা গেলে, প্রযুক্তি ও অনলাইনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.