শোলাকিয়ায় বোমা হামলার বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা

নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই ২০১৬

শোলাকিয়ায় বোমা হামলার বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানে ১৮৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। প্রায় দুইশ বছর ধরে জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা এর আগে কখনও দেখেনি কিশোরগঞ্জবাসী।

‘সকাল নয়টার দিকে মুসল্লিরা যখন নামাজের জন্য শোলাকিয়ার মাঠে যাচ্ছিলেন তখন চাপাতি হাতে কয়েকজন যুবককে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখি। এসময় মাঠের পাশেই আজিমউদ্দীন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টহল পুলিশের একটি দল তাদের দিকে এগিয়ে গেলে বোমা হামলা করে দুর্বৃত্তরা। আমরা তখন প্রাণ ভয়ে যে যেদিকে পারি দৌড় মারি।’

এভাবেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের পাশে বোমা হামলার বর্ণনা দেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এবার শোলাকিয়া মাঠে প্রবেশে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি ছিল। মাঠে প্রবেশের সবগুলো পথে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। মুসল্লিদের ব্যাগ ও দেহ তল্লাশি করে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। মন তল্লাশি না করলে সাধারণ মুসুল্লিদের সাথে নির্বিঘ্নে মাঠে প্রবেশ করে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো বলে অনেকেই ধারনা করছেন স্থানীয়রা।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মাঝেও লাখ লাখ মুসল্লি মাঠে প্রবেশ করেন। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় পুরো মাঠ। সন্ত্রাসী হামলার খবর পুলিশ ও মাঠে উপস্থিত সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ জানতে পারলেও আগত মুসুল্লিদের তা জানতে দেওয়া হয়নি। সবার এমন দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই মাঠে কোনো গোলযোগ হয়নি। জামাতে ইমামতি করার কথা ছিল মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসুদের। হেলিকপ্টারযোগে তিনি কিশোরগঞ্জ এলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি মাঠে আসেননি। তিনি না আসার পরও মাওলানা সোয়েবকে দিয়ে নামাজ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করা হয়।

জামাত শেষ হওয়ার পর মাইকে যখন ঘোষণা দেওয়া হয়- ‘আপনারা পশ্চিম দিকের সড়ক দিয়ে যাবেন না।’ তখন মুসুল্লিরা ঘটনা কিছুটা আঁচ করতে পেরে এদিক-সেদিক ছুটে যান।

sholakia-attack-800x499

ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরও এমন ঘটনায় স্তম্ভিত কিশোরগঞ্জের মানুষ। পুরো জেলার পরিবেশ থমথমে। সন্ধ্যার পরই ফাঁকা হয়ে গেছে রাস্তা ঘাট। চাপা আতঙ্কা সবার মনে। এ ঘটনায় নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

প্রত্যক্ষদর্শী হাবিবুর রহমান জানান, হামলাকারীরা সংখ্যায় ৮-১০ জন ছিল। বোমা হামলার পর পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে দফায় দফায় গুলি বিনিময় হয়। হামলাকারীরা প্রথমে আজিমউদ্দীন স্কুলের আশপাশের বাড়িতে গিয়ে ঢুকে পুলিশের ওপর গুলি চালায়। এসময় পুলিশও পাল্টা অবস্থান নিয়ে গুলি করে।

হামলাকারীদের-সাথে-পুলিশের-গুলাগুলি-800x450

তিনি আরও জানান, পরে খবর পেয়ে দুপুরের দিকে পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থাগুলো মিলে এলাকাটি ঘিরে ফেলে। এসময় শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন আবদুল হান্নানের বাসা থেকে এক সন্দেহভাজন হামলাকারীসহ দুজনকে আটক করে পুলিশ। এছাড়া আরেক সন্দেহভাজনকে শোলাকিয়া মাঠের পাশ থেকেই আটক করা হয়েছে।

শোলাকিয়া-হামলাকারি-নিহত-800x450

তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ স্থানীয় বাবুল নামে নিরাপরাধ একজনকে আটক করেছে। পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতে ঢুকে পড়ে। বাবুলের বাসাতেও সেরকম একজন ঢুকে পড়েছিলো। পুলিশ শুধু শুধু বাবুলকে আটক করেছে বলে প্রতিবেশীরাও জানান। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

গ্রেফতার-শোলাকিয়া-হামলাকারী-800x450

এব্যাপারে সাবেক অধ্যক্ষ ও জেলা স্কাউটের কমিশনার রবীন্দ্রনাথ চৌধুরী বলেন, শোলাকিয়া মাঠে তিন লাখেরও বেশি মুসুল্লি অবস্থান করছিল। তারা যদি মাঠে প্রবেশ করে নাশকতামূলক কাজ বা গোলযোগ সৃষ্টি করতো তা হলে কয়েক হাজার মানুষ পদদলিত হয়ে মারা যেত। চেক পোস্টে সন্ত্রাসীরা ধরা না পড়লে মাঠে হাজার হাজার লাশ পড়তো।

কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সস্পাদক এ্যাডভোকেট এম. এ আফজল বলেন, সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিল মাঠে প্রবেশ করা। পুলিশের তল্লাশির কারণে তারা মাঠে প্রবেশ করতে পারেনি।

কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ সাদী জানান, ধৃত সন্ত্রাসী জিজ্ঞাসাবাদে যেসব কথা বলেছে,তাতে স্পষ্ট এই হামলা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। ঈদগাহের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনি থাকায় জঙ্গিরা মূল মাঠে প্রবেশ করতে না পেরে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। দুই জন পুলিশ জীবন দিয়ে মাঠের হাজার হাজার মুসুল্লির জীবন রক্ষা করেছেন। জেলাবাসী নিহত পুলিশ সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

boom-blast_kishorgonj_sholakia_20160707-800x487

মুুক্তিযুদ্ধের গবেষক জাহাঙ্গীর আলম জাহান বলেন, আমরা শুধু পুলিশের নেতিবাচক দিকটাই দেখি। কিন্তু পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় জীবন বিপন্ন করতে পারে তার প্রশংসা কেউ করি না।শোলাকিয়ার মতো বৃহত্তম ঈদ জামাতে নাশকতা চালিয়ে ব্যাপক প্রাণহানির মাধ্যমে জঙ্গি গোষ্ঠি সারা বিশ্বকে তাদের শক্তিমত্তার জানান দিতে চেয়েছিল। আইন-শৃংখলা বাহিনী নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই অপচেষ্টা প্রতিহত করতে পেরেছে।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.