ডিবি পরিচয়ে থামছে না ছিনতাই, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম নিউজ ডেস্ক

রোববার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৭

ভুয়া ডিবি

ভুয়া ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইকালে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে ছিনতাইয়ের পর ভুক্তভোগীদের মামলাগুলোর অগ্রগতি তেমন একটা হচ্ছে না। আবার কোনোভাবে থামছেও না এই অপরাধ। সারা দেশে প্রায়ই ঘটছে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা। এসব ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে এবং কোন চক্রের সদস্যরা জড়িত তাও পরিস্কার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্ধকারেই থেকে গেছে ডিবি পরিচয়ে লোকজনের কাছ থেকে টাকা ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের রহস্য।

ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনে করে ফেরার পথে ঘটেছে এসব ঘটনা।

চলতি বছর খোদ রাজধানীতেই ডিবি পরিচয়ে টাকা ছিনতাইয়ের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে মামলাও হয়েছে। কিন্তু মামলাগুলোর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। নেই কোনো আটক বা টাকা উদ্ধারের মতো পুলিশের সফলতার গল্প। তবে প্রত্যেকটি ঘটনার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুদিন অভিযান চালিয়েছিল। আবার সেই পুরোনো গল্প।

চলতি বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেগুনবাগিচাসহ কয়েকটি জায়গায় ডিবি পরিচয় টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে টোকিও মোড কোম্পানির চালক ও হিসাবরক্ষকের গাড়িতে জোরপূর্বক উঠে ৪০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিও ঘটনার দিন ব্যাংক থেকে ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করে অফিসে ফিরছিলেন।

ওইদিন ছিনতাইকারীরা প্রত্যেকে ডিবি পরিচয় দিয়েই তাদের গাড়িতে উঠেছিলেন বলে জানিয়েছেন ছিনতাইয়ের শিকার রবিউল ও ফিরোজ।

তারা জানিয়েছেন, ডিবি পরিচয়দানকারী ওইসব ছিনতাইকারীর প্রত্যেকের হাতে একটি করে ওয়াকিটকি, রিভলবার ও হ্যান্ডকাপ ছিল। তাদের দুজনকে মারধর করার পর গাড়িতে থাকা ৪০ লাখ টাকার ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে ছিনতাইকারীরা একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে উঠে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়েছে।

বিমানবন্দর থানার ওসি নুরে আজম মিয়া বলেন, মামলার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। কে বা কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখন পর্যন্ত বের করা সম্ভব হয়নি। তবে খুব শিগগির ঘটনাটির রহস্য উন্মোচিত হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে টাকা খোয়া যাওয়া কোম্পানির ম্যানেজারসহ ছিনতাইয়ের শিকার দুই ব্যক্তিকেও ডাকা হয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর থেকেই মাঠে নেমেছে ডিবি, র‌্যাব, সিআইডিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বাহিনীরা। কিন্তু ঘটনার চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। টাকাও উদ্ধার হয়নি। আর কোনো সংঘবদ্ধ চক্র এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তাও অজানা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা জোনের এসি মিশু বিশ্বাস বলেন, ‘তদন্তে আমরা প্রথমে তাদের অফিসের কেউ জড়িত আছে কিনা সে বিষয়টি নিয়ে এগুচ্ছি। এছাড়াও ওই ব্যাংককে কোনো এক ব্যক্তি কোম্পানির হিসাবরক্ষক ফিরোজকে ফলো করেছিল। পরে ওই ব্যক্তি তাদের গাড়িতে ওঠেছিল। ওই ব্যক্তিটি কে এবং তাদের গতিবিধি পাওয়ার জন্য আমরা ওই এলাকার বিভিন্ন রাস্তার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছি। টিম এখনো মাঠে কাজ করছে দেখা যাক কী হয়।’

টাকা খোয়া যাওয়া টোকিও মোড কোম্পানির ম্যানেজার রাসেল হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের আজ (বৃহস্পতিবার) ডিবি অফিসে ডাকা হয়েছিল। তারা রবিউল ও ফিরোজের কাছ থেকে ঘটনাটি কীভাবে এবং কোন এলাকায় ঘটেছে তার বর্ণনা শুনেছেন।’

তিনি জানান, বুধবার সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থানায় কোম্পানির পরিচালক আকতার হোসেন বাবুল বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় আসামীরা অজ্ঞাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কিছু ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ দাবি করেছিল, তারাই মূলত ডিবি পরিচয়ে এসব অকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এ জন্য তারা বিভিন্ন অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করছে বলেও জানানো হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, পুলিশের গোয়েন্দা টিমের সদস্যরা এসব ঘটনায় কখনোই জড়িত নন। ডিবি পুলিশের সব বৈশিষ্ট্য হুবহু নকল করে ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

ভুয়া ডিবি

রাজধানীতে আটককৃত ভুয়া ডিবির কয়েকজন সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএমপির এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন দাবি করেছিলেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সবুজবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১ ভুয়া ডিবি পুলিশকে আটক করা হয়েছে। এসব আটককৃত ব্যক্তি ডিবি পরিচয়ে মানুষকে গাড়িতে তুলে টাকা-পয়সা আদায় করত।

এছাড়াও গত ১৭ জুন রাজধানীর কাওরানবাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, রাজধানীর ধানমন্ডির সোবহানবাগে অভিযোগ চালিয়ে ৮ ব্যক্তিকে ডিবি পরিচয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ আটক করেছে র‌্যাব-২। চক্রটির কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি, চাপাতি, ওয়াকিটকি, জ্যাকেট, হ্যান্ডক্যাপ উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছিল।

তবে ভুয়া ডিবি পরিচয় এসব ঘটনা হচ্ছে বলে পুলিশ ও ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও সে দাবি অনেক সময়ই খাটছে না। ডিবির সদস্যরাও এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে তা প্রমাণও হচ্ছে। যেমনটি ঘটেছে কক্সবাজারের টেকনাফে।

গত ২৬ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফে এক ব্যক্তিকে অপহরণের অভিযোগে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাতজনকে নগদ ১৭ লাখ টাকাসহ আটক করেছে নিরাপত্তাবাহিনী। অপহৃত ব্যবসায়ীর নাম আবদুল গফুর। তিনি কম্বলের ব্যবসা করেন। তার বড় ভাই টেকনাফ পৌরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মনিরুজ্জামান জানান, তার ভাইকে কক্সবাজার থেকে ডিবির একটি দল অপহরণ করেছিল। আটক করে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। তখন তারা টাকা দিতে রাজিও হয়। তবে টাকা দেওয়ার বিষয়টি টেকনাফ সেনাবাহিনীকে অবহিত করে।

ভুয়া ডিবি

কক্সবাজারের টেকনাফে ৭ লাখ টাকা ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় আটক ডিবি সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

সর্বশেষ উত্তরার ঘটনা ছাড়াও চলতি বছরের শুরুর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সামনে থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীর ৭ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়েছিল।

সেদিন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. আজমের বন্ধু সংগীত পাল জানিয়েছিলেন, রিকশায় তারা যাওয়ার পথে শহীদুল্লাহ হলের সামনে তিন যুবক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়। এ সময় তারা রিকশার গতিরোধ করে। ব্যাগে অস্ত্র আছে বলে দাবি করে তারা তল্লাশি চালায়। এ সময় এক যুবক পিস্তল বের করে আজমের বুকে ঠেকিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ওই ব্যক্তি শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছিলেন। কিন্তু সেই মামলার তদন্ত আজও চলছে। এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার বা টাকাও উদ্ধার হয়নি।

আবার কোনো ব্যক্তি ছিনতাইয়ের শিকার হলেও সেই ঘটনায় থানায় মামলা না নেয়ার ঘটনাও রয়েছে।

গত ৮ আগস্ট রাজধানীতে সেগুনবাগিচার ১২ তলার আয়কর ভবনের সামনে জীবন (২২) নামে এক যুবক দেড় লাখ টাকা ছিনতাইয়ের শিকার হন। সেদিনও ডিবি পরিচয়ে তার কাছ থেকে ওই টাকাগুলো ছিনতাই করা হয়েছিল। ঘটনার পর এ অভিযোগে রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। ফলে খোয়া যাওয়া টাকা আর ফিরেও পাননি সেই জীবন।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দুই একজন ব্যক্তিকে আটক করে ভুয়া ডিবির সদস্য বলে দাবি করলেও জনগণের হাতেই বেশি আটক হচ্ছেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা। বছরের প্রথম দিকে ডিবির সদস্য পরিচয়ে ছিনতাই করার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সামনে থেকে ধরা পড়েন এক ব্যক্তি। এসময় ছিনতাই করা এক লাখ টাকাও উদ্ধার হয়।

১৯ অক্টোবর জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার সাজাপুর এলাকায় ডিবি পরিচয়ে টাকা ছিনতাইয়ের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ৬ জনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন এলাকাবাসী। ওইদিন দুই প্রবাসী আক্কেলপুর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ লাখ টাকা উঠিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় দু’টি প্রাইভেটকারে করে ডিবি পুলিশের পোশাক পড়া ৬ জন লোক টাকাসহ হাতকড়া পড়িয়ে গাড়িতে তুলে নেয় একজনকে। কিছু দূর যাওয়ার পর টাকা কেড়ে নিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় তাকে। এ সময় স্থানীয়রা চিৎকার শুনে গাড়িটির গতিরোধ করে। পরে গ্রামবাসী গাড়ি দু’টিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং আটককৃতদের গণপিটুনি দেয়।

এছাড়া ৮ অক্টোবর নওগাঁর পত্নীতলায় এক ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে বাড়ি ফেরার পথে ডিবি পরিচয়ে পথরোধ করা হয়। পরে তার কাছে থাকা টাকা ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে আটক করে স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রিয়.কম

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.