সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘পর্ণাসক্তি’- ‘সমাজের একটি ভয়াবহ ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত যা কিনা মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে নিয়ে যায় একেবারে নিম্নস্তরে। একজন মানুষের চিন্তাভাবনাকে পুরোটাই যৌনতায় ঘিরে ফিলে তাকে করে তোলে নৈতিক মূল্যবোধহীন একটি সৃষ্টিতে।’
কিন্তু অতি সাম্প্রতিককালে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে কেবল ‘ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড’ গ্রুপ না এমন আরো হাজার হাজার ক্লোজগ্রুপ ও পাবলিক গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের পেজে রাস্তায়, গণপরিবহনে, চলার পথে গোপনে ক্যামেরা দিয়ে নারীদের ছবি তুলে সেটা ফটোশপ করে প্রকাশ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে অশ্লীল বক্তব্যও।
এসব গ্রুপেট ধরন ও বিবরণ দিতে গিয়ে ‘জাস্ট ফান’ লেখা থাকলেও সেটা শেষমেষ আর কৌতুকে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্যক্তিগতভাবে সেই নারীর নাম ঠিকানা খুঁজে বের করে চলছে ব্ল্যাকমেইলিং। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা বলছেন, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
এমনই একটি গ্রুপ ‘ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড’-এর তিনজন অ্যাডমিনকে গত বুধবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কলাবাগান পান্থপথ থেকে আটক করার পর থেকে এ ধরনের আরও যে গ্রুপগুলো আছে, সেগুলোর তালিকা ও বিষয়বস্তু কর্তৃপক্ষের নজরে আনার কথা উঠছে।
এসব গ্রুপে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে একাধিক নারী জানিয়েছেন, কোনও নারীর ব্যক্তিগত ভিডিও ছাড়া হলে গ্রুপের সদস্যরা তার নাম ঠিকানা জানতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরিও ভিকটিমকে হয়রানি করা হয়। এমনকি ইনবক্স ভরে যায় অশ্লীল বক্তব্যে। এ নিয়ে গ্রুপগুলো সরাসরি তাদের বিধিতে ভালো ভালো কথা লিখে রাখলেও সেটি কেবল লোক দেখানো।
আপনারা কেন এই গ্রুপে আছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আমার ছবি বা আমাদের নিয়ে কিছু করল কিনা, সেটা নজরদারিতে রাখার জন্য কৌশল হিসেবে গ্রুপে আছি। আমার অনেক বন্ধু ছেলের নাম নিয়ে গ্রুপে আছে।’
আরো বিস্তারিত পড়ুন: ডিএসইউ গ্রুপের ৮ তরুনীসহ ১৬ অ্যাডমিনের খোঁজে পুলিশ
এমনি একজন শায়লা (ছদ্মনাম) জানান, তার প্রোফাইল ছবি থেকে ছবি নিয়ে এডিট করে ফেক আইডি খোলা হয়। তারপর সেই আইডি থেকে এমন সব স্ট্যাটাস দেওয়া হয় যে, সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এমনকি তাকে কলগার্ল হিসেবে পরিচয় করিয়ে তার ফোন নম্বর ট্যাগ করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সে মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়ে এবং সামাজিকভাবে হেয় হতে থাকে যে, দীর্ঘদিন সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেনি।
বিয়ের আগে যার সাথে এফেয়ার ছিলো সে বয়ফ্রেন্ড ও তার বন্ধুদের এমন আক্রোশের শিকার হন আনুশাহ (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে বিয়ে করার সির্ধান্ত নিয়ে বাসা ছেড়ে বের হয়ে তার কাছে যায়। সে আমাকে তার পরিবারের অমতে এবং সই সময়ে বিয়ে করতে পারবেনা বলে ফিরিয়ে দেয়। আমি নিরুপায় হয়ে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করার পর। সে আমার স্বামীকে নিয়ে ভীষণ ক্ষোভ প্রকাশ করে। এরপরে আমাকে হুমকি দিতে থাকে। সে আমার একটি ভিডিও এরকমই একটি গ্রুপে ছেড়ে দেয়। এরপর তারা ঠিকই আমাকে খুঁজে বের করে এবং আমার বাসার ঠিকানায় আজেবাজে জিনিস পাঠানো, অনলাইনে নানা প্রস্তাব দিতে শুরু করে। এমনকি আমার ছবি দিয়ে আলাদা একটা অ্যাকাউন্টও খুলে ফেলে। এ নিয়ে আমার সাথে সংসারে ভুল বোঝাবুজি হয়ে পরবর্তীতে নেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে প্রায় বছর খানেক আমি ফেসবুক থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হই।’
এসব গ্রুপের ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে কেউ কোনও ধরনের প্রতিবাদ করলে তার ফেসবুক আইডি গ্রুপে শেয়ার করে। একের পর এক রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর এসব গ্রুপে কয়েক লাখ সদস্য থাকার কারণে সেটি অনেক সহজ হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অন্তত কয়েক হাজার গ্রুপ আছে, সেগুলো নারীদের হয়রানিমূলক পোস্ট দিয়ে ‘মজা’ নেয়। ডেসপারেটলি সিকিং আনসেনসর্ড গ্রুপের অ্যাডমিনদের আটক করার পর ওইসব গ্রুপে আলোচনা অব্যাহত আছে। তবে একটু সাবধানে ‘মজা নেওয়ার’ অনুরোধ করা হয়েছে অ্যাডমিনদের পক্ষ থেকে।
‘ডিএসইউ’ এর নামেই অন্তত বিশটি সক্রিয় গ্রুপ আছে। এদের বিভিন্ন পোস্টে নারীকে হয়রানি করা যায় এমন উপাদান থাকে। এছাড়া ঐতিহ্য১৮+, ফেসবুক কুয়ারা ছেলে ভারসেস মেয়ে, ফেসবুক তামাশা, ফরমালিন পোলাপাইন নামের গ্রুপগুলোতে ১৩-৩৫ পর্যন্ত ফেসবুক ব্যবহারকারীরা হরহামেশাই ‘ফান’-এর নামে হয়রানি করছে।
জাস্টিস ফর উইমেন নামের সংগঠনটি এর আগেও ফেসবুক কুয়ারা, ফেসবুক তামাশা নামে পেজ বন্ধ করানোর ব্যবস্থা নেয়। সংগঠনটির সক্রিয়কর্মী ইফরিত জাহিন কুঞ্জু বলেন, ‘ডিএসইউ এর অ্যাডমিনকে আটকের পর থেকে প্রচুর ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন তাদের গ্রুপের নাম বদল করেছে। কেননা, তারা যা প্রচার করে সেটা নজরদারির মধ্যে এলে তাদের বিরুদ্ধেও একই উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে হাজার-হাজার পেজের ঠিকানা আছে, সেই পেজগুলো থেকে হয়রানির শিকার হওয়া মেয়েদের অভিযোগও আছে। এগুলো মোটেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো অভিযোগ না।’
এসব বিষয়ে বিশিষ্ট অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘এটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। ইন্টারনেট ব্যবহার বিধি না জানার কারণে কেবল মজা করতে গিয়ে বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ। এটা সংক্রমিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান দেওয়ার প্রবণতা কমে আসার ফলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব গ্রুপের এমন কাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
এদিকে এই গ্রুপগুলো বন্ধ করার বিষয়ে কোনও উদ্যোগ আছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধের সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল সুমন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধী অনেক। প্রতিদিন অনেক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। আমরা সাধ্যমতো সবাইকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’
সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ টিমের এ কর্মকর্তা আরো জানান, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে যেন মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, কেউ কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ না করে, সেদিকে পুলিশের মনিটরিং রয়েছে। আপনাদেরো যদি এমন ককিছু নজরে আসলে আমাদের জানিয়ে সহযোগীতা করুন আমরা ব্যাবস্তা নেবো।’








