শান্তি, করুণা ও শুভকামনা‬

ctgbarta24.com
Share

শুক্রবার, ২০ মে ২০১৬

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

IMG_20160520_144258

রনিয়া রহিম: আমি যখন প্রথম প্রথম হিজাব পরা শুরু করি, একটা জিনিসে খুব থতমত খেয়ে যেতাম। চিনি না শুনি না, বিশাল স্কুলের ক্যাম্পাসে কিংবা রাস্তাঘাটে কোথাও হাঁটছি, আর মানুষজন আমাকে সালাম দিতো। এতদিনে অভ্যাস হয়ে গেছে, কিন্তু পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যদি কেউ ‘হাই/হ্যালো’র মত সালাম দিয়ে চলে যায়, প্রথমদিকে বুঝতেও পারতাম না আমার উদ্দেশ্যে কেউ কিছু বলছে। বুঝতে বুঝতে দেখা যেতো সে মানুষটা গায়েব, -এভাবে আমার অনেককেই আর কখনো উত্তর দেয়া হয়নি!

হিজাবের এই দিকটা খুব সুন্দর লাগতো আমার কাছে, এরকম সালাম শুনতে পাওয়াটা। এখনো ভালো লাগে; এখন আমি নিজেও হিজাবী কারো সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলে সালাম দেই, সেও দেয়; মজাই লাগে আমার কাছে, অনেকটা যেন স্পাই সিনেমাগুলোর সিক্রেট হ্যান্ডশেকের মতো!!

আমাকে জুম্মাহ’র নামাজ পড়তে ডেকেছিলো একজন। একবার না, বারবার ডাকতো। প্রত্যেক শুক্রবার সকাল বেলায় বলতে আসতো। আমার আমেরিকান হাইস্কুলের আমি তখন শেষ বছরে, এই ছেলেটা আমার চাইতে এক ক্লাস নীচে ছিলো, কিন্তু সেটা স্কুলবর্ষের ক্ষেত্রে। এদেশে একটা সময়ের পর বিভিন্ন বছরের ক্লাসগুলো’ও এক হয়ে যায় মাঝে মাঝে, এই ছেলেটার সাথে সকালের প্রথম ক্লাসটা কমন ছিলো। আমি তখন হিজাব পরতাম না, কিন্তু অতবড় স্কুল’ও ছিলো না যে একেবারে অচেনা ছিলাম। আমার নামগুণেই হোক, বা কোন এক কথোপকথন থেকে (মনে নেই) সেই ছেলেটা জানতো আমি মুসলমান। কমবেশি আমাদের কথাবার্তা শুরু হতো তার দেয়া সালামে, আর শেষ হতো জুম্মাহ’র দাওয়াতে।

মাঝে মাঝে কেউ কেউ যখন ধর্মকথা বলতে আসে, অযাচিত লাগে, তাই শোনার আগ্রহও থাকে না (খালি ধর্মকথা কেন, যেচে পড়ে যদি জোর করে আমাকে কমলালেবু খাওয়াতে চান, কমলা আমার প্রিয় হলেও আমি বেশ বিরক্ত হবো আপনার উপর!)। এই ছেলেটার মধ্যে তেমন কিছু ছিলো না। স্কুলে সে’ই জুম্মাহ’র নামাজের ব্যবস্থা করতো, তার বয়স কত তখন? ১৬ মাত্র? আর এই বয়সে স্কুলের মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের জন্য সে স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমাদের লাঞ্চ আওয়ারটা আরেকটু লম্বা করার ব্যবস্থা করিয়েছে, রুম ঠিক করেছে যেখানে নামাজ পড়তে পারি, আর কেউ নামাজ পড়াতে না আসতে পারলে সে নিজেই ইমামতি করে;ঐ বয়সে আমার নিজের ধর্মের প্রতি আগ্রহ না থাকা মনটা ভীষণ চমৎকৃত হয়েছিলো! আমিই তাকে প্রত্যেকবার বলতাম, “আমাকে বলো কখন কোথায় নামাজ পড়বা, আমি চেষ্টা করবো আসতে”। সকাল বেলা যখন বলতাম, তখনও ইচ্ছা হতো যাওয়ার, কিন্তু দুপুর আসতে আসতে ফাঁকি দিতাম। কিন্তু আমিই যেহেতু কখনো সরাসরি না বলিনি, বরং আগ্রহ দেখাতাম, সেও তাই প্রত্যেকবারই আমাকে সুন্দর করে মনে করিয়ে দিতো, কোন লেকচার দেয়নি কখনো, বিরক্ত হয়তো হয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করেনি সেটা। (আরো মুসলমান তো ছিলো; কাউকে যেচে কিছু বলতে গেছে এমন দেখিনি কখনো)।

একবার আমার ইচ্ছে হলো যাবো। সেদিন সম্ভবত তার কাছে শুনিনি আমি, আরেক বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নামাজটা কোথায় হচ্ছে? ততদিনে কিসব কারণে স্কুলের সেই ফাঁকা ঘরটাতে আর নামাজ পড়ার অনুমতি পেতাম না, তাই স্কুলের পাশে কারো বাড়িতে হতো। স্কুল টিচারকে ঐ ছেলেটা আগেই বলে রেখেছে, শুক্রবারে লাঞ্চ থেকে আমাদের মুসলিমদের এই কারণে ফিরতে দেরী হবে, তাই কেউ কিছু বলতো না। কারো গাড়িতে চেপে সেদিন গেলাম ওখানে; অবাক হয়ে দেখলাম, খুৎবাটা এই কিশোর ছেলেটাই পড়াচ্ছে! আমার আরো বেশি চমক লাগলো সেদিন। ধর্মটা আমার কাছে তখনও ‘বড়দের ব্যাপার’; একদিন বড় হয়ে নামাজকালাম পড়বো নাহয়, এখনই কি তাড়া? কিন্তু এই ছেলেটা নিজে থেকেই ইসলামকে এতো আপন করে নিয়েছে, এতো সহজ করে নিয়েছে, যে আমার মন – আলহামদুলিল্লাহ – তখন আপনাতেই ধর্মের প্রতি নরম হয়ে এলো।

আপনারা ইসলামের পথে মানুষকে দাওয়াত দিতে চান? সেই কিশোর ছেলেটার কাছে শিখুন; যে ছেলেটা সবার আগে নিজের জীবনে নিজের জন্যই ধর্মটাকে কাছে টেনে নিয়েছিলো, লোক দেখাতে নয়। যে মন থেকে স্রষ্টাকে খুঁজে নিয়েছিলো, সামাজিক ভয় থেকে নয়। কারো উপর বিন্দুমাত্র কোনকিছু চাপিয়ে দেয়নি, বরং তার সমবয়সীদের কাছে (-হতে পারে বড়দের জন্যেও-) ধর্মটাকে সহজ, সুন্দর আর স্বাভাবিক করে দিয়েছিলো শুধু মাত্র তার মনকাড়া আচরণ আর ব্যবহার দিয়ে!!

এই গল্পের শেষটা শুনবেন? আমার এখনো লিখতে বসলে খুব কষ্ট হয়। ওই জুম্মাহ’র খুৎবাটাই তার সাথে শেষ স্মৃতি আমার, এরপর থেকে আর কোন শুক্রবারে আমাকে সে আর ডাকতে আসেনি। কেন আসেনি জানেন? পরদিন, সেই শুক্রবারের ঠিক পরদিন যে শনিবার? সেদিনই সে গাড়ির এক্সিডেন্ট করে মারা যায়!! আমি রবিবারে খবরটা পেয়েছিলাম, তারপর অনেক, অ-নে-কদিন লেগেছিলো আমার সে শোকটা কাটিয়ে উঠতে! আমি তার কয়েক মাস পর থেকে হিজাব পরা শুরু করি; আমার মনটা সেই যে স্রষ্টার প্রতি নতুন করে ফিরেছিলো এই ছেলেটার সংস্পর্শে এসে, সেই ভাবনাগুলোই দানা বাঁধতে বাঁধতে একসময় নিজের জন্য এটাকে ঠিক লাগে আমার, তাই বেছে নেই। আর, সত্যি কথা, মাথার উপর একরত্তি একটা কাপড়ে কি যায় আসে? আমার মনটাকে যে কিছু মানুষ অনুরক্ত করেছে ঈশ্বরের প্রতি, তার মধ্যে সেই ষোলতে-থেমে-যাওয়া কিশোর ছেলেটি একজন; তার প্রতি তাই আমার কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই!!

গতকাল আমার এক প্রিয় মানুষের দেয়ালে আরেক কিশোর ছেলে বেশ কিছু রাগান্বিত কথা লিখে গেছে! তার মনে হয়েছে আমার বন্ধুটা ঈশ্বরের বিরোধিতা করেছে, তাই তাকে কিছু ‘উচিত কথা’ শোনাতে হবে। এরকম কিছু পড়লে আমার প্রচন্ড রাগ লাগে, কষ্ট লাগে, ক্ষোভ লাগে একটা! সেই ছেলেটার প্রতিও হতো, কিন্তু তার ছবিটা যেটা আবছা দেখা যাচ্ছিলো, দেখে মনে হলো বেশ বাচ্চা একটা ছেলে, কতই বা বয়স হবে? ১৫ কি ১৬? এই বয়সেই তার এতো ক্রোধ??আমার সে বন্ধুটি ইসলামের বিরোধিতা করে একটা কোন কথা বলেনি, কিন্তু যদি বলতোও বা?? ঐ কিশোর ছেলেটার আক্রোশ কি আজকাল শুধু ফেসবুকের ক্রিকেট পেইজগুলোতে বাঁধা থাকে, ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে খুন, হেনস্থা, সে খুন আর হেনস্থার সমর্থন, সবই তো হয়!!

বেশ, আমি ঐ ধর্মান্ধদের কথা আর বলছি না;আপনি যে মানুষটা খুব সাধারণ, যে মানুষটা ভালো, যে মানুষটা ফেসবুকে বা তার বাইরে কোনদিন কোন কটুবাক্য বলবেন না,আপনার ধর্মানুভূতিতে খারাপ লাগছে? সত্যি সত্যিই আপনার মন খারাপ হয়ে যায় মাঝে মাঝে যখন প্রিয় ধর্মটাকে নিয়ে হাহাহিহি হয়? মাঝে মাঝে সমাজটাকে এমন ভাবে পাল্টে যেতে দেখেন যে নিজেকে আর সেখানে খুঁজে পান না, চিনতেই পারেন না, আপনার নৈতিকতা, আর বিশ্বাসের প্রতিফলন কোথাও খুঁজে পান না, তখন দমবন্ধ লাগে, অসহায় মনে হয়? কাউকে সারল্যে নিজের বিশ্বাসের কথা বলতে গেছেন, কিন্তু নিজেকেই পাল্টা আক্রমণের শিকার মনে হয়?

আমি যখন প্রথম প্রথম হিজাব পরা শুরু করি, তখন থেকে এখনো মাঝে মাঝে কিছু কিছু প্রাণের মানুষরাই (যারা কেউ কেউ আমারই ধর্মের লোক) প্রশ্ন করা থেকে তর্ক থেকে ব্যঙ্গ পর্যন্ত করেছে। রাগ পর্যন্ত এক দুবার গিয়েছি, কিন্তু বিরক্ত হয়েছি সবচেয়ে বেশি। মাঝে মাঝে দৃঢ়ভাবে বলতে হয়েছে, দেখো, এতো প্রশ্ন করো না আমাকে, আমি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে টপিকটাই পাল্টে দিয়েছি, যেখানে আমাদের মিল আছে সেসব কিছুর উপরে ফোকাসটা রেখেছি। কাউকে কাউকে আরেকটু কড়া করে বলতে হয়েছে, আমার ধর্মরীতিনীতি তোমার মানতে হবে না; তুমি যদি বার বার একই কথা বলো তো আমরা বরং কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখি। – দিনশেষে আপনি যদি আর কারো বিশ্বাস আর জীবনধারাকে আঘাত না করে নিজেরটা ধরে রাখেন সুষ্ঠভাবে, এই একই মানুষগুলোর শ্রদ্ধাই বরং অর্জন করবেন। আপনি নিজে সহজ সুন্দরভাবে বাঁচুন, আপনাকে একটা শব্দ খরচা করে তখন ধর্মকথার দাওয়াত দিতে হবে না, মানুষ আপনাতেই আকৃষ্ট হবে; আমি যেমন সেই সহপাঠীর কথার চাইতে বেশি কাজে প্রভাবিত হয়েছিলাম। আপনার নিজস্ব স্বকীয় একটি পরিচয় দাঁড় করিয়ে নিন, অযাচিত প্রশ্নগুলো আপনাতেই অবাঞ্চিত হয়ে যাবে।

কোত্থেকে শুরু করবেন?? মিষ্টি হেসে “সালাম” দিয়েই দেখুন না! কারো উপর যদি আপনার রাগ’ও হয়, মন’ও খারাপ হয়, চেষ্টা করে দেখুন না, মনে মনে অন্তত তাকে সালামের শুভেচ্ছা’টি দিতে! পুরো বাক্যটির মানে তো জানেন? “আমি স্রষ্টা’র কাছে তোমার জন্য শান্তি, করুণা ও আশীর্বাদ কামনা করছি”; এমন মিষ্টি একটি কথা ভাববেন আর বলবেন, আপনার মনে তখন আর কোন রাগ বা ক্ষোভ দানা বাঁধবে, বলুন? আমরা চাই বা না চাই, আমাদের ধর্মের লেবাস পরে থাকে আজকাল এমন কিছু মানুষ, যারা ক্রমশ উগ্র, হিংস্র, আর একদমই অসহনশীল! শান্তির বাণী তারা ভুললে ভুলুক, আপনি বা আমি ভুলবো কেন???

রনিয়া রহিম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

একজন অনন্য অসাধারন মানুষ জেনিফার আলম: একটা মানুষ একসাথে অনেক কিছু হতে পারেন, আমেরিকার নামকরা একটি বিশবিদ্যালয় এর রিসার্চ ফেলো, ফটোগ্রাফার, উদ্যোক্তা, ফুড ব্লগার এবং এই সব পর...
একজন অনন্য অসাধারন মানুষ   সিটিজিবার্তা২৪ডটকম মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০১৬ জেনিফার আলম: একটা মানুষ একসাথে অনেক কিছু হতে পারেন, আমেরিকার নামকরা একটি বিশবিদ্যালয় এর রি...
এই রোদে রোদচশমা সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০১৬ মডেল হয়েছেন জাওয়াদ বিন ফরহাদ জেনিফার আলম : নগরজুড়ে যেই তাপদাহ চলছে এই চোখ ঝলসানো সূর্যের ...
একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ গল্প   সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০১৬ নুর আবতাহি সুজন জেনিফার আলাম: প্রথমে একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শুরু করছি, পিঙ্কি থাক...
এবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পালিত হলো পবিত্র শবে-বরাত... সোমবার, ২৩ মে ২০১৬ এবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পালিত হলো পবিত্র শবে-বরাত সিটিজিবার্তা২৪ডটকম ডেস্ক  ঃ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ ম...



Leave a Reply