সোমবার,২৪ এপ্রিল ২০১৭
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম : ভৌগলিক অবস্থানগত কারনে প্রাকৃতিকভাবে আমাদের চট্টগ্রাম শহর পৃথিবীর অন্যান্য যেকোন শহর থেকে অালাদা। এই শহররে পাহাড় এবং টিলা থাকায় প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হয় প্রায় ৭৫-৮০ টির মত ছোট বড় খাল। চট্টগ্রাম মহানগরী ঘোষিত হওয়ার পরেও নতুন করে কোন খাল খনন করা হয়নি। তার উপর প্রকৃতির দান এই খালগুলো দখল করে আবাসিক ও বানিজ্যিক ভবন নির্মান করেছে রাঘব বোয়ালেরা। যে কারনে সৃস্টি হয়েছে পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা। যার কারনে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে সৃস্টি হচ্ছে জলজট। চট্টগ্রাম অন্যন্য নিম্নাঞ্চলের মত দুই নম্বর গেইট থেকে বহদ্দার হাট পর্যন্ত এলাকার রাস্তা কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারন হচ্ছে নাসিরখাল দখল করে উপরে পাটাতন নির্মান ও ভবন তৈরী।
নগরীর বৃহত্তর নাসিরাবাদ এবং বায়েজিদ এলাকার পানি নাসিরখাল হয়ে চাক্তাই খালে মিশেছে। শপিং কমপ্লেক্স এর সামনে নাসিরখালের গতি পরিবর্তন হওয়ায় উজান থেকে বয়ে অাসা পানি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বাধা প্রাপ্ত হয়ে দুই নম্বর গেইট থেকে বহদ্দার হাট পুলিশ বক্স পর্যন্ত এলাকা প্লাবিত করছে। শহরের অন্য প্রান্তে মহেশ খাল দখল ভরাট ও এর শাখা খাল সমুহ দখল করায় সামান্য বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বৃহত্তর অাগ্রবাদ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে চাক্তাই খালের তলা পাকা করে চাক্তাই খালকে চিরতরে বন্ধ্যা করা হয়েছে। এই খালের গভীরতা বাড়ানো এখন অসম্ভব। মূলত ১৯৯৫ সালে ইউএনডিডি ও ইউএসসিএইএসের সহায়তায় বিজিডি চুক্তির আওতায় যে ‘চিটাগাং স্ট্রম ওয়াটার, ড্রেইন অ্যান্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টার প্ল্যান-১৯৯৫’ প্রণীত হয় তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আজকের এই দুর্ভোগের প্রধান কারন।
১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ এই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছিল। সে অনুযায়ী ৯২ বর্গমাইল এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, ভূমির ভৌগোলিক অবস্থান, খাল-নালার ক্যাচমেন্ট এরিয়া ও গতিপথ বিবেচনা করে ১০টি স্টাডি বিভক্ত করা হয়েছিল। খাল ও নালার পানিপ্রবাহের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সেসময় তিনটি শ্রেণিতে ভাগও করা হয়েছিল। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে পাঁচটি নতুন খাল খনন, দ্বিতীয় ধাপের প্রথম পর্যায়ে ১৪টি খাল সংস্কার ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪টি খালের সংস্কারের কথা ছিল। একই পর্যায়ে নাসিরখাল, চাক্তাই খাল, মির্জা খাল, শীতল ঝরনা ছড়া, হিজরা খাল ও নোয়াখালের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৯ টি সিল্ট ট্রিপ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সুপারিশগুলো কখনো আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায় নি।
খালগুলোর প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা দূর করা, নতুন খাল খনন, পুরনো খালের গভীরতা বাড়ানো, প্রশস্তকরণ, পাহাড়ের পলিমাটি ধারণের জন্য সিল্ট ট্র্যাপ, অতিরিক্ত পানি ধারণের জন্য জলাধার, জোয়ারের সময় নদীর পানি শহরে ব্যাক ফ্লু না করার জন্য জোয়ার নিয়ন্ত্রক (টাইডাল রেগুলেটর) এবং নদীর উভয় তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করার কথা থাকলেও সুদীর্ঘ ২ যুগেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এছাড়াও কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু পিলার ভিত্তিক করে এ নদীকে ধ্বংস করা হয়েছে।
কর্ণফুলী সেতুর এক-চতুর্থাংশ এখন ভরাট হয়ে গেছে। ঠিক মত ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও করা হয় নাই। বর্তমান সিটি মেয়র আলহাজ্ব আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন চট্টগ্রামের এই জলাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্ট ভিত্তিক ইনিশিয়েটিভ হাতে নিয়েছেন। বিগত সময়ের গৃহীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত না হওয়ায় আজকের যে জলজট তৈরি হয়েছে এটা থেকে চট্টলাবাসীকে মুক্তি দিতে দীর্ঘ মেয়াদি এবং স্থায়ী সমাধান দরকার। জলজটের অন্যতম মূল কারন নালা-নর্দমা, খাল এই সব জায়গায় আবর্জনা আটেকে জ্যাম হয়ে যাওয়া। তাই আবর্জনা নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। সেই প্রজেক্টের একটি চ্যাপ্টার হল বিন এবং ডোর টু ডোর আবর্জনা সংগ্রহ। এই প্রজেক্টের মূখ্য উদ্দেশ্য হল শহরকে পরিস্কার রাখা এবং নির্দিস্ট স্থানে ময়লা ফেলা এবং জনসাধারণকে সচেতন করা। এতে করে নালা নর্দমায় আবর্জনা আটকে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা যেমন সৃস্টি হচ্ছে না তেমনি শহরও হয়ে উঠছে পরিচ্ছন্ন।
এছাড়াও ‘চিটাগাং ফ্লাড কনট্রোল অ্যান্ড ওয়াটার লগিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ পরিকল্পনার ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টও ইতিমধ্যে গ্রহন করেছেন বর্তমান সিটি মেয়র। ১০ মাসে ‘পাওয়ার চায়না’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনাটির ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করেছেন। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে জি টু জি পদ্ধতিতে তিন বছরে চীন সরকারের অর্থায়নে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়টিও চূড়ান্ত হবার পথে। অতিবর্ষণের সময় যে জলজট সৃষ্টি হচ্ছে সে লক্ষ্যে নগরীর খালগুলোর মুখে পাম্প হাউসসহ স্লুইসগেট স্থাপন প্রকল্পের ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। একনেকে অনুমোদন হলেই কাজ শুরু হবে। আর উক্ত প্রকল্প সমূহ যথাযথ ভাবে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামবাসী জলাবদ্ধতা থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে।
লেখক : মাশরুর হোসেন
চেয়ারম্যান, সিওয়াইডিআরআই



