BREAKING NEWS
Search

“বব ডিলান” বন্দনা

"বব ডিলান" বন্দনা

বব ডিলান

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, আল আমিন বাবু : তিনি শুধু নিজেই “বব ডিলান” হননি তিনি সারা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন লক্ষ লক্ষ “বব ডিলান” ।

শেকড়ের খোঁজে : সম্ভবত ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে এক ঝড় ও জলোচ্ছাস হয়েছিল। এক মুহূর্তের মধ্যে দক্ষিণ অঞ্চল এর বিশেষ করে বদ্বীপে বাসকরা ঘুমন্ত মানুষগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। আমি তখন সুইডেনে জলবসন্তে আক্রান্ত একজন অসুস্থ মানুষ, সারাক্ষন টিভিতে “সিএনএন” নিউজের সামনে বসে থাকি।

কুয়েতে তখন সবে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। হঠাৎ করে একটা নিউজ আসলো যে, প্রশান্ত মহাসাগরের আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্ট এর দিকে একটা ঝড় জন্ম নিয়েছে যার নাম “সান্তা মারিয়া” যে ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী ও ভয়ানক হয়ে উঠেছে এবং আস্থে আস্থে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে।

একসময় ফিলিপাইন এর কাছে এসে এ আরো শক্তিশালী ও ভয়ানক হয়ে উঠলো তখন এর নাম করুন হলো “লিসা”। ওয়েদার ফোরকাস্ট কিছুক্ষণ পর পর ই এর নিউজ দেখাচ্ছিলো বা আপগ্রেড দিচ্ছিলো। এক সময় জানানো হলো এই ঝড় আরো শক্তিশালী হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাচ্ছে।

এই ফোরকাস্ট চললো কয়েকদিন। এবার বলাহলো “লিসা” তার তীব্র আঘাত হানবে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে। নড়ে চড়ে বসলাম, বুকের ভিতর ধুকধুক করছে কারণ আমি দেখেছি ১৯৬৯ এর হ্যারিকেন “গোর্কির” তান্ডব সেই ছোট্ট বেলায়।

এই নিউজ আপগ্রেড প্রক্রিয়াও চললো প্রায় সপ্তাখানেক ধরে অর্থাৎ “সান্তা মারিয়া” “লিসাতে” পরিণত হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত আসতেও প্রায় সপ্তাখানেক সময় লেগেগিয়েছিলো যা “সিএনএন” নিউজ প্রতি আধাঘণ্টা পর পর প্রচার করেছে কিন্তু, আমাদের দেশের তৎকালীন সরকারের কোনো রকমই টনক নড়েনি।

মানুষগুলোকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবার কোনো উদ্যোগ ও দেখা যায়নি। এটা আমার কাছে একটা পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞই মনে হয়েছে যার বিনিময়ে সরকার সারা দুনিয়া থেকে পাবে রিলিফ আর অর্থ সাহায্য।

যা আমাদের “বঙ্গবন্ধু কন্যা” কখনোই করেননি তিনি আমাদেরকে নিয়ে সব দুর্যোগ মোকাবেলা করেছেন বাড়িয়েছেন আমাদের আত্মবিশ্বাস!!

ঠিক একই সময়ে লন্ডনে একটা কনসার্ট হয় ইরাকের কুর্দিদের সাহায্য করবার জন্য যার নাম ছিল “সিম্পলি ট্রুথ” যেখানে ওই সময়ের অনেক নাম করা শিল্পীরাই বিনা পারিশ্রমিকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ওখানে দুই একজন শিল্পী তখন বাংলাদেশের মানুষদের জন্যও সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এর বেশি নয়।

আমার কাছে মনে হলো, যেহেতু কুর্দিদের ক্রাইসিসটা ছিল পশ্চিমেরই তৈরী করা একটা রাজনৈতিক ক্রাইসিস তাই সেটা তাদের কাছে “সিম্পলি ট্রুথ” হয়ে ধরা পড়লো কিন্তু আমাদের লক্ষ মানুষ যে মরে গেলো মূহুর্তের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেটা কি “সিম্পলি ট্রুথ” না?

আমরা কি পৃথিবী নামক গ্রহের অধিবাসী না? তখন আমার এই সৃস্টি আমার উপর ভর করলো। দুই এক সপ্তাহের মধ্যেই সুইডেনের স্টকহোমের গ্রোনালুন্দ নামক শিশু বিনোদন পার্কে বাংলাদেশের দুর্গত মানুষদের সাহায্য করবার জন্য একটা কনসার্ট আয়োজন করা হয়।

যেখানে সুইডেনের প্রায় সব শিল্পীরাই এগিয়ে আসে যাদের মধ্যে “ABBA” এর Bjorn Ulvaeus, Lilli Suzi সহ অনেকেই ছিলেন। আমি তখন মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছি। আমি আমার একোস্টিক গিটারটি হাতে করেই ওই কনসার্টে যাই। ওখানে গিয়ে দেখি তৎকালীন সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সহ অনেক আমলাই রয়েছেন।

আমি রাষ্ট্রদূতকে বললাম যে আমি এই সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে একটা গান করেছি একজন বাঙালী হিসাবে আমিও কি এই মহৎকর্মে আসতে পারি কিনা? তিনি অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথেই আমাকে বিদেয় করলেন। অগত্যা আমি স্টেজের পিছন দিকটায় গেলাম, আমার হাতে গিটার দেখে একটি মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি কি বাংলাদেশী কিনা?

আমি তাকে আমার অভিপ্রায় টি বললাম। তিনি আমাকে দাঁড়াতে বলে ভিতরে গেলেন এবং খুবঅল্প সময়ের মধ্যে ফিরে এসে বললো হা তুমি গাইতে পারো তোমার কি কি যন্রের সাহায্য লাগবে? আমি বললাম আমি শুধু গিটারেই গাইবো। এর পর আমি সরাসরি গিটার হাতে মাইকের সামনে স্টেজে। আমার নাম ঘোষণা আর আমাকে স্টেজে দেখে রাষ্ট্রদূতের মানসিক কি অবস্থা হয়েছিল আমি জানিনা তবে একটা ঘটনা ঘটলো তখন।

এখানে উল্লেখ করতে যা ভুলে গেছি তা হলো, কনসার্ট টি শুরুর পর পর ওখানে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু একজন মানুষ ও সরে যায়নি। সবাই দাঁড়িয়ে ভিজে ভিজে তারা ওই কনসার্ট দেখছিলো, তাই আমি যখন স্টেজে মাইকের সামনে দাঁড়াই তখন আমার চোখের সামনে অনেক ভেজা মানুষ দাঁড়িয়ে।

আমি গানটি শুরু করবার আগে আমার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বললাম — ‘আজ যারা তোমার বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছো তারপর এখনো দাঁড়িয়ে গান শুনছো তাদের অনেকেরই ঠান্ডা লাগবে, জ্বর হবে তবে তোমরা বাড়িতে গিয়ে গরম কফি ও একটা কম্বলে জড়িয়ে নিজেকে উত্তপ্ত করতে পারবে।’

তবে কিন্তু আমাদের দুর্গত স্বজনহারা মানুষ যারা এখনো বেঁচে থাকার যুদ্ধে তাদের মাথার উপর নেই কোনো ছাদ তাদের নেই কোনো বিশুদ্ধ পানি নেই খাবার। লন্ডনের “সিমল্পি ট্রুথ” কনসার্ট এর সীমানা পেড়িয়ে তোমাদের তোমরা যারা আমাদের দুঃখে আমাদের পাশে দাঁড়ালে তাদের জন্য আমি আমার জাতির পক্ষ থেকে জানাচ্ছি অন্তরের ভিতর থেকে কৃতজ্ঞতাবোধ। তবে সাথে এ কথাও বলতে চাই তোমাদের কষ্টের অর্জিত এই অর্থ আমাদের স্বৈরাচারী সরকারের হাতে তুলে দিলে তা ওই মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাবে না আমি নিশ্চিত তাই তোমাদের কাছে আমার আবেদন থাকে টাকা বা সাহায্য যাই পাঠাবে সুইডেনের নিজস্ব তত্বাবধানেই পাঠিও। এর পর আমি আমার গানটি করলাম।

কি গেয়েছি, কতখানি ভালো লেগেছে মানুষের জানিনা কারণ আমি সবে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম আর গান গাইবার মতো ফিট ও ছিলাম না তবে মনের শক্তি ছিল অসীম যা ছিল আমার বাঙালী হবার শক্তি । যা ছিল “বব ডিলানের” থেকে নেয়া শক্তি!

মূলকথা :

(১) আজ যারা “বব ডিলানকে” নিয়ে বিভিন্ন বৈমাতা সূলভ গল্প শুরু করেছেন তাদের উদ্দেশেই এই কলাম। বব ডিলান আজকালকের সেলিব্রিটিদের মতো সেলিব্রিটি আর ফ্যান পেজ খোলা শিল্পীদের মতো শিল্পী ছিলেননা তিনি সারাজীবনই ছিলেন মানবতার শিল্পী।

যেখানেই মানবতা বিপর্যস্থ হয়েছে সেখানেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি শুধু নিজেই “বব ডিলান” হননি তিনি সারা পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন লক্ষ লক্ষ “বব ডিলান” আমিও সেদিন তারই সৃষ্টি এক “বব ডিলান” হয়ে ঠেছিলাম।

(২) আমার লেখাটি পরে সেই সময়ের সাথে আজকের সময়টা মিলিয়ে দেখুনতো! এর পর বুকে হাত দিয়ে বলেন তো, এখনও কি বলবেন “শেখ হাসিনা” খারাপ? এই দেশের উন্নতির জন্য কি তার প্রয়োজন নাই? আমি যেমন ভালোবাসি “বব ডিলান” কে ঠিক সেভাবেই মনের ভিতর থেকেই দোয়া করি বঙ্গবন্ধু কন্যা বেঁচে থাকুন শত বছর কারণ এই বাংলার দুঃখী মানুষদের কাছে শেখের বেটির প্রয়োজন অনেক অনেক বেশি!

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু

জয় বঙ্গবন্ধু কন্যা

আল আমিন বাবু

উত্তর আমেরিকা




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *