বাংলাদেশের মিস্টি পনির এবং আমাদের হিরো ওয়ার্শিপ কমপ্লেক্স

সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published: 2016-06-26   10:32:56 BdST

মিস্টি পনির

ইয়ামেন হক:  আমি ‘বাঙ্গালী বাবা-মার সন্তান কিন্তু বাংলাদেশে জন্ম হয়নি/বেড়ে উঠেনি’ এমন মানুষদের সাফল্যে আনন্দে গদগদ হয়ে ‘বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে’ বলে লাফালাফি করা কখনই পছন্দ করি না। কারন এদের প্রায় কারোরই বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই, বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেও না, এবং জানার আগ্রহও নেই। আমি এদের দোষ দিচ্ছি না, এরা অবশ্যই বাংলাদেশী না, তাই তাদের বাংলাদেশ নিয়ে সেরকম টান থাকার কথা না। কিন্তু আমরা তাদের নিয়ে একটু অতিরিক্ত বেশীই অবসেসড, যেটা খুবই প্যাথেটিক।

এই ধারায় সাম্প্রতিক উদহারন নাদিয়া হোসেন। বাংলাদেশী বাবা-মার ব্রিটিশ সন্তান। কিছুদিন আগে ‘বেক-অফ’ নামক ব্রিটিশ রান্নার প্রতিযোগিতা-মূলক টিভি শো জিতে বাংলাদেশী মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। টাইমলাইনে তাকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হওয়া বাঙ্গালীদের পোস্টের ঠেলায় কয়েকদিন বাঁচতে পারছিলাম না। যাকগে, গতকাল গার্ডিয়ান কাগজে তার এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে কিছু জিনিস চোখে পড়ার মত।

১) “The concept of dessert doesn’t exist in Bangladeshi cuisine and so the only time we had it was at school.” – বাংলাদেশে ডেজার্টের কন্সেপ্ট নেই?? আজকালকার সুমিস হট কেক এন্ড পেস্ট্রি, মিঃ বেকার, এরও আগের ছোটবেলার কুপার্স, কফি কুকার্স সেভেন, সোবহানবাগের বেকারির দোকানগুলোর কথা বাদই দিলাম, কিন্তু বাঙ্গালী ট্রেডিশনেই তো ভোজের পর একটু মিষ্টিমুখ করা একটা বিশাল বড় জিনিস। সব দাওয়াতে মেইন ডিশের পর মিষ্টি/দই ইত্যাদি যে সার্ভ করা হয়, সেটা কি? বিয়ের দাওয়াতে পোলাও/রোস্ট/রেজালার পরে যে জর্দা/ফিন্নির জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, সেটা কি ডেজার্ট নয়? আর এর প্রচলন শুধু দেশের শহরে নয়, গ্রামেও। গ্রাম বাংলার বিয়ের অনুষ্ঠানেও দেখেছি অতিথিদের মিষ্টিমুখ করাতে। পিঠা উৎসবের কথা তো বাদই দিলাম। নাদিয়া হোসেন না জেনে এসব কি বলছেন?

২) “I also have a senseless love affair with cheese. My mother never bought any because there was none in Bangladeshi cuisine. I was introduced to it – and grapes and crackers – at school and it was very painful because then I’d crave cheese every night at home. It felt very English – and French. I seem to fall in love with things I wasn’t brought up with.” – একেবারে ভুল কথা। বাংলাদেশে বেড়ে উঠলাম পনিরের জন্য পাগল হয়ে – পশ্চিমা বিশ্বে যাকে ‘cottage cheese’ বলা হয়। এখনও বিদেশবিভুয়ে আমার বাংলাদেশের পনিরের কথা চিন্তা করে চোখে জল ফেলি, আর ম্যাডাম নাদিয়া এসেছেন কোথা থেকে বলতে বাংলাদেশে নাকি পনিরের চলনই নেই! উনার বাবা-মা উনাকে বাংলাদেশী রান্নায় পনিরের প্রচলন দিয়ে বড় করান নাই, সেটা উনাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাংলাদেশে পনিরের প্রচলন নেই, সেটা একেবারেই ভুল!

৩) সবচেয়ে নির্মম রসিকতা হলো, সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে উনি বলেছেন, ‘When I went into Bake Off I never imagined I’d come out the other end elevated and a role model – for Bangladeshis, bakers, Muslims, women and all; I didn’t expect any of it.’ যে কারনেই হোক, নিজের জানার অনাগ্রহে থেকে, বা বাবা-মার শেখানোর ভুলের জন্য, যার বাংলাদেশের মিষ্টির ঐতিহ্য নিয়ে নুন্যতম ধারনা নেই, তিনি হয়েছেন বাঙ্গালীদের ‘রোল মডেল’। হাহাহাহাহহ!!

নাদিয়া হোসেনকে বেশী দোষ দিবো না। তার থেকে বেশী দোষ প্রথমত তার বাবা-মার। বাবা-মা নিজেরা দেশী রেস্তরাঁ (হোক ‘ইন্ডিয়ান’ কুইজিনের, তারপরেও) চালিয়েও মেয়েকে বাংলাদেশী মিস্টি/পনিরের ব্যাপারে অবগত করতে পারেন নাই, এটা নেক্কারজনক। এরপরে দোষ বেশী দেবো সেসব বাঙ্গালীদের, যারা নাদিয়া হোসেন, জিয়া হায়দারদের মত বাঙ্গালী বংশদ্ভোত কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে একেবারেই অজ্ঞ বা কোন প্রকার টান-ছাড়া মানুষদের ‘বাঙ্গালী রোল মডেল’ বানানোর জন্য মুখিয়ে থাকেন। জ্বি না, এনারা বাঙ্গালী কোন কিছুই নন। এনারা যেই দেশে বড় হয়েছেন, যেই দেশের নাগরিক, সেখানকারই সৃষ্টি। স্বীকার করছি আমার নিজেরও জন্ম বাংলাদেশে না, কিন্তু আমি তিন মাস বয়স থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশেই বড় হয়েছি, তাই কোন বাংলাদেশে জন্ম হওয়া কিন্তু ছোট থেকেই বিদেশে বড় হওয়া ছেলেমেয়ের থেকে নিজেকে অনেক অনেক বেশী বাঙ্গালী বলেই মনে করি।

নাদিয়া হোসেনকে নিয়ে আহ্লাদ না করে প্রয়াত সিদ্দিকা কবির, আল্পনা হাবীবদের নিয়ে গর্ব করতে শিখুন।

ইয়ামেন হক- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ডূ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে বর্তমানে পেনসিলভেনিয়াতে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত।

আপনার মতামত দিন....

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.