বাংলাদেশ : সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা 

বুধবার,০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

মোঃ ইয়াছিন ঃ বাংলাদেশের জন্মকালে বর্হিবিশ্বের দৃষ্টিকোণ কেমন ছিল এই বিষয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ খুবই কম । আমাদের ভুলে গেলে চলবে না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯ শতকে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্র এই দুইটা মতবাদ সমগ্র বিশ্বকে অদৃশ্য ভাবে পৃথক করে রেখেছিল যার একটি পরিচালিত হতো সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে অন্যটি মার্কিন নেতৃত্বে যার সাথে মিত্র হিসেবে ছিল ইউরোপের পুঁজিবাদী ভাবধারা দেশসমূহ যা এখনও চলমান আছে । এই দুই পক্ষই নিজেদের দল ভারী করার জন্য সবসময়ই চেষ্টা করেছে একই মতাদর্শের সদস্য দেশ সংগ্রহ কিংবা নিজেদের গোত্রে অন্তভুক্ত করতে । যদিও ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে সমাজতন্ত্রের পরাজয় ঘটেছে তবে যেহেতু এটি একটি আদর্শও বটে তাই এই মতাদর্শের আবেদন এখনও রয়েছে রাষ্ট্র কিংবা সমাজ ব্যবস্থায় ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যেসব বর্হিবিশ্বের দেশ সমূহ চাইনি তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম । তবে এর বিপরীতে সেদিন সমাজতন্ত্রের নেতৃত্ব দানকারী সোভিয়েত ইউনিয়ন মৌন সমর্থন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে । শুধু মৌন সমর্থন নয় অনেক বিশ্লেষকের মতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন না পেলে বাংলাদেশের এই জয় ছিনিয়ে নিতে আরো দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো । যেহেতু শোষণ আর বাঞ্চনা বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রম ছিল তাই আর্দশ হিসেবেও বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের প্রতি বেশ সমর্থন ছিল বলে আমার ধারণা । সেই সুবাদে বঙ্গবন্ধু সংবিধানের মূলনীতিতে সমাজতন্ত্র লিপিবদ্ধ করে নতুন এই রাষ্ট্রকে সমাজতন্ত্র গোত্রের অর্ন্তভুক্ত করেন । আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনা বিশেষ করে নবগঠিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিকল্পনা এবং এর বাস্তব জ্ঞানের কিছুটা ঘাটতি ছিল । যাইহোক, সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রূপ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু যে অগণতান্ত্রিক বাকশাল ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন তার ভুল ব্যাখ্যা করে পরবর্তিতে ওনি সমালোচিত হয়েছিলেন । তবে মৃত্যুর ৪\৫ মাস পূর্বে ওনি তার এক ভাষণে সমাজতন্ত্রের বিকাশের মধ্যে এই নবগঠিত দেশটিকে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা তা ঠিকই তুলে ধরেছিলেন তবে এর ভুল ব্যাখ্যা স্বরূপ বাকশাল শব্দের আগমন হয়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত মত । যেহেতু সমাজতন্ত্রের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলা এক সুদূর প্রসারি পরিকল্পনা তাই এই মতাদর্শের গুরুত্ব তৎকালীন বাংলার সহজ-সরল মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি ।

আরেকটা বিষয়ে আমাদের মনে রাখা উচিত তা হলো, নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেনি বরং সেই সময়ে যেসব রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইনি তারাও এই বিজয় দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন । তদুপরি, বঙ্গবন্ধু যখন ৭২ এর সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে “সমাজতন্ত্র” এবং “ধর্মনিরপেক্ষতা” রাখলেন তখন পুঁজিবাদী আর মুসলিম সম্প্রদায় ভুক্ত দেশসমূহ এর দ্বারা কিছুটা হলেও মনক্ষুন্ন হয়েছেন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন সেই সময় পাকিস্তানের পক্ষে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যে বন্ধুত্ব আমরা পাকিস্তান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখনও দেখি । ঠিক এর পাশাপাশি বাংলাদেশ জন্মলাভের পর সৌদি সফরে ইসলাম কে রাষ্ট্রধর্ম করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু কিছুটা বিরাগভাজনও হয়েছিলেন বলে মনে হয়েছে । আর এর সূত্র ধরে আমার কাছে মনে হয়েছে যদিও বঙ্গবন্ধু সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা খুন হয়েছেন তবে এই পিছনে অনেক কারণের মধ্যেও অদৃশ্য এক আন্তর্জাতিক শক্তি কিংবা মৌন সমর্থনও কাজ করেছে বিশেষ করে যারা বঙ্গবন্ধুর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম এবং সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে অন্তভুক্ত করাটাকে মেনে নিতে পারে নি ।

পরবর্তীতে অষ্টম সংশোধনীতে জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনী থেকে ক্ষমতায় এসে দেশের হাল ধরতে জনসমর্থন লাভে ইসলাম কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা সংবিধানে অন্তভুক্ত করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে ধর্মকে যুক্ত করলেন । মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কে সম্মুনিত রাখতে মুসলিম বিশ্বের অদৃশ্য চাপ থাকার পরও বঙ্গবন্ধু যখন ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে অন্তভুক্ত করলেন পরবর্তীতে সেটা আর স্থায়ী হলো না । ১৯ শতকে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বের সাথে নতুন করে আরো দুটো আদর্শ মুখোমুখি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতা ।

ক্ষমতা লাভের আশায় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধর্মকে কিভাবে সেই ৪৭ এর জিন্নাহ এবং নেহরুর মধ্যে দেশ ভাগের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে একে রাজনীতির সাথে যুক্ত করা হয়েছে তা এখনও অনেকের অজানা । অর্থাৎ আমরা যারা ধর্মের প্রতি আবেগ প্রবণ কিংবা অনুগত হয়ে যে পবিত্রতা কিংবা শুভ্রতার জায়গা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ধর্মীয় আর্দশকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করেছি কিংবা করি তার কোনোটাই অনুভব করে ধর্মকে রাজনীতির যুক্ত করা হয়নি । মোটকথা, আমরা যারা আমজনতা ধর্মকে, ধর্মীয় চেতনা থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে এর সংযুক্ত হয়েছে বলে মনে করি আসলে তার কারণেই তা হয় হয়নি বরং এটি দল ভারী করার জন্য একটা টুল হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতিতে ব্যবহার হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে । কারণ ধর্মীয় চেতনা কে সমর্থন দিয়ে কিংবা করে জনসমর্থন নিজের ঝুলিতে ঢোকানোর চাইতে বড় আর কোনো অস্ত্র অন্তত রাজনীতির খেলায় এখনও আবিস্কার হয়নি । আর সাম্প্রতিক সময়ে এসে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ করে তুলল উগ্রতা । উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে ট্রাম্প যেমন ক্ষমতায় আসেছেন ঠিক তেমনি উগ্র ধর্মীয় চেতনা কে জাগিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদীও একই পদ্ধতিতে ক্ষমতায় এসেছেন। আর একাবিংশ শতাব্দীতে নতুন করে বিভাজনের পূর্বে আরো যুক্ত হলো উগ্রতা।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image