নিউজডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
সোমবার, ১ আগস্ট ২০১৬
মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ ছিলেন ইশরাত আখন্দ। একটি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি দেশের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনেও একসময় কাজ করেছেন। চিত্রকলার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। সংস্কৃতিমনা মানুষটির পছন্দ ছিল নাটক ও সংগীত। ভালোবাসতেন ফুল, পাখি ও প্রকৃতি।
ইশরাত আখন্দের সঙ্গে তাঁর ভাই ইউসুফ আখন্দের শেষ কথা হয় জুন মাসের শেষ দিকে, হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর সেই দুঃস্বপ্নের রাতের কয়েক দিন আগে।
তিনি জানালেন, পিঠাপিঠি ভাইবোনের মতো বেড়ে উঠেছেন তাঁরা। ফলে এই শূন্যতা দিন, মাস কিংবা বছরে তো পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর প্রশ্ন, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে লোকজনকে বিভ্রান্ত করা আজকাল এতটাই সহজ হয়ে পড়েছে?
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তে গিয়ে ফারাজ আইয়াজ হোসেন, অবিন্তা কবীর ও তারিশি জৈনের বন্ধুত্বের শুরু। ঢাকা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর তিন বন্ধুর বন্ধন আরও নিবিড় হয়েছে। জীবনের শেষ মুহূর্তটিও একসঙ্গেই ছিলেন তাঁরা। বন্ধন ছিন্ন হয়নি।
গত ১ জুলাই গুলশানের রেস্তোরাঁয় জঙ্গিরা যে ২০ জনকে হত্যা করে, তাঁদের মধ্যে এই তিন বন্ধুও ছিলেন। বেশ কিছুদিন পর ছুটিতে ঢাকায় ফিরে তাঁরা ওই রেস্তোরাঁয় কফি খেতে গিয়েছিলেন। সেখানে একই সঙ্গে প্রাণ হারান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদকর্মী ও চিত্রশালার পরিচালক ইশরাত আখন্দ।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভীষিকাময় সেই রাতে জঙ্গিরা ফারাজকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। এ সময় বন্দুকধারীরা অবিন্তা ও তারিশির কাছে জানতে চায় তাঁরা কোথা থেকে এসেছেন। একজন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যজন ভারত থেকে আসার কথা জানান। তাঁদের উত্তর শুনে জঙ্গিরা ফারাজের দুই বন্ধুকে ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। ফারাজ বন্ধুদের না নিয়ে রেস্তোরাঁ ছাড়তে রাজি হননি। পরে অবিন্তা ও তারিশির সঙ্গে ফারাজকেও নৃশংসভাবে হত্যা করে জঙ্গিরা।
বড় ভাই জারিফ আয়াত হোসেনের সঙ্গে ফারাজের বয়সের ব্যবধান মাত্র ১ বছর ১০ মাস। পিঠাপিঠি বেড়ে উঠেছিলেন দুই ভাই। ১ জুলাই সন্ধ্যায় হলি আর্টিজান বেকারির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে ভাই জারিফ ও মা সিমিন হোসেনকে বিদায় জানিয়ে বাসা থেকে বের হন ফারাজ। সেটাই মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে ফারাজের শেষ দেখা।
জারিফের সামনে এখন একটা অব্যক্ত শূন্যতা। ওই বিভীষিকার রাতের এক মাস পূর্তির এক দিন আগে গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফারাজের চলে যাওয়ায় আমাদের ভেতরে কতটা ভাঙচুর হচ্ছে, সেটা বলে বোঝানো যাবে না। তবে একই সঙ্গে ফারাজ যেভাবে নিজের জীবন দিয়েছে, তাতে আমরা গর্বিত। অন্ধকার ও বিয়োগান্ত এক পরিস্থিতিতে সে আলো জ্বালিয়ে গেছে। সত্যিকারের বীর, বাংলাদেশ এবং মুসলিম হিসেবে নিজেকে দেশে ও বিদেশে তুলে ধরেছে।
ফারাজ সব সময় সত্যের পক্ষেই অবস্থান করত। এ জন্য সে যেকোনো মূল্য দিতে তৈরি ছিল। সারা বিশ্বে সে নিজেকে এক অনুকরণীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছে।’
উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী ধ্বংসকামী তরুণদের মানবতা ও তারুণ্যের প্রতিনিধি হিসেবে মানতে রাজি নন জারিফ হোসেন। তাঁর মতে, জিহাদের নামে নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষ হত্যাকারী বিপথগামী এসব তরুণ সন্ত্রাসের প্রতিনিধিত্বকারী।
অবিন্তা কবীর সম্পর্কে অবশ্য সরাসরি তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মা রুবা আহমেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান লেভেন্ডার ডিস্ট্রিবিউশনের মহাব্যবস্থাপক মো. লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি জানান, মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় এসেছিলেন অবিন্তা। মাকে বলে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের হাতে আটক হওয়ার পর সারা রাত ওই রেস্তোরাঁর কাছে লোকজন নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন অবিন্তার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। মেয়ে হারানোর পর রুবা আহমেদ কখনো অফিসে আসেন, কখনো আসেন না। এলেও চুপচাপ নিজের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে যান।





