গুলশানে জঙ্গি হামলার এক মাস আজ
নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
সোমবার, ১ আগস্ট ২০১৬

হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় থমকে আছে সময়। এক মাস আগে জঙ্গি হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে রাজধানীর গুলশানের এই রেস্তোরাঁর যে চেহারা দাঁড়িয়েছিল, এখনো সেভাবেই আছে। তদন্তের স্বার্থে হাত দেওয়া হয়নি কোনো কিছুতেই। বাইরে আছে পুলিশের পাহারা।
‘গুলির শব্দে আমরা তিনজন আর এক জাপানি লুকিয়ে পড়ি নিচতলার কফি তৈরির ছোট কক্ষের ভেতরে। জাপানি লোকটি ভয়ে কফি তৈরির টেবিলের নিচে গুটিসুটি মেরে বসে পড়েন। হঠাৎ গুলি করে দরজা ভেঙে এক জঙ্গি ভেতরে এসে বলল, “তোরা বের হ, তোদের মারব না। এখানে কোনো বিদেশি আছে?” মাথার ওপর হাত তুলে আমরা তিনজন বের হতেই টেবিলের নিচে থাকা ওই জাপানিকে দেখে গুলি ছুড়ল সে। তিনি (জাপানি) একটু আর্তনাদ করে টেবিলের নিচে নিথর হয়ে গেলেন।’
১ জুলাই গুলশানে জঙ্গি হামলার পর জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে আসা হলি আর্টিজান বেকারির এক কর্মচারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জবানবন্দিতে এভাবেই সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এই কর্মচারীসহ জিম্মিদশা থেকে বেঁচে আসা ৩২ জনের বেশির ভাগেরই জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন তদন্তকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীর কর্মকর্তারা।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বেঁচে আসা ৩২ জনের মধ্যে পাঁচজন বিদেশিও আছেন। তাঁদের দুজন শ্রীলঙ্কান, একজন ইতালীয়, একজন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত ইতালীয় ও একজন জাপানি। মুক্তি পাওয়ার পর বিদেশিরা দেশত্যাগ করেন। আর দুজন বাংলাদেশি এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে আছেন বলে জানা গেছে। বাকি ২৫ জনের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
জিম্মিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, হলি আর্টিজানের সিসিটিভি ক্যামেরা সচল ছিল না। এ কারণে ওই রাতে রেস্তোরাঁর ভেতরে কী ঘটেছিল, তা জানতে জীবিতদের জবানবন্দিই একমাত্র উপায়। তবে জিম্মিদের কেউই পুরো ঘটনা বলতে পারেননি। একেক জন একেক স্থানে বন্দী অবস্থায় ছিলেন, যে কারণে তাঁরা ঘটনার খণ্ড খণ্ড দৃশ্য দেখেছেন। আর সেভাবেই বিবরণ দিয়েছেন।
বেঁচে যাওয়া লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁরা জানতে পারেন, রাত পৌনে নয়টার দিকে হলি আর্টিজানে প্রথম ঢুকেছিলেন নিবরাস ইসলাম ও মীর সামেহ মোবাশ্বের। এরপরই ঢোকেন রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। সবার কাঁধে ছিল একটি করে ব্যাগ। স্বয়ংক্রিয় একে-২২ রাইফেল ছিল তিনজনের কাছে। আরও সাতটি গুলিভর্তি ম্যাগাজিন ছিল। ছোট অস্ত্রের মধ্যে পাঁচজনের হাতে ছিল পাঁচটি গুলিভর্তি পিস্তল।
এ ঘটনা নিয়ে যে মামলা হয়েছে, তার বিবরণে বলা হয়েছে, কমান্ডো অভিযানের পর হলি আর্টিজান বেকারিতে ৩১১টি গুলির খোসা ও ১২৭টি তাজা গুলি পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে বিস্ফোরিত গ্রেনেডের ৯টি পিন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পাঁচ জঙ্গির হাতে প্রায় ৫০০ গুলি ও ১০-১২টি গ্রেনেড ছিল। চাপাতি ও ছোট আকারের চাকু সবার হাতে থাকলেও তলোয়ার ছিল একজনের কাছে।
হামলা শুরু

নিহতদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিলো আর্টিসান রেস্তোরাঁ। কি বর্বরোচিত এ হত্যাকান্ড। ফাইল ছবি সংগ্রহীত এনডিটিভি থেকে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের গাড়িচালক সবুজ কুমার ওঝা ঘটনার দিন বলেন, হাসনাত করিম, তাঁর স্ত্রী শারমিনা করিম ও দুই ছেলেমেয়েকে নামিয়ে তিনি গেটের কাছে গাড়ি পার্ক করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এ সময় তিনি দেখেন, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে চার-পাঁচজন হলি আর্টিজানের ভেতরে ঢুকে গেট আটকানোর চেষ্টা করছেন। ওই সময় একজন প্রহরী দৌড়ে তাঁদের কাছে আসেন। প্রহরি দরজা বন্ধ করার কারণ জানতে চাইলে একজন পিস্তল বের করে গুলি করেন। এরপরই শুরু হয়ে যায় ছোটাছুটি।
সবুজ কুমার বলেন, তিনি ভয়ে দৌড়ে পাশের লেকভিউ হাসপাতালের গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। এ সময় আরও কয়েকজন হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়েন। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সেখানেই আটকে ছিলেন।
হলি আর্টিজানের এক কর্মচারী জবানবন্দিতে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে লম্বামতো ছেলেটা (নিবরাস ইসলাম) আগে একবার এসেছিল। তারা হলি আর্টিজান সম্পর্কে আগে থেকেই সব জানত। জঙ্গিরা ভেতরে ঢুকে প্রথমে জানতে চায়, বিদেশি শেফরা কোথায়।
হলি আর্টিজানের তত্ত্বাবধায়ক সুমন রেজা বলেন, ‘যুবকেরা ভেতরে ঢুকেই ফাঁকা গুলি শুরু করে। আক্রমণের সময় তারা ‘আল্লাহু আকবর’ বলেছে।
অতিথিরা ভয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ছেন। আমি দোতলায় উঠে যাই। সেখানে দেখি দুই জঙ্গি দোতলায় পিৎজা তৈরির কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে গোলাগুলি করছে। তখন পর্যন্ত কারও গায়ে গুলি লাগেনি। আমরা যে যেভাবে পারি, ছাদে চলে যাই। আমার সঙ্গে ইতালিয়ান শেফ জিয়ান গ্যালিয়াজো বসিনি বের হয়ে আসেন।’
রেস্তোরাঁর কিচেন কর্মী বাচ্চু পাটোয়ারী বলেন, রেস্তোরাঁর শেফ আর্জেন্টিনার নাগরিক দিয়াগো রসিনির সঙ্গে তাঁরা পাঁচ-ছয়জন নিচতলার কিচেনে কাজ করছিলেন। গুলির শব্দ শুনে তিনি ও দিয়াগো দৌড়ে দোতলার ছাদে উঠে যান। সেখানে তাঁদের মতো আরও ১০-১২ জন লোক লুকিয়ে ছিল। দিয়াগো এবং তিনি ছাদের পশ্চিম পাশে ছিলেন। জীবন বাঁচাতে তাঁরা রেস্তোরাঁ ও পাশের একটি ১০ তলা ভবনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় লাফিয়ে পড়েন। প্রাচীরের ওপারে তারকাঁটায় তাঁর ও দিয়াগোর হাতের কিছু অংশ কেটে যায়। কিছুক্ষণ সেখান থাকার পর সাহায্য চাইলে পুলিশ তাঁদের দুজনকে উদ্ধার করে একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। সকালে রেস্তোরাঁর মালিক সাজ্জাদ মেহেদী এসে তাঁদের কর্মচারী বলে শনাক্ত করেন।
মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফিরে আর্জেন্টাইন শেফ দিয়েগো রসিনি আর্জেন্টাইন সংবাদ সংস্থা ‘চ্যানেল ৫’-কে বলেন, হলি আর্টিজান বেকারিতে ওই রাতে টেবিল সংরক্ষণ করেছিলেন ১৮ জন। এক টেবিলে সাতজন ইতালীয় বসে ছিলেন, আরেক টেবিলে তিন বা চারজন। কেউ একজন ইতালীয় পাস্তার অর্ডার দিলে রসিনি সবে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন।
রাত পৌনে নয়টার দিকে কয়েকজন তরুণ ভারী ব্যাগে অস্ত্রশস্ত্রসহ রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়েন। ভয়ে তিনি পালিয়ে ছাদে চলে যান। আর শুনতে পান, বন্দুকধারীরা পালিয়ে থাকা লোকদের খুঁজছে আর ‘আল্লাহু আকবর’ হাঁক দিচ্ছে। তিনি বলেন, রেস্তোরাঁয় অনেক বিদেশি ছিলেন। তাঁদেরই খুঁজছিল বন্দুকধারীরা।
শারমিনা করিম তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, স্বামী, ছেলে রায়হান করিম (৮) ও মেয়ে শেফা করিমকে (১৩) নিয়ে তিনি হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন মেয়ের জন্মদিনের জন্য। তাঁর পরিবার বসেছিল হলি আর্টিজানের নিচের তলার একটি টেবিলে। বাইরের লনে এ সময় আরও কয়েকজন দেশি-বিদেশি লোক বসে ছিলেন।
জঙ্গিরা ভেতরে ঢুকেই প্রথমে বিদেশিদের নিচতলায় জড়ো করে। একপর্যায়ে লনে বসা এক যুবক (তাহমিদ হাসিব খান) ও তাঁর দুই বান্ধবী (ফাইরোজ মাহিন ও তাহানা তাসমিয়া) এবং একজন বয়স্ক লোককে (সত্যপ্রকাশ) জঙ্গিরা তাঁদের টেবিলে নিয়ে আসে। পরে আরও দুজন কর্মচারীকে এনে তাঁদের সঙ্গে বসিয়ে রাখে। অন্য একটি টেবিলে আরও কয়েকজন বসা ছিলেন।
জঙ্গিরা তাঁর দুই শিশুসন্তানকে দেখিয়ে বলে, ‘ওদের কান ও চোখ ঢেকে রাখেন।’ এরপর শুরু করে গুলিবর্ষণ। জিম্মি করার আধা ঘণ্টার মধ্যেই তারা বিদেশি নাগরিকদের প্রথমে গুলি করে। এরপর ছুরিকাঘাতে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। জিম্মিদের কেউ কেউ এ সময় দৌড়ে দোতলায় ওঠার চেষ্টা করলে সিঁড়ির কাছেই তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
আরেকজন কর্মচারী বলেন, হামলার সময় একজন জাপানি একটি বড় ফ্রিজের ভেতর লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। জঙ্গিরা তাঁকে গুলি করলে তিনি ফ্রিজের ভেতরেই পড়ে যান। পরে ফ্রিজের ভেতর থেকে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ওই কর্মচারী বলেন, সব হত্যাকাণ্ড হয়েছে নিচের তলায়। ওই কক্ষের বিভিন্ন স্থানে মৃতদেহগুলো রাতভর পড়ে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস-এর কাছে সে রাতের দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনায় আরেকজন নারী বলেছেন, সন্ত্রাসীরা তাঁদের একটি টেবিলে বসিয়ে রেখে বলেছিল, দেশি লোকদের ছেড়ে দেওয়া হবে। সন্ত্রাসীরা তাঁদের মাথা নিচু করে রাখতে বলেছিল। হত্যাকাণ্ডের সময় সন্ত্রাসীরা শিশুদের চোখ-কান ঢেকে রাখতে বলেছিল। হত্যাকাণ্ডের পর আক্রমণকারীরা সব লাইট বন্ধ করে দেয়। অন্ধকারের মধ্যেই তাঁরা মাথা নিচু করে ওই টেবিলে সকাল পর্যন্ত বসে ছিলেন।
হাসনাতের স্ত্রী শারমিনা বলেন, রাতে তাঁদের টেবিলে থাকা একটি মেয়েকেও জঙ্গিরা ফোন করার সুযোগ দেয়। এ সময় তারা ফোনের স্পিকার অন করে রাখতে বলে।
হাসনাতের ফোন ব্যবহার করে তারা ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট (বিডি নিউজ, আল-জাজিরা, এনডিটিভি, বিবিসি) ভ্রমণ করে।
তিনি বলেন, জঙ্গিদের কথা শুনে মনে হয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের ছবি তুলে তারা সেটা আপলোডও করছে। জঙ্গিরা পালক্রমে তাঁদের কাছে দাঁড়িয়ে থাকছিল। তারা রেস্তোরাঁর বিভিন্ন স্থানে কোনো বিদেশি আছে কি না, তা খুঁজে দেখছিল। গভীর রাত পর্যন্ত তারা এভাবেই সময় পার করেছে। এ সময় অনেক কর্মচারী ভয়ে বাথরুম ও অন্য স্থানে লুকিয়ে ছিলেন।
আর্টিজানের কর্মচারী সমীর বাড়ৈ বলেন, ‘ভয়ে নয়জন আশ্রয় নিই কিচেনকর্মীদের (নিচতলার) ওয়াশরুমে এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে অস্ত্রধারী দুই জঙ্গি কিচেনের ওয়াশরুমের সামনে এসে ডাক দিয়ে বলে, “বাঙালি ভাইদের কোনো ভয় নাই। তোমরা দরজা খোলো। নতুবা ওপর থেকে ফায়ারিং করতে বাধ্য হব।”
তখন আমরা দরজা খুলে দিয়ে দেখি একজন আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে এবং আরেকজনের হাতে রাইফেল। আমরা ওয়াশরুম থেকে মাথা নিচু করে একে একে নয়জন বেরিয়ে আসি। আমাদের দেখার পর পুনরায় সন্ত্রাসীরা আমাদের ওয়াশরুমের মধ্যে ঢুকতে নির্দেশ দিলে আমরা ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসীরা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেয়।’
সমীর বাড়ৈ আরও বলেন, শুরুর ঘটনার পর তাঁরা আর কিছুই দেখেননি বা জঙ্গিদের কথোপকথন শোনেননি। শুধুই গুলির আওয়াজ শুনেছেন।
ওয়াশরুমে আটকে পড়া কর্মীদের কেউ কেউ ফোনে বাইরে যোগাযোগ করেছেন। এখানে আটকে পড়া কর্মচারী সহকারী বাবুর্চি আকাশ খান (২০) বলেন, ‘একজন টয়লেটে জিম্মি অবস্থার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। আমাদের সন্দেহ, ফেসবুকের পোস্ট দেখেই জঙ্গিরা জানতে পারে, আমরা টয়েলেটে অবস্থান করছি। তাদের হুমকি শুনে আমরা ভয়ে দ্রুত দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তারা সবাইকে হাত উঁচু করে একজন একজন করে বের হতে বলে। কথামতো সবাই মাথার ওপর হাত তুলে বের হই। তখন তারা বলে, “আমরা বাঙালি মুসলমানদের মারব না। আমরা মারব বিদেশি, যারা অমুসলিম।”’
আকাশ বলেন, ‘জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর কর্মীদের বলে, বাকি জিম্মিদের যেন চা-কফি দেওয়া হয়। ভোর সাড়ে তিনটার দিকে মুসলমানরা যখন সাহরি খান, তখন তারা কর্মীদের বলে, মাছ ও চিংড়ি রান্না করে তাঁদের যেন খাওয়ানো হয়। তাঁদের জন্য রান্না করে শিশির নামের এক কর্মচারী। সে নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে বেঁচে যায়।’
আকাশ বলেন, ‘সকাল সাড়ে সাতটার দিকে সন্ত্রাসীরা বাইরে জিম্মি থাকা আরও চারজন বাবুর্চির মধ্যে একজনকে আমাদের টয়লেটের বন্ধ দরজা খুলে দিতে বললে সে দরজা খুলে দেয়। আমি বেকারির বড় কক্ষে গিয়ে দেখি লাশ আর লাশ। রক্তে ভরে গেছে মেঝে। এ সময় কয়েকজনকে লাশের পাশে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হয়েছে, তারা মনে হয় সাদাপোশাকে আইনের লোক। আর সন্ত্রাসীরা সবাইকে মেরে পালিয়ে গেছে। আমি তাদের গিয়ে বলি, ‘ভাই, এতগুলি মানুষ মারল আর আপনারা কিছু করতে পারলেন না।’ এই কথা শুনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে লোকগুলো হাসতে থাকে। একপর্যায়ে তারা বলে, ‘আমরাই তো মেরেছি।’
আকাশ খান বলেন, ‘সকালে সেনা অভিযানের কিছু সময় আগে জঙ্গিরা আমাকে বলে, “তুমি যে লাশ দেখতাছ, আমরাও কিছুক্ষণ পরে এভাবেই পড়ে থাকব। আর চলে যাব জান্নাতে।”
এরপর হাসতে হাসতে জঙ্গিরা বলতে থাকে, “আমরা যাই, জান্নাতে দেখা হবে তোমাদের সঙ্গে। তুমি চলে যাও। কিছুক্ষণ পরে এখানে গুলি আসবে। সেই গুলি তোমাকেও লাগতে পারে।” ‘যাও যাও’ বলে আমাকে তাড়িয়ে দেয় তারা। এই কথা শুনে আমি দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে চলে যাই। ঠিকই কিছুক্ষণ পরে শুরু হয় গুলি। আমরাও বাঁচাও, বাঁচাও বলে আর্তচিৎকার করি। যাতে সেনাবাহিনী আমাদেরও জঙ্গি ভেবে গুলি না করে।
সেনাবাহিনী ওপরে গিয়ে অস্ত্র তাক করে আমাদের সবাইকে নিচে আসার কথা বললে মুহূর্তে আমি একজন সেনার কাছে জানতে চাই, সন্ত্রাসীদের কী হয়েছে।
জবাবে ওই সেনাসদস্য বলেন, গুলিতে সবাই মারা গেছে। নিচে নেমে এসে দেখি একসঙ্গে পাঁচ জঙ্গির লাশ পড়ে আছে। এরপর সেনাসদস্যরা উদ্ধার হওয়া ১৩ জনকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যান।’
জিম্মিদশা থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকজনের বক্তব্য নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস ২ জুলাই একটি সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদমাধ্যমটিতে বলা হয়, জঙ্গিরা জিম্মি থাকা ফারাজ আইয়াজ হোসেনকে মুক্তি দেয়। তারা তাঁকে চলে যেতে বলে। কিন্তু ফারাজ বলেন, আমার এই দুই বন্ধুর কী হবে?
জঙ্গিরা বলে, ওদের ছাড়া হবে না। তখন ফারাজ বলেন, দুই বন্ধুকে ফেলে রেখে আমি যাব না। পরের দিন ফারাজ হোসেনের লাশ পাওয়া যায়। আত্মীয়ের বরাত দিয়ে ওই সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, শুধু বন্ধুদের বিপদের মুখে ফেলে রেখে যেতে চাননি ফারাজ। বন্ধুত্বের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
তথ্যসূত্র- প্রথম আলো


You must log in to post a comment.