মঙ্গলবার,০৪ অক্টোবর ২০১৬
সিদ্দিক নাজমুল আলম
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের তখন ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ি। পার্টি অফিসে দেখি সিনিয়র দু’একজন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। মনে মনে ইচ্ছে করে আমার যদি একটা মোবাইল থাকতো! তখন একটা মোবাইলের সিমের মূল্য ৪-৫ হাজার টাকা, সেটের দাম আরো বেশি। তো সাধ ছিল, সাধ্য ছিলোনা। হটাৎ একদিন আমার এক বন্ধু তার নাম পলাশ, সে বললো সিমেন্স এর হ্যান্ডসেট সিম সহ বিক্রি করবে। দাম চাইলো ৭০০০ টাকা। তার ওই হ্যান্ডসেট টাও সেকেন্ড হ্যান্ড ছিলো। তখন আমি বললাম যে আমি শুধু সিম কার্ড টা কিনতে পারবো। দামাদামির এক পর্যায়ে সে ১৭০০ টাকায় সিম কার্ড দিতে রাজি হলো। তারপর তার কাছ থেকে সিম কেনার পর হ্যান্ডসেট কেনার জন্য টাকা জমাতে লাগলাম।
এইভাবে ইন্টারমেডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসলো, কিন্তু হ্যান্ডসেট আর কিনা হলোনা। আমার ছোট কাকা এরিকসন এর হ্যান্ডসেট ব্যবহার করতো। মাঝে মাঝে আমার সিমটি তার হ্যান্ডসেটের ভিতর ঢুকিয়ে কয়েকজন কে মিস কল দিতাম, কারণ তখন একটি মোবাইল স্ক্রাচ কার্ড এর মূল্য ৩০০ টাকা এবং প্রতি মিনিটের জন্য কাটা হতো ৬ টাকা ৯০ পঁয়সা। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে ঢাকায় থাকতে শুরু করি।
একবার বাড়িতে গেলাম, হটাৎ চাচার মোবাইলটি নষ্ট হয়ে গেলো। তখন ছোট চাচা আমাকে মোবাইল হ্যান্ডসেটটি ঢাকার ইস্টার্ন প্লাজায় ঠিক করানোর জন্য দিলেন এবং পরেরবার বাড়িতে আসার সময় নিয়ে আসতে বলেন।
আমিতো মনে মনে মহাখুশি যে বাড়িতে প্রয়োজনে ২-৩ মাস পরে আসবো, কিন্তু মোবাইলটা তো ব্যবহার করতে পারবো।
আমি খুব এক্সসাইটেড কবে ঢাকা যাবো কখন মোবাইল ঠিক করে নিজে ব্যবহার করা শুরু করবো। পরের দিন চাচা ২০০০ টাকা দিলো মোবাইল ঠিক করার জন্য এবং আমি টাকা নিয়ে ঢাকা চলে আসলাম। ঢাকায় এসে ইস্টার্ন প্লাজার একটি মোবাইল দোকানে হ্যান্ডসেটটি দেখালাম এবং তাহারা বললো ১৫০০ টাকা লাগবে এবং ২ দিন পর মোবাইল ফেরত দিবে। আমি তো মহাখুশি এ যেনো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। যাই হোক দুই দিন পরে মোবাইল মেরামত করে নিয়ে এসে আমার সিম টা ভরলাম সাথে ৩০০ টাকার স্ক্রাচ কার্ড কিনে প্রবেশ করালাম। আমারে আর পায় কে! মোবাইল শক্ত করে ধরে থাকতাম, কোচিংয়ে গেলে ভাব-সাব নিয়ে থাকতাম যাই হোক এভাবে চলতে থাকলো একমাস।
এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি যেতে হলো। স্বাভাবিক ভাবে মন খারাপ মোবাইলটি ছোট চাচাকে ফেরত দিতে হবে এবং বাড়িতে গিয়ে যথারীতি মোবাইলটি ছোট চাচাকে ফেরত দিয়ে দিলাম। তো যাই হউক মন খারাপ করে ঢাকায় চলে আসলাম। মাঝে অনেক ঘটনা না-ই বললাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই পে-ইন স্লিপ হাতে নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে গেলাম। আমি নতুন, সবাই অপরিচিতি, কাউকে চিনিনা। টেলিভশনের কল্যাণে লিয়াকত শিকদার, নজরুল ইসলাম বাবু, মারুফা আক্তার পপি, সাইফুজ্জামান শেখর, রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল, বলরাম পোদ্দার, দেলোয়ার হোসেন ও হেমায়েত উদ্দিন খাঁন হিমু ভাইকে চিনতে পেলাম। দেখলাম, একটি মিছিল
বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
মিছিলশুরু হলো এবং আমিও যথারীতি মিছিলের পিছিনে ডুকে গেলাম। পরবর্তীতে অনেকের সাথে পরিচয় হলো, সেকথা আরেকদিন লিখবো। মাসখানেক না যেতেই এক হরতালের আগের দিন হরতালের প্রচার মিছিল শেষে মধুর ক্যান্টিন থেকে টিএসসি যাওয়ার পর হঠাৎ লিয়াকত ভাই আমার নাম ধরে ডেকে বললো তুমিতো খুব ভালো স্লোগান ধরো, বাড়ি কোথায়? আমি বললাম জামালপুর।
আমাকে বললো আগে রাজনীতি করতে? আমি বললাম জ্বি, আমি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা, জেলা ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি, আর আমি ঢাকায় চলে আসছি, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে আমি বড় পদ পাবো।
শুনে তিনি হাসলেন এবং বললেন জেলা কমিটির সভাপতিকে মোবাইলে কানেক্ট করো, আমি তখন বললাম আমার মোবাইল নেই। তখন সাথে সাথে তার মোবাইলটি আমার হাতে দিয়ে বললেন এখান থেকে কল করো। তারপর আমার জেলার কনভেনর রেজনু ভাইকে কল দিলাম। হয়তো ব্যস্ততার জন্য তিনি ফোন ধরতে পারলেন না।
পরে আমাকে লিয়াকত ভাই বললেন আর কাহাকে চিনো, আমি বললাম জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছানোয়ার হোসেন ছানু ভাইকে চিনি, আমরা একই গ্রামের।
লিয়াকত ভাই বললেন তাকেই ফোনে ধরো, তখন লিয়াকত ভাইয়ের নাম্বারটি ছিলো ০১৭১৫৬১৭১৯। ছানু ভাই কে ফোন করতেই ফোন ধরলো, আমি বললাম ছানু ভাই আমি নাজমুল এইটা ছাত্রলীগের সভাপতি লিয়াকত ভাইয়ের নাম্বার, সে তো শুনে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমি বললাম সে আপনার সাথে কথা বলবে, লিয়াকত ভাই তাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন এবং সেও আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা দিলো এবং বললো নাজমুল আমার ছোট ভাই, কল লাউডে থাকাতে শুনতে পেলাম। ঐদিন লিয়াকত ভাই টিএসসি’র আড্ডা শেষে রিক্সায় করে আমাকে সেগুনবাগিচায় তার বন্ধু লিটন সাহার বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে খাসির মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। খাওয়া-দাওয়া পরে অনেক কথাবার্তা বললেন এবং বললেন তোমাকে আমি একটি সিমসহ মোবাইল হ্যান্ডসেট কিনে দিচ্ছি এবং কাগজে তার নাম্বার লিখে দিলেন। আমি সাথে সাথে বললাম আমার সিম কার্ড লাগবেনা আমার সিম কার্ড আছে।
তখন লিয়াকত ভাই তার আম্মা (আমাদের খালাম্মা) কে ফোন দিলেন এবং বললেন মা আমি নাজমুল নামে আমার একটা ছোট ভাইকে পাঠাচ্ছি আমার চার হাজার টাকা লাগবে তুমি ওর কাছে টাকা দিয়ে দিও। আমাকে লিয়াকত ভাই কাগজে তার মালিবাগের বাসার ঠিকানা লিখে দিলেন এবং সাথে একশত টাকা রিক্সা ভাড়া দিলেন এবং বললেন মা’র কাছ থেকে টাকা নিয়ে বায়তুল মোকাররম এর স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কিনে নাও। আমি মালিবাগ এ গেলাম এবং বহু কষ্টে তার বাসা খুঁজে বের করলাম। বাসার কলিং বেল দিতেই একজন এসে দরজা খুললেন এবং আমি সাথে সাথেই অনুমান করে নিলাম ইনিই খালাম্মা।
সাথে সাথে আমি পা ছুঁয়ে সালাম দিয়ে বললাম আমি নাজমুল, তিনি আমাকে ভিতরে নিতে গেলেন এবং মিষ্টি খেতে দিলেন। তিনি আমার ছোটখাটো একটা ইন্টারভিউ নিয়ে নিলেন, আমার পরিবারের খোজ খবর নিলেন। পরে ১০০ এবং ৫০ টাকার অনেকগুলো পুরাতন নোট আমার হাতে দিয়ে বললেন এখানে চার হাজার টাকা আছে। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি আমাকে বললেন, চারদিকে পুলিশ আর ছাত্রদল যেইভাবে মাইরধর করে সাবধানে থেকো। আমি বাসা থেকে বের হয়ে সোজা বায়তুল মোকাররমের স্টেডিয়াম মার্কেটে গিয়ে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় সিমেন্স এর সেকেন্ড হ্যান্ড একটি মোবাইল কিনলাম। পেয়ে গেলাম জীবনের প্রথম নিজের স্বপ্নের মোবাইল ফোন!!
লিয়াকত ভাই সাবেক হওয়ার পর নতুন কমিটির নির্বাচন কমিশন কার্য্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশ বেধড়ক পিঠালো, আসাদুজ্জামান নূর সহ আমরা অনেকে আহত হলাম। টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। “জ্ঞান ফিরে দেখলাম হাসপাতালের বিছানায়। পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমার সাধের মোবাইল ও মানিব্যাগ টি নেই”।
পরবর্তীতে ছাত্রলীগের ইকবাল মাহমুদ বাবলু ভাই আমাকে একটি নোকিয়া ১১০০ মোবাইল কিনে দিয়েছিলো। তার ২ বছর পর এক পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশা ভাই তার নিজের স্যামসং মোবাইলটি দিয়েছিলেন উপহার হিসেবে, কারণ তার হ্যান্ড সেটটা আমার খুব পছন্দের ছিলো এবং প্রায়ই তার কাছে আমি সেটটি চাইতাম। পরে মোবাইলটি বাদশা ভাই দেওয়ার সময় বলেছিলো অনেককেই পাঞ্জাবি-ফতোয়া দিলাম, তোকে আমার এই প্রিয় সেটটি উপহার হিসেবে দিলাম।
খালাম্মা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর আদর, স্নেহ, ভালোবাসা, বিরোধী দলের সময়ে তাঁর রান্না করা সকালের নাস্তা হিসেবে ভাত, আলু-ভর্তা, ডিমভাজি এবং ডাল এখনো খুব মিস করি।
বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়গুলোই যেনো ভালো ছিলো, কারণ তখন কর্মীর প্রতি নেতার আন্তরিকতা ছিলো, নেতার প্রতি নেতার ভালোবাসা ছিলো, নেতার প্রতি কর্মীর শ্রদ্ধা ছিলো, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা ছিলো……..
লেখক : সিদ্দিক নাজমুল আলম
সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক





