সংখ্যাগরিষ্ঠ

যুক্তরাস্ট্রে সকামীদের নাইট ক্লাবে হামলায় সমকামী বন্ধুদের হারিয়ে শোকে আবেগাপ্লুত

যুক্তরাস্ট্রে নাইট ক্লাবে হামলায় বন্ধুদের হারিয়ে শোকে আবেগাপ্লুত ।

রনিয়া রহিম: আমার ধারণা পৃথিবীতে ভালোমানুষের সংখ্যা বেশি। যখন কোন সুবিশাল ট্রাজেডি ঘটে যায়, দেখবেন, আশপাশের মানুষেরা এগিয়ে এসে যে যার মতো সাহায্য করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে সমকামী নাইট ক্লাবে গুলি করে ৪৯ মানুষ হত্যা হলো, ৫০- এর অধিক মানুষ আহত, দেখা গেলো মানুষ নাওয়া খাওয়া ফেলে লাইনের পর লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে রক্ত দেয়ার জন্য! এর মধ্যে অনেক রোজাদারেরাও ছিলো। অনেকেই যারা রক্ত দিতে পারছেন না, তারা স্বেচ্ছাসেবক হয়ে গেলেন সেখানে। ফর্ম পূরণ করার সাহায্য থেকে শুরু করে রোদের মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মাথায় ছাতা ধরে থাকা কিংবা পানি এগিয়ে দেয়া – যে যার মতো যা করতে পারলো, তা করলো।

নিহত/আহত মানুষেরা বেশিরভাগই সাধারণ পরিবারের, অর্থকড়ির মতো ‘সাধারণ’ সমস্যায় এই ধরনের ঘটনার পর পড়তে হয়। মেডিকাল খরচ আছে- সংসার যে চালাতো হয়তো বুলেটটি তাকেই কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার পরিবারের মানুষেরা এখনো আছে। বিভিন্ন সংগঠন তৎক্ষনাত আয়োজন করে ফেললো ফান্ডরেইজিং-এর দেশজুড়ে নানান সাধারণ মানুষেরাই উল্লেখযোগ্য টাকা তুলে ফেললো ভিকটিম বা তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়ার জন্য!

একজন দাদী এই ঘটনায় তার নাতিকে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার শহর থেকে অরল্যান্ডোতে যাচ্ছিলেন লাশ আনার জন্য; প্লেনভর্তি মানুষ কি করলো জানেন? দুই ফ্লাইট এটেন্ডেন্টের সহায়তায় তাঁর হাতে দিস্তার পর দিস্তা চিঠি/চিরকুট তুলে দিলো, একটা কোন মানুষ বাকি ছিলো না সে প্লেনে যে সহানুভূতির দুটো কথা লেখেনি সেখানে। আর প্লেন ছেড়ে নামবার আগে প্রত্যেক যাত্রীই থেমে কিছুক্ষণ কথা বলে গেছে সেই দাদীমার সঙ্গে।

না, এমন না যে এমন ঘটনা শুধু আমেরিকাতেই ঘটে। আপনাদের কি রানা প্লাজা মনে নেই? ছুটে গিয়েছিলো কিন্তু সাধারণ মানুষেরাই, যে যার মতো করে মাঠে নেমে পড়েছিলো। বাংলাদেশে তো মনখারাপ করা গল্পগুলোর অভাব নেই- বিকৃত, কুৎসিত কমেন্ট করার মতো মানুষদের দেখে দেখে আমরা হতাশ হয়ে যাই, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করা মানুষগুলোর কি কম? প্রতিবাদ করা, অন্যায় দেখে রাগে ফুঁসে ওঠা মানুষের কি অভাব? মোটেও না! মন খারাপের একটা স্ট্যাটাস লিখে দেবেন, আর কমেন্টে না হোক, ইনবক্সে কি মেসেজ চলে আসে না, “তুমি ঠিক আছো?” জানতে চেয়ে? – প্রকাশ্যে কেউ কেউ, আর চুপচাপ আরো অনেকে, কি বিভিন্ন রকম কার্যক্রমের সাথে জড়িত নেই, আশপাশের মানুষকে ভালো রাখবার প্রয়াসে?

একেক সময়ে আমরা একেক রকম সমস্যার মুখোমুখি হই। এই মুহুর্তে ধর্মীয় এক প্রচন্ড ক্রাইসিসের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি বলে মাঝে মাঝে মনে হয়। জঙ্গিবাদীর কোপ থেকে মতের ভিন্নতা হলেই বিভিন্ন রকম ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে মন খুলে কেউ কারোর সাথে কথা বলতে না পারা! তবুও কি সাধারণ মানুষেরা সংখ্যায় বেশি নেই, যারা হয়তো তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনদিন খুব গুছিয়ে মুখের কথায় বলে বোঝাতে পারবে না, কিন্তু তাদের ছোটবড় কাজগুলো কি প্রতিনিয়ত তাদের মানবতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না? আপনার ভিন্নমতের সাথে সে হয়তো কোমর বেঁধে ঝগড়া করবে, কিন্তু আপনার প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ওষুধটি হয়তো সে’ই এগিয়ে দেবে।

আশপাশের বিভিন্ন মনখারাপ ঘটনাতে আপনি যখন হতাশ হয়ে পড়ছেন, পরাজিত বোধ করছেন, আপনি কি সেই মুহূর্তেও কোন পরিবর্তন আনতে পারেন? অবশ্যই পারেন! আপনি নিজে সহিষ্ণু হতে পারেন, নিজে মানবিক হতে পারেন, নিজে মতামতের ভিন্নতাকে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ করে দিতে পারেন। নিজে সচেতন হতে পারেন; আপনার জীবনে কোন বিরূপ ঘটনাটা ঘটেনি মানে এই নয়, অন্য কারোর জীবনে কিছু হচ্ছে না – মাঝে মাঝে এই বোধটুকুই যথেষ্ঠ। তখন আপনি পারবেন আর কারো ‘কন্ঠস্বর’ হতে, যার হয়তো এই মুহুর্তে নিজের কথাটা বলবার সুযোগটুকু নেই।

আর তেমন উদাহরণ কি আমাদের আশেপাশেই নেই? আছে, অবশ্যই আছে! হয়তো এদের কারো লেখা আপনার ভালো লাগে, ভাবেন, বাহ, কী সুন্দর করে বলে/ভাবে! হয়তো এদের কাজ দেখে আপনি মুগ্ধ; ভাবছেন, আহা, সবাই যদি ওর মতো হতো! – সবার হতে হবে না, আপনাকেও সব হতে হবে না, কিন্তু আর কারো ভালোটাকে যদি চিনতে পারেন, তার কারণ হচ্ছে সেই একই ভালো’টা আপনার নিজের মাঝেও আছে! সেটাকে ঝলসে উঠতে দিন, আপনার সেই মশালটাই দেখবেন একদিন অসংখ্য মানুষকে পথ দেখাবে, তাদের ‘আশার আলো’ হবে ইনশাল্লাহ!

“যদি কেয়ামত চলে আসে, কিন্তু তোমার হাতে একটি গাছের চারা থেকে থাকে, তাহলে তুমি সেটা রোপণ করে ফেলো!” – হযরত মুহাম্মদ (সাঃ); আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত (সূত্র: মুসনাদ আহমাদ ১২৪৯১)। – এর চাইতে অদ্ভুত আশাবাদী কথা আমি শুনিনি! পৃথিবী ধবংস হয়ে যাচ্ছে, তবুও যদি তোমার হাতে সুযোগ থাকে খুব সামান্য করে হলেও সেই পৃথিবীটাকে রক্ষা করার, আরেকটু সবুজ করবার, তবে তুমি তা করো!

কে বলেছে পৃথিবীতে খারাপের সংখ্যা বেশি? যতক্ষণ আপনি একজন ভালোমানুষ আছেন, তখন আপনার এই ‘এক’টাই আপনার পৃথিবীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেটি কখনো ভুলবেন না!

রনিয়া রহিম

রনিয়া রহিম

রনিয়া রহিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্প সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

আপনার মতামত দিন....

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.