রোববার, ১৩ মার্চ ২০১৬ ০৩:০৫ ঘন্টা
সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশিদের জন্য বিশ্ব শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে দেশে বাড়ছে বেকার যুবকের সংখ্যা। অপরদিকে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।
শেকড়ের সংবাদ অনুসন্ধানি প্রতিবেদন
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম : ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রধান জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলোতে রফতানিকারক হিসেবে বাংলাদেশই ছিলো প্রথম সারির দেশ। অথচ এইসব দেশগুলোতে এখন বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি নামমাত্র পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব ও আরব আমিরাতে জনশক্তি রফতানি একেবারেই কমে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্তসহ নানা কারণে ইরাক, লিবিয়া, কুয়েত, ইয়েমেন, সুদান প্রভৃতি দেশের শ্রমবাজার এমনিতেই কয়েক বছর ধরে বন্ধ বলা চলে। মন্ত্রণালয়সহ স্বার্থান্বেষী গ্রুপগুলোর নিজেদের মধ্যকার ভাগাভাগির বিরোধ ও অতি লোভের কারণে সর্বশেষ মালয়েশিয়া শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে।
জানা গেছে, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশ্বের ১৬০টি দেশে জনশক্তি রফতানির কথা বলা হলেও ১৪৪টিতেই পরিস্থিতি চরম হতাশাজনক। আর নতুন যেসব শ্রমবাজার সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি সরকার। নতুন শ্রমবাজারের দুয়ার খোলাতো দূরের কথা, পুরনো বাজারই ধরে রাখতে পারছে না। ওমান, কাতার, সিঙ্গাপুর, বাহরাইন, লেবাননই এখন বাংলাদেশের ভরসা। এই পাঁচ দেশে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার সংখ্যা আপাতত বেশি হলেও একসময়ে কর্মী নেওয়ার সংখ্যা কমে যাবে বলে ধারণা করছেন জনশক্তি রফতানি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তখন বিকল্প শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বায়রাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়লেও পর্যাপ্ত শ্রমিক রফতানি করছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রমিকদের স্থান দখল করে নিয়েছে এই দেশগুলোর শ্রমিক। মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, চেষ্টা, লবিং, কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তরিকতার অভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রবাসীদের কল্যাণ আর বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দিকে নজর নেই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের। সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ ধান্দায়। বর্তমানে যে স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক বিদেশ যাচ্ছে তাদের থেকে জনপ্রতি কমিশন আদায় নিয়ে ব্যস্ত সবাই।
শেকড়ের অনুসন্ধনে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে অগ্রগতি কিছুই হয়নি। বরং বিদেশে জনশক্তির বাজারে একের পর এক ধ্বস নেমেছে। এখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে তাও সঠিক নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। বাস্তব চিত্র আরো করুণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০০৮ সালে যেখানে প্রায় ৯ লাখ জনশক্তি রফতানি হতো এখন তা হ্রাস পেয়ে অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পরিবর্তন করলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আরো যেন ঝিমিয়ে পড়ছে ক্রমাগত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই সরকারি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে নিজেদের ধান্দাতেই ব্যস্ত থাকছেন। বিশেষ করে মন্ত্রী-সচিব উভয়ের দফতরই এক রকমের দালাল দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে সবসময়। খন্দকার ইফতেখার হায়দার সচিব পদে থাকাকালে ব্যাপকহারে দুর্নীতি-অপকর্ম করেছেন। তার অবৈধ অর্থ আয়ের বিষয়ে পত্র-পত্রিকায় খবরও প্রচারিত হয়েছে। শেষ সময়ে অতি বেপরোয়া এই সচিবের কর্মকান্ড নিয়ে আলোচনা হলেও তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে যিনি সচিব পদে এসেছেন তিনি পুরাতন সিন্ডিকেটেরই সদস্য- এ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের।
সংবাদ শেকড়ের
দালাল চক্রের দৌরাত্ম
বর্তমানে মন্ত্রীর দফতর চলছে তার ছেলের নির্দেশনায়। মন্ত্রীর ছেলের আশপাশে রয়েছে দালালের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। মন্ত্রী পরিবর্তন হলেও দালাল পরিবর্তন হয়নি। পুরাতন সেই দালাল চক্রই মন্ত্রণালয়ে শতশত কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করছে। দালাল ও মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বৈধ জনশক্তি রফতানীকারকদের জিম্মি করে বহির্গমন ছাড়পত্র অনুমোদনের জন্য জন প্রতি জনের থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে বিদেশ গমনেচ্ছুদের জনপ্রতি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে অনেক। অথচ সরকারের ঘোষণা ছিল জন প্রতি মাত্র বিশ হাজার টাকায় বিদেশ যেতে পারবে শ্রমিকরা।
সূত্র জানায়, এই প্রভাবশালী দালাল চক্র সম্প্রতি রিক্রুটিং এজেন্সি আল-নাহিয়ান, আকাশ ভ্রমণ, আল-মাস, কবির এন্টারপ্রাইজ এবং ছিদ্দিকা এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে জন প্রতি বিশ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছে। ইরাক ও সৌদি আরবের বহির্গমন ছাড়পত্রে এ অর্থ নেয়া হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে ইতিমধ্যে এ খবর বেরিয়েছে। আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তারপরও থেমে নেই দালালচক্রের তৎপরতা।
মালয়েশিয়া
শ্রমিক রপ্তানির দুয়ার ভালোভাবে খুলতে গিয়ে পুরোপুরিই বন্ধ হয়ে গেল মালয়েশিয়ার। মালয়েশিয়ায় জিটুজি পদ্ধতি ধরাশায়ী হওয়ার পরে এবার জিটুজি প্লাস চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দিনই বন্ধ হয়ে যায়। শুধু নতুন শ্রমিক নেওয়া বন্ধই নয়, দেশটিতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদেরও ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশির কোন প্রকার কাগজ-পত্র নেই। তারা সবাই অবৈধভাবে দেশটিতে রয়েছে।
এ চুক্তি সম্পাদনের আগেই অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। তাদের অভিযোগ, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি না করে গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর হাতে পুরো ক্ষমতা তুলে দেয়া হচ্ছে। সিন্ডিকেট তৈরির তৎপরতা রুখে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বায়রা। একইসঙ্গে সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতিকে চিঠি দিয়েছে প্রতিকার চেয়ে চুক্তির আগ মুহূর্তে।
মন্ত্রণালয়ের কমিশন বাণিজ্য, অসহযোগিতাসহ অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ থেকে ২০০৯ সালে জনবল নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। সে গিট খুলে ২০১২ সালে। সরকারিভাবে জি-টু-জি পদ্ধতিতে শ্রমিক নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ লোক নিবে। প্রতি ৬ মাসে ৫০ হাজার লোক নিবে মালয়েশিয়া। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত ৩ বছরে প্রায় দশ হাজারের মত লোক এ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় গেছে। জি টু জি ব্যর্থতার পর আসে বি টু বি অর্থাৎ বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রফতানির আলোচনা। বেশ হাঁক-ডাকও দেয়া হয়। ‘হয়ে যাচ্ছে বি টু বি’ চুক্তি- এমন পর্যায়ে এসে হঠাৎ ঘোষণা দেয়া হয়, বি টু বি নয় জি টু জি প্লাস চুক্তি হবে। জি টু জি প্লাস কি এবং এটি কীভাবে প্রতিপালন করা হবে তা বুঝতেই কিছু দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। অবশেষে আসে চুক্তির ক্ষণ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও মালয়েশিয়ার পক্ষে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রিচার্ড রায়ত শ্রমিক নেওয়া সংক্রান্ত এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে ৫ বছরে ১৫ লাখ শ্রমিক নিবে মালয়েশিয়া। এ মর্মে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু বিধি বাম, পরের দিনই ১৯ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রিচার্ড রায়ত জায়েম বললেন, ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়ার খবর বা চুক্তি সঠিক নয়। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশে এমন নিবন্ধিত শ্রমিকের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ। বাংলাদেশের জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোতে এরা নিবন্ধিত। এসব শ্রমিক মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে বা কাজ করতে আগ্রহী। তাই তাদের নাম নিবন্ধিত করেছে বাংলাদেশের জনশক্তি ব্যুরো। বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া- এমন কোনো কথা চুক্তিতে নেই এবং এ ব্যাপারে কোনো মৌখিক প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়নি বলে মালয়েশীয় মন্ত্রী তাদের দেশে সংবাদ সম্মেলনে জানান।
ঢাকা-কুয়ালামপুর চুক্তির ব্যাপারে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতো শ্রী রিচার্ড রায়ত জায়েম আরো বলেন, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনে শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে একটি সমঝোতায় উপনীত হয়েছে এবং একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে মাত্র।
এ ঘোষণার পরের দিনই মালয়েশিয়ান দূতাবাস অনুমতিপত্র (এমপ্লয়মেন্ট পাস) বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশী দক্ষ শ্রমিকদের প্রফেশনাল ভিসার অনুমতিপত্র বা এমপ্লয়মেন্ট পাস দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে বলে জানায়, দূতাবাসের ভিসা প্রসেসিং সংক্রান্ত এজেন্ট প্রতিষ্ঠান ভিএলএন। ভিএলএন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মালয়েশিয়া বিদেশী শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ঘোষণা করায় এখন থেকে আর কোনো এমপ্লয়মেন্ট পাস দেওয়া হবে না। শুধু তাই নয়, এরপর শুরু হয় অবৈধ শ্রমিক ব্যাপকহারে ধরপাকড়, যা এখনো চলছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি চুক্তি না-ই থাকে ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়ার কথা, তাহলে কেন আমাদের মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা এমন মিথ্যা ঘোষণা ও ভাওতাবাজির আশ্রয় নিলেন? তারা কি ধোঁকাবাজ আদম ব্যাপারি সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে এ ডাহা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছেন? তারা কি জানেন না এ মিথ্যা প্রচারণাকে ব্যবহার করে সারা দেশের লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে পথে বসানোর পাঁয়তারা করছিল ধোঁকাবাজ আদম ব্যাপারিরা?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মালয়েশিয়া মূলত দুটি কারণে চুক্তি করেও সরে এসেছে, এমনকি শ্রমিক নেয়াই পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথমত. তারা দেখতে পেরেছে, শ্রমিক নেয়ার এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, রেষারেষি এবং অনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়ে গিয়েছিল। যার নেতিবাচক প্রভাব মালয়েশিয়াতেও পড়ছিল। দ্বিতীয়ত. তাদের জন্য বড় বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিচ্ছিল ১৫ লাখ শ্রমিকের মিথ্যা প্রচারণাটি। তাদের দেশে, এমনকি সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। খোদ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেই এমন মিথ্যা প্রচারণা চালানোয় তারা চরমভাবে আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি বিক্রি করে আদম ব্যাপারিদের টাকা দেবে। যখন বৈধ পথে নেয়া যাবে না, আদম ব্যাপারিরা নানা অবৈধ উপায়ে এদেরকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। যা এক পর্যায়ে বিপজ্জনক হয়ে দেখা দেবে। এইসব বিবেচনা করেই মালয়েশিয়া সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এতে বাংলাদেশের ‘আমও গেল, ছালাও গেল’ বলা যায়। যার পুরো দায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিদের।
সৌদি আরব
একসময় বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী যেতো সৌদি-আরব এবং আরব-আমিরাতে। কিন্তু বাংলাদেশি নাগরিকদের অনৈতিক অপরাধসহ সমাজ বিরোধী অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ‘বলি’ হিসেবে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ে ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ হয়ে যায় বাংলাদেশ। কালো তালিকায় থেকে পার হয় বেশ কয়েকটি বছর। এরই মধ্যে সৌদি আরবের ঘরে ঘরে ভিনদেশি নারী গৃহকর্মীদের ওপর তাদের কফিলদের দ্বারা মানসিক-শারীরিক ও যৌন নির্যাতন অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করায় ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলংকা সরকার সৌদি-আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। ফলে গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবে চলছে মারাত্মক গৃহকর্মী সঙ্কট। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি সরকার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বাংলাদেশের ওপর। ঢাকার তরফ থেকে যেহেতু কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ তথা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের, তাই এ যাত্রায় সুযোগ নেয় সৌদিরাও। ‘আগে নারী গৃহকর্মী তথা হাউজমেইড পাঠাতে হবে’ এমন বিশেষ কন্ডিশনে বাংলাদেশের ওপর থেকে সীমিত আকারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়। অপ্রিয় হলেও সত্য, ‘আগে নারী তারপরে বাদবাকী’ এই গোপন শর্তাবলীর ‘এ-টু-জেড’ দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে সযত্নে চেপে যান তৎকালীন মন্ত্রী স্বয়ং খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
সত্য আড়াল করে এমন নাটককেই প্রচার করা হয় সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে। ঢাকাস্থ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে এমনকি রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দার কনস্যুলেটের মাধ্যমে ‘আরব নিউজ’ পত্রিকাকে ‘ম্যানেজ’ করে ‘সৌদিতে শ্রমবাজার খুলে গেছে’ এবং ‘বিভিন্ন পেশায় লাখ লাখ কর্মী নেয়া হচ্ছে শিগগিরই’ এমন সব ‘ফ্যাব্রিকেটেড’ তথা ভুয়া-ভিত্তিহীন-বানোয়াট সংবাদ প্রচার করানো হয় ২০১৪ সালের পুরোটা জুড়ে। অনেকটা বিনামূল্যে সৌদি যাবার ‘বোগাস’ প্রচারণায় ঢাকায় লাইন দেয় হাজার হাজার লোক, চলে ভাঙচুর। মন্ত্রণালয়ের ছলচাতুরী অবশেষে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মন্ত্রীকে যা-তা ভাষায় গালমন্দ করে ফিরে যান সবাই, রেখে যান ক্ষোভ। ঠিক এমন সময় মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় মনোযোগী হয়ে ওঠে সৌদিদের সেই গোপন ‘কন্ডিশন’ তথা নারী গৃহকর্মী সাপ্লাই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে।
দুবাইয়ের অলিতে গলিতে যেখানে বহু বছর ধরে আফ্রিকান মানুষরূপী জানোয়াররা বাংলাদেশের অসহায় নারীদের দিয়ে যৌন ক্ষুধা মিটিয়ে চলেছে, স্বদেশি মা-বোনদের কান্নায় যখন প্রতিনিয়ত আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে লেবাননে, তার কোনো কুলকিনারা না করে উল্টো সৌদি আরবে ‘হাউজ মেইড’ পাঠাবার নামে নিরীহ নারীদের পাঠাতে উঠে পড়ে লাগে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এক শ্রেণির সৌদি পুরুষদের চব্বিশ ঘণ্টা নির্যাতনের মুখে বাংলার অজপাড়া গাঁয়ের অবলা নারীরা নিজেদের কিভাবে কতটা সামাল দেবেন, তা ভেবে দেখার সময় পাননি দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মন্ত্রণালয়ের সচেতন কর্মকর্তারা পর্যন্ত বলাবলি করেছেন, গৃহকর্মী পাঠানো পাপ। কত সংসার যে ভাঙবে তার ঠিক নেই। এ পাপের ভাগী কেন হব? তারপরও থেমে থাকেনি এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
সরকারিভাবে নারীদের ডাক দেয়া হয় নিবন্ধনের। ১০ লাখ নারীকে নিবন্ধনের আওতায় আনার কথা বলা হলেও মিডিয়ার মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জের নারীদের কাছে আগেই পৌঁছে যায় সৌদি আরবের ঘরে-ঘরে ঘটে চলা বিদেশি হাউজমেইডদের ওপর জঘন্য অত্যাচারের সংবাদ। মন্ত্রীকে হতাশ করে দিয়ে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের ৫ হাজার নারীও নাম লেখাননি সৌদি-নিবন্ধনের খাতায়। তখন দায়িত্বে থাকা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন অবশ্য আরো বেশ আগে থেকেই যারপরনাই হতাশ ছিলেন আরব আমিরাতে প্রত্যাশিত জনশক্তি রপ্তানিতে ব্যর্থ হয়ে।
আরব আমিরাত
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের সব ধরনের নতুন ভিসা অনুমোদন ২০১২ সালের আগস্ট মাস থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে আরব আমিরাত। ভিসা বন্ধের কারণ হিসাবে বলা হয়েছিলো, ভিসা ও পাসপোর্ট জালিয়াতি, পর্ণো সিডি ব্যবসা, চুরি, খুন, এমনকি ধর্ষণের মত মারাত্মক অপরাধ এবং বেআইনী কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। অনেকে স্বল্প-মেয়াদী ভুয়া কোম্পানির নামে ভিসা বের করে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিয়েছে। মাত্র ৩/৪ মাসের মধ্যে ওই সব কোম্পানি বিলুপ্ত হয়ে যায়, আর কোম্পানির স্পন্সরশীপে আসা অসহায় মানুষগুলো তখন সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মরিয়া হয়ে অনেকে অপরাধের জগতে পা বাড়িয়েছে। যা সত্যিই দুঃখজনক। উল্লেখ্য, আরব বিশ্বে কর্মরত প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে ১২ লাখই রয়েছে আমিরাতে।
জাল পাসপোর্ট-ভিসা প্রভৃতি কারণ থাকলেও মূলত আমিরাতের দুয়ার বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ হবার নেপথ্যের বড় কারণ হিসেবে ভাবা হয়ে থাকে এক্স-পো ২০২০-তে ভোট না দেয়াকে। প্রতি বছর এক লাখ করে তিন বছরে বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ কর্মী নেয়ার পরিকল্পনা ছিল আমিরাত সরকারের। কিন্তু এক্স-পোতে ভোট না পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তা তারা পুরোটাই তুলে দেয় নেপালের হাতে। শুধু তাই নয়, আমিরাতের ভিসা বাংলাদেশিদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক এক্স-পো অনুষ্ঠিত হবে। এক্স-পো ভেন্যু ঠিক করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভোট হয়। বাংলাদেশের ভোট চেয়েছিল আরব-আমিরাত। তখন আলোচনা চলছিলো ভেন্যু পেলে এক্স-পো করতে নতুন একটি শহর নির্মাণ করবে আরব-আমিরাত। সড়ক, ভবন, হোটেল, ব্রিজসহ অবকাঠামো নির্মাণ করতে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিবে দেশটি। কিন্তু বাংলাদেশের ভোট না পেলেও নেপালের ভোটটি ঠিকই পেয়েছিল দুবাই। বাংলাদেশের ভুলে শুধু ২০১৪ সালেই প্রায় লাখ খানেক নেপালী কর্মীর কর্মসংস্থান হয় আমিরাতে। অথচ বাংলাদেশের প্রাপ্তি শূন্য। প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়েও খন্দকার মোশাররফ হোসেন ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেন এক্স-পো ভোটাভুটি ইস্যুতে। পরবর্তীতে নেপালের সঙ্গে ৩ লাখ নতুন ভিসা-চুক্তি দুবাইকে ভোট দেয়ারই পুরস্কার বলে মনে করা হচ্ছে।
ডাক্তার নার্স নিচ্ছে সৌদি সরকার, নাম নেই বাংলাদেশের
পাকিস্তান ও ভারতসহ ৯টি দেশ থেকে সৌদি আরব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নার্স নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু সে তালিকায় নেই বাংলাদেশের নাম। এর আগে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগে সৌদি আরব সরকারের আগ্রহ ছিলো অনেক বেশি। কিন্তু এবার বাংলাদেশের নাম রাখা হয়নি। এ নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে অনেক দেন দরবার করেও কোনো কাজ হয়নি।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নার্সদের জন্য সৌদি আরবের হাসপাতালগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমাদের চিকিৎসক ও নার্সরা সেখানে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি সৌদি সরকার এ খাতে সব মিলিয়ে কয়েক হাজার প্রবাসী নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। নিয়োগ দেয়া হবে পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইন, মিশর, জর্ডান, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া, লেবানন ও সুদান থেকে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমন্বয় করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ প্রতিবেদক

