চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর, কক্সবাজার উপকূলকে ৬ নম্বর এবং মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত জারি
মাহাবুবুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
শুক্রবার, ২০ মে ২০১৬
বাংলাদেশের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’। পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড়টি সামান্য উত্তর ও উত্তর–পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর ও উত্তর–পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আগামীকাল বিকেল অথবা সন্ধ্যার দিকে চট্টগ্রাম-নোয়াখালী উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত, কক্সবাজার উপকূলকে ৬ নম্বর এবং মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৯৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে, কক্সবাজার উপকূল থেকে ৯৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮১০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে।
এ কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেতের পরিবর্তে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চলগুলোতে ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দরে তৃতীয় মাত্রার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এছাড়া কক্সবাজার উপকূলে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এদিকে মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৫ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার-পাঁচ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর জেলা এবং এগুলোর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিসহ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রামে সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা প্রস্তুতি ঃ
চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে ধেঁয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৮৫১টি আশ্রয়কেন্দ্র।
উপকূল এলাকা আনোয়ারা এবং বাশঁখালীর ৩ হাজার ৮৫১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে উপকূলের সাড়ে ৮ লাখ মানুষকে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উপকূলে কাজ করছে ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবী।
শুক্রবার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারির পর উপকূলবাসীদের সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। জেলা পর্যায়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার পাশাপাশি সকল উপজেলায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে সব ধরণের পণ্য উঠানামা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের সকল সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবরকম ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সাগরে থাকা অধিকাংশ মাছ ধরার নৌযানগুলো উপকূলে ফিরেছে। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও।
শুক্রবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন সিটিজিবার্তা২৪ডটকমকে বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। ঘূর্ণিঝড়টি বাঁশখালী-আনোয়ারা উপকূল দিয়ে আঘাত হানার সম্ভাবনা আছে। তাই সেখানকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। এই দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে উপজেলাগুলোর সকল স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোকে।’
নগরীতে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানার সম্ভাবনা নেই জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নগরীতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। এজন্য বাঁশখালী-আনোয়ারাকে ঘিরেই দুর্যোগ মোকাবেলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।’
জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর হচ্ছে ৬১১৫৪৫। বাংলাদেশ বেতারে সতর্কতা সংকেত বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে স্বেচ্ছাসেবকরা ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার কাজের জন্য চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে অবস্থান করছে। জেলা প্রশাসনের ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। এছাড়া উপজেলা শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শামসুজ্জামান সিটিজিবার্তা২৪ডটকমকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্দেশ পেয়েই আমাদের ১৪টি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছি। শুকনো খাবারসহ সব ধরনের ত্রাণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামেই আমাদের প্রতিনিধিরা পৌঁছেছেন। আমরা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরে জরুরি সভায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু মোকাবেলায় কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থানরত সকল লাইটারেজ জাহাজকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বন্দরে অবস্থানরত সকল পণ্যবাহী জাহাজকে দুই ঘণ্টার নোটিশে বঙ্গোপসাগরের বর্হিনোঙ্গরে নোঙ্গর করতে বলা হয়েছে। বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে সকল ধরনের পণ্য উঠানামা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। বন্দরের সব যন্ত্রপাতি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
এদিকে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্বে জারি করা এলার্ট-টু নামিয়ে এলার্ট-থ্রি জারি করেছে।
বন্দর সূত্র জানায়, এলার্ট-থ্রি হল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ধাপ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৫, ৬ অথবা ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হলে বন্দরে এলার্ট-থ্রি জারি করা হয়।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস, আনসার ভিডিপি, রেড ক্রিসেন্ট, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিদ্যুৎ, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তরসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রস্তুত রেখেছে ৫০০ উদ্ধারকর্মী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। চসিক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিন নগরীর সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন বলে জানান চসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুর রহিম।
এছাড়া তাৎক্ষণিক সেবা নিশ্চিতে নগরীর ওয়াসা মোড়ে খোলা হয়েছে চসিকের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বর ৬৩০৭৩৯ ও ৬৩৩৪৩৯।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে দায়িত্বরত মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘রোয়ানু চট্টগ্রামের দিকেই বেশি ঝুঁকে রয়েছে। তাই চট্টগ্রামে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। এটা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রামে হালকা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দুপুর ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সাগর উত্তাল রয়েছে।’
ঘূর্ণিঝড়টি আরও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ চট্টগ্রাম-নোয়াখালী অঞ্চলের ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
গভীর সাগরে থাকা অধিকাংশ মাছ ধরার নৌযানগুলো উপকূলের কাছাকাছি ফিরেছে বলে জানায় চট্টগ্রামের ফিশিং ট্রলারের মালিকরা।
শুক্রবার দুপুরে আবহাওয়া অধিদফতরে বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে চট্টগ্রাম ৭, কক্সবাজারে ৬, মংলা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার উপকূলের নিকটে ঘূর্ণিঝড় ” রোয়ানু” ঃ
বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূল থেকে ৯৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে দুরে অবস্থান করছে ঘূর্ণিঝড় “রোয়েনু”। এর আগে শুক্রবার সকালে ১১৮০ কিলোমিটার দুরে করছিল উক্ত ঘূর্ণিঝড়। গত আট ঘন্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার কাছে চলে আসা এ ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। এমতাবস্থায় কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নং বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন সিটিজিবার্তা২৪ডটকম কে বলেন, পর্যটক নগরীর দিকে ধেঁয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় “রোয়ানু” মোকাবেলায় সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও সম্ভাব্য দূর্যোগ পরিস্হিতি মোকাবেলায় কক্সবাজারের সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং রেডক্রিসেন্ট কর্মী, মেডিকেল টীম, উদ্ধার কর্মী নিয়োজিত রাখা হয়েছে এবং উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থানে চলে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক সিটিজিবার্তা২৪ডটকমকে জানান, শনিবার (২১ মে) দুপুর অথবা বিকালের দিকে কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড় “রোয়েনু”।
পর্যটন জেলা কক্সবাজার উপকূলের দিকে ধেঁয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফিট উচ্চতায় জলোচ্ছাসে নিম্নাঞ্চল সমূহ প্লাবিত হতে পারে। বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় মৎস্য আহরনে ও চলাচলকারী সকল নৌযানকে রাত আটটার মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।
এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল থেকে ঘন্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মোকাবেলায় বাগেরহাট ও মংলায় ২৩৫টি আশ্রয় কেন্দ্রঃ
ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মোকাবেলায় প্রস্তুতি হিসেবে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ১৮ কন্ট্রোল রুম খুলেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে জেলার ২৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র। বন্ধ রয়েছে মংলা বন্দরে পণ্য ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রম। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে।
শুক্রবার (২০ মে) সকালে থেকে বাগেরহাটের উপকূল জুড়ে থেমে থেমে বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাস বইছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জেলার ৯ উপজেলায় মেডিকেল টিম এবং ১৮টি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এছাড়া জেলার সকল উপজেলা এবং ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
বাগেরহাটের শরণখোলা, মংলা, রামপাল ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার মানুষ যাতে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য ২৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে জেলা প্রশাসন। খোলা হয়েছে ১৮টি কন্ট্রোল রুম। দুর্গতদের উদ্ধার করতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে রেড ক্রিসেন্টসহ সেচ্ছাসেবী সংগঠন। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম।
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু শক্তিশালী হওয়ায় মংলা সমুদ্র বন্দরে ৫ নম্বর সতর্ক সংকেত জারির পর বন্দরে অবস্থান নেয়া জাহাজগুলো নিরাপদে সরিয়ে নিতে জাহাজের ক্যাপ্টেন, এজেন্ট ও স্টিভেডরসকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বন্দরের পোর্ট জেটি, হারবাড়িয়া ও ক্রিক জেটি অবস্থান করছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাংগীর আলম জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তর মংলায় ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করলে তাৎক্ষণিক ভাবে জেলার উপকূলীয় সকল জনসাধারণকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজ শুরু করবে প্রশাসন এবং সেচ্ছাসেবকরা। এজন্য উপকূলীয় জেলার ২৩৫টি ঘূণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তত করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও চিড়া, গুড়সহ শুকনো খাবার মজুদ রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মোকাবেলায় সকল ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
এ দিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় জেলার উপকূলীয় নদ-নদীতে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকশ’ মাছ ধরা ট্রলারের জেলেরা।
ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ প্রভাব মোকাবেলায় নোয়াখালীতে মাইকিংঃ
নোয়াখালী: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ প্রভাব মোকাবেলায় নোয়াখালী জেলা প্রশাসন, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) ও রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে হাতিয়া, সূবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ২৮২টি আশ্রয়ক কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
শুক্রবার (২০ মে) বিকেল থেকে হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজনকে নিরাপদে সরে আসার জন্য মাইকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে গত দু’দিন থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি আরো বেড়ে চলছে। “রোয়ানু” মোকাবেলায় ইত্যোমধ্যে জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ১৫৬টি, সুবর্ণচরে ৯৬টি ও কোম্পানীগঞ্জের উপকূলীয় অঞ্চলের ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে প্রশাসন।
এদিকে, শুক্রবার (২০ মে) বিকেল হতে প্রশাসন, সিপিপি, রেড ত্রিসেন্ট ও রেডিও সাগর দ্বীপের পক্ষ থেকে লোকজনকে নিরাপদে সরে আসতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলাতে মেডিকেল টিম, শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপকূলে থাকা সকল ধরনের মাছধরার ট্রলার, নৌকা’সহ জেলেদের নিরাপদে সরিয়ে আসতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বে ও তিনটি উপজেলার উপকূলের বাসিন্দাদের এখন পর্যন্ত (শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা) আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে দেখা যায়নি। তবে সন্ধ্যার পর থেকে উপকূলের লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে আসবে বলে আশা করছে প্রশাসন।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসান মোহাম্মদ মহিন উদ্দিন, সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন উর রশিদ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন সিটিজিবার্তা২৪ডটকম কে জানান, ইত্যোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় পূর্ব ও পরবর্তী সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলের লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে আসতে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়াও উপকূলের বাসিন্দারে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ২৮২টি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি উপকূলের কাছাকাছি থাকা সকল ধরনের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় ভবনগুলোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে ৭নং বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছেঃ
লক্ষ্মীপুর: ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ ক্রমেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়ায় লক্ষ্মীপুরের চার উপজেলায় ৭নং বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। স্থানীয়দের আশ্রয়কেন্দ্র অবস্থান করার জন্য জেলা প্রশাসনসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান সহকারী মো. শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে সকল মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার ও জেলেসহ সাধারণ মানুষদের নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে অনুরোধ করছেন জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা। লক্ষ্মীপুরে দুর্যোগ মোকাবেলায় খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে ০১৭৮৮-৫৭৭৭২০, ০১৭৮৮-৫৭৭৭২১, ০১৭৮৮-৫৭৭৭২৭, ০৩৮১৬২৪৮৩ নাম্বারে যোগাযোগ করার জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান সহকারী মো. শাহ আলম জানান, লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় অঞ্চল সমূহে ৭নং বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অব্যাহত মাইকিং করে লোকজনদের নিরাপদ স্থানে কিংবা আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করার অনুরোধ করা হচ্ছে। এছাড়াও ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনেরর পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৫ নং বিপদ সংকেত ঃ
পটুয়াখালী: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ ধেয়ে আসছে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর উপকূলের দিকে। ঘূর্ণিঝড়টি পায়রা সমুদ্র বন্দর পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮১০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে।
শুক্রবার (২০ মে) দুপুরে পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। এদিন সকাল থেকেই জেলায় বিভিন্ন এলাকা ভাড়ী বর্ষণ অব্যহত আছে। এছাড়া মাছ ধরার ট্রলারগুলো উপকূলের দিকে ফিরে আসতে শুরু করেছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ছোট ছোট নৌযানসহ মাছ ধরার ট্রলারগুলো নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক একেএম শামিমুল হক ছিদ্দিকী জানান, দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় মেডিকেল টিমসহ ২১২ মেট্রিক টন চাল, ২ লাখ ৮০ হাজার নগদ টাকাসহ শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে।


One thought on “বাংলাদেশের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’”