পবিত্র রমজানে রক্তে রঞ্জিত গুলশান

সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম

published: 2016-07-04  02:39:52 AM BdST

Gulshan-terorist-atack-1024x682-800x533

পবিত্র রমজানের ইফতার সবে শেষ হয়েছে। এমন সময়ই অলক্ষ্যে এগিয়ে এলো হিংস্র ঘাতকের দল- মুখে তাদের পবিত্র ইসলামের স্লোগান। তাদের হামলায় নিহত হন বাংলাদেশের দুই পুলিশ অফিসার এবং ১৭ জন বিদেশি ও ৩ জন বাংলাদেশি। এভাবে বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি হতে বাংলাদেশ কখনও দেখেনি। এমন রক্তাক্ত বাংলাদেশও সাম্প্রতিককালে অচেনা। বলা যায়, একেবারে খুবই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে গেছে শুক্রবার সন্ধ্যায়।

যেসব জিম্মি প্রাণ নিয়ে স্বজনদের কাছে ফিরতে পেরেছেন তারা বলেছেন যারা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে পেরেছে সন্ত্রাসীরা তাদেরই রেহাই দিয়েছে আর বাকি জিম্মিদের হত্যা করেছে। এভাবেই তারা বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশিদের প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে।

যখন ইস্তাম্বুলে সন্ত্রাসী হামলার শিকারদের লাশ সমাহিত করা হচ্ছে, সে সময়ই ইসলামিক স্টেট নামধারী ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের দায় শিকার করেছে। বাংলাদেশ সরকার বরাবরের মতো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া ছাড়াই এই দাবির ব্যাপারে উদাসীন।

 

আইসিস এ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। রমজান মাস শুরুর আগ মুহূর্তে আইসিসের মুখপাত্র আবু মোহাম্মদ আল আদনানি তার অনুসারীদের এই পবিত্র মাসে হামলার মাধ্যমে ‘রহমত’ লাভের কথা বলেছেন।

জর্ডান, লেবানন, ইয়েমেন, তুরস্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডো হামলা তার বিবেচনায় এ লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে।

রমজানের এই পবিত্র দিনগুলোতে খাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য বিষয় ত্যাগের কথা। সংযম পালনের কথা। অথচ তথাকথিত জিহাদিরা পৈশাচিক উপায়ে নারী-পুরুষদের হত্যায় মেতে উঠেছিল। তারা কার জন্য রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠল?

সন্ত্রাসীরা এবারের রমজান মাসকে ‘জিহাদের মাস’ বলে উল্লেখ করছে। তুলনা করেছে ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধের সঙ্গে। রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া এই যুদ্ধে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রথম বড় সামরিক বিজয় অর্জন করেন। অথচ উগ্রবাদীরা এটা মনেই করছেন না যে, বদরের যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষার যুদ্ধ।

বাংলাদেশে পরিচালিত এ হামলার বৈশ্বিক ও স্থানীয় দিক রয়েছে। ইরাকের যে ফালুজা শহরে আইসিস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা এখন তাদের হাতে নেই। ইরাকি বাহিনী ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করে শক্তিশালী এই ঘাঁটি হাতছাড়া করতে বাধ্য করে।

ফলে এখন আইসিস তাদের সমর্থকদের কাছে এটা প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা শেষ হয়ে যায়নি। রমজানে বিভিন্ন জায়গায় যে তাদের হামলা বাড়ছে, এর মাধ্যমে তারা সেটাই বোঝাতে চাইছে।

স্থানীয় বিষয়গুলো বৈশ্বিক আগুনের জ্বালানি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শেখ হাসিনার সঙ্গে ইসলামপন্থিদের দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর বৈরিতা ১৯৭১ সালে দেশটির স্বাধীন হওয়া থেকেই।

শেখ হাসিনার সরকার গত মে মাসে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নৃশংসতার জন্য সর্বোচ্চ আদালতপ্রাপ্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তার অপরাধের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি আলবদর বাহিনী নামে একটি ঘাতক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন ১৯৭১ সালে। বর্তমান সরকার জামায়াতে ইসলামীর আরও কয়েকজন নেতার একই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এর শুরু ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে।

যদিও আল কায়দা ও আইসিস উভয় সংগঠনই জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের প্রেরণা মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে যথেষ্ট মুসলমান না হওয়ায় ঘৃণা করে; তবে বাংলাদেশে ইসলামী সংগঠনের নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য তথাকথিত জিহাদিরা এটা সুযোগ পেয়েছে যে, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি সর্বত্রই ‘ইসলামের সঙ্গে যুদ্ধে’ লিপ্ত।

২০১৩ সালে বাংলাদেশের তথাকথিত জিহাদিরা ৮৪ জন ‘নাস্তিক ব্লগারের’ একটি ‘হিট লিস্ট’ তৈরি করে, যা কুখ্যাতি কুড়ায়। এই তালিকায় রয়েছে উদার মানবতাবাদী ও মুক্তমনা ব্যক্তিরা। ২০১৬ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত তালিকায় থাকা ২০ জনেরও অধিক ব্যক্তিকে তারা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। বেশিরভাগ হত্যার জন্য ব্যবহার হয় চাপাতি। জিহাদিদের ভাষায় তারা যথেষ্ট মুসলমান নয়।

আল কায়দা ও আইসিস উভয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হামলাগুলোর দায় স্বীকার করে নিচ্ছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল কায়দাপ্রধান আইমান আল জাওয়াহিরি ভারতীয় উপমহাদেশে এর শাখা চালুর ঘোষণা করেন।

আইসিসের পত্রিকা আল দাবিকের একটি নিবন্ধে দাবি করা হয় যে, বাংলাদেশে জিহাদের পূনরাবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসন তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে। তবে তারা যা বলছে তাতে কী-ইবা আসে যায়।

সন্ত্রাসী হামলার জন্য একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা প্রয়োজন- এ বিষয়টি অনেক আগেই অতীতে পরিণত হয়েছে। এখন তাদের প্রয়োজন কেবল প্রেরণা। বৈশ্বিক জিহাদি চেতনা ও স্থানীয় বিষয়াদি একাকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু মগজ ধোলাই হওয়া তরুণকে এ রকম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় উৎসাহিত করা সম্ভব। এমনকি তারা একে বীরোচিত কাজ হিসেবেও ভাবতে পারে।

এখন বাংলাদেশের এ হামলার পর যখন আমরা প্রশ্ন তুলব, কে এর পেছনে- আল কায়দা নাকি আইসিস কিংবা স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা কোনো শক্তি, তখন তথাকথিত জিহাদিরা কিন্তু এ রকম আরও হামলা চালাতে তারা উৎসাহবোধ করতে পারে।

আনুমানিক ৯০ বছর ধরে ইসলামী চরমপন্থিরা উগ্রবাদের ভিত শক্ত করতে সক্রিয় রয়েছে। এদের মাধ্যমে একটি অসহিষ্ণু ও সহিংস রাজনৈতিক ধারা আমরা দেখছি।

সেক্যুলার স্বৈরাচারী শক্তি তাদের পথের যে কোনো বাধা দূর করায় দৃঢ়সংকল্প। অন্যদিকে, ইসলামী চরমপন্থিরা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেই তাদের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই উভয় শক্তির মাঝে অসহায় হয়ে পড়েছেন মুসলিম উদারপন্থি ব্যক্তিরা। আমাদের এখন এ বিষয়টির প্রতি মনোযোগ প্রদানের সময় এসেছে। সে কাজ অনেক জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অথচ আমাদের মনোযোগ কেবল সাম্প্রতিক জিহাদি অপশক্তির উত্থানকে ঘিরেই।

দ্য ডেইলি বিস্ট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *