মাহাবুবুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৬
চট্টগ্রাম: বানিজ্যিক রাজধানী ঘোষণার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। এজন্য তারা সরকারের সদিচ্ছা, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের দ্বিধাবিভক্তিকে দুষছেন। এ দাবি আদায়ে চট্টগ্রাম কে সত্যিকার অর্থে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও গণমাধ্যমকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলে মন্তব্য করেন উক্ত আলোচনা বৈঠকে।
অতীতের মতো আর কথামালা মধ্যে নয়, আমরা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চাই সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চট্টগ্রামে বিনিয়োগও কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। এ সমস্যা সমাধানে জরুরী পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ব্যাবসায়ীরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘পদ্মাসেতু’ নির্মাণের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী করতে অনুরূপ উদ্যোগ নিতে হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার সমকালের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী : ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা ।
সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সারোয়ার সুমনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খান, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম, বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ সভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব, চিটাগাং উইমেন চেম্বারের পরিচালক রেখা আলম চৌধুরী, জুনিয়র চেম্বার অব কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিট, জুনিয়র চেম্বার চট্টগ্রামের সভাপতি জসীম আহমেদ, সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, সমকালের ডিজিএম (মার্কেটিং) সুজিত কুমার দাশ, ফ্রেন্ডস ফুড অ্যান্ড স্ন্যাকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ও এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমকালের ডিজিএম (সার্কুলেশন) অমিত রাইহান ।
সংসদ সদস্য দিদারুল আলম বলেন, ‘বিগত বিএনপি জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামে আটজন মন্ত্রী ছিলেন। তখন তেমন কোন উন্নয়ন কাজই হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে চট্টগ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চট্টগ্রামে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বেড়েছে। গ্যাস, পানি ও যানজট যে সমস্যাগুলো রয়েছে তাও অচিরেই কেটে যাবে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ তরান্বিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’

‘বানিজ্যিক রাজধানী ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ’ গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখছেন দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সরোয়ার
সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। চট্টগ্রাম নিয়ে কোন রাজনীতি হতে পারে না। চট্টগ্রামকে সত্যিকার বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দায়িত্ব নিয়ে হবে। বলতে হবে এটাই আমার প্রজেক্ট। তাহলেই চট্টগ্রামকে সত্যিকার বাণিজ্যিক রাজধানী করা সম্ভব। চট্টগ্রামকে আমাদের সবার উপরে রাখা উচিত। কারণ চট্টগ্রামের মতো এমন প্রাকৃতিক স্থান পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এখানে যে বন্দর রয়েছে তাকে কাজে লাগাতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে নির্বাহি পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এসএম শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘বাণিজ্যিক রাজধানীর জন্য যে অবকাঠামো দরকার সেটা গড়ে উঠেনি। নেওয়া হয়নি সমন্বিত উদ্যোগও। দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই প্রশাসনিক রাজধানী এবং বাণিজ্যিক রাজধানীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে।’
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, ‘বাণিজ্যিক রাজধানী একটি বুলি। এ বুলির কোন মর্মার্থ নেই। বাণিজ্যিক রাজধানীর জন্য প্রাকৃতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক উপাদান প্রয়োজন। চট্টগ্রামে প্রকৃতি প্রদত্ত সমস্ত উপাদান আছে কিন্তু আর্থিক ও প্রশাসনিক উপাদান নেই। এ দুইটি উপাদান বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক হলেই বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘যেখানে ব্যবসার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকবে সেখানে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। ভৌগলিক কারণে চট্টগ্রামের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ অনেক বেশি। কিন্তু চট্টগ্রামের কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।’
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ সভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতি যারা করেন, নীতি নির্ধারক মহলে যাদের যোগাযোগ, ক্ষমতার কাছাকাছি যারা আছেন, তারা কখনো বিশ্বাস থেকে বাণিজ্যিক রাজধানী এ কথাটি বলেন না। তারা রাজনৈতিক প্রয়োজনে এ কথা বলেন। বাস্তবতা হলো চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করতে হয়। চট্টগ্রামে বিমানবন্দরে যেতে লাগে দেড়ঘণ্টা, আসতে লাগে দুই ঘণ্টা। এ ধরণের কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে।’
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রামকে প্রয়োজন। চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গবেষণা করলেও আমাদের জাতীয় সংসদে চট্টগ্রামকে নিয়ে কোন গবেষণা করা হয় না। চট্টগ্রামে খন্ডিত কিছু উন্নয়ন হচ্ছে তবে এ খন্ডিত উন্নয়ন একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। হয় সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী করুন আর না হয় বাণিজ্যিক রাজধানী না করে আমাদের সুখে শান্তিতে থাকতে দিন।
চিটাগাং উইমেন চেম্বারের পরিচালক রেখা আলম চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের হৃদপিণ্ড। শরীরের হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেলে যেমন রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের উন্নয়ন না হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিও বন্ধ হয়ে যাবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের স্বার্থে চট্টগ্রামের উন্নয়ন হওয়া উচিত।’
জুনিয়র চেম্বার অব কমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিট বলেন, ‘এখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাঙ্খিত পর্যায়ে না হওয়ায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ১৪ বছর ধরে কাজ করার পর নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের নির্মাণ শেষ হয়েছে। একটা অবকাঠামোগত উন্নয়নে যদি ১৪ বছর লাগে তাহলে কিভাবে কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব?’
জুনিয়র চেম্বার চট্টগ্রামের সভাপতি জসীম আহমেদ বলেন, ‘দেশের সব কিছু ঢাকা কেন্দ্রীক হওয়ার কারণে আমাদের ব্যবসা সংক্রান্ত ঋণের জন্য আমাদের দৌড়াতে হয় ঢাকায়। এর মাধ্যমে অর্থ ও সময় দুটোও ব্যয় হয়। তাই দেশ ও চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে ব্যাংকিং সেক্টরের কিছু কেন্দ্রীয় শাখা চট্টগ্রামে রাখা উচিত। এসব সমস্যার পর আমরা বিশ্বাস করি সবাই মিলে কাজ করলে সত্যিকারের অর্থে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে উঠবে।’
এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেন, ‘নানা সময় বাণিজ্যিক রাজধানী নিয়ে আলাপ-আলোচনা হলেও দেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে কখনো জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়নি। দেশের আমদানি-রফতানির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অবসম্ভব।
ফ্রেন্ডস ফুড অ্যান্ড স্ন্যাকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। ফলে জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালু রাখার কারণে প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে। জ্বালানি খাতে খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ব্যবসা বাণিজ্য গুটিয়ে নিচ্ছে। তাই বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সমস্যা সমাধান করতে হবে।’
উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে , সমকালের সহকারী সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, সমকালের ডিজিএম (মার্কেটিং) সুজিত কুমার দাশ, প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/ জেএ/এমকে







