চট্টগ্রামে ‘মৃত্যুঘর’ ডালিম হোটেলের ইজারাদার মীর কাসেম

মাহাবুবুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

 

Dalim-hotel-ctg-09-03-11.04.16

চট্টগ্রাম: একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্দর নগরী চট্টগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর আলবদর নেতা মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ বাঙালিদের অপহরণের পর যেখানে আটকে রেখে চোখ বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো সেই ডালিম হোটেলকে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ে ‘মৃত্যুঘর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিচারকরা।

সাক্ষীরা বলেছেন, মীর কাসেমের উপস্থিতিতেই বদর বাহিনীর সদস্যরা আটককৃতদের চোখ-মুখ-হাত-পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটাতো, লোহার চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও তাদের অস্ত্রের বিষয়ে জানতে চাইতো।

নির্যাতনের পর বন্দিরা পানি খেতে চাইলে তাদের পানি পানের বদলে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হত।

চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা টেলিগ্রাফ সড়কে ‘মহামায়া ভবন’টি রাজাকার আলবদররা দখল করে নাম দিয়েছিল ‘ডালিম হোটেল’। আল-বদর বাহিনী প্রধান মীর কাসেম আলীর নির্দেশেই মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহযোগী ও স্থানীয় হিন্দুদের ধরে সেখানে নিয়ে চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন।

এই ডালিম হোটেলকে ‘জল্লাদখানা’ হিসেবে চিনতো চট্টগ্রামের মানুষ। ডালিম হোটেল ছাড়াও নগরীর চাক্তাই চামড়ার গুদামের দোস্ত মোহাম্মদ বিল্ডিং, দেওয়ানহাটের দেওয়ান হোটেল ও পাঁচলাইশ এলাকার সালমা মঞ্জিলে বদর বাহিনীর ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র ছিল।

মীর কাসেমের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ডালিম হোটেলে নির্যাতিত অনেকেই। এই হোটেলে নির্যাতনের দুটি ঘটনায়ই ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর এই নেতার বিরুদ্ধে। ডালিম হোটেলের ভয়াবহ নৃশংসতার কথা বলতে গিয়ে এখনও শিউরে উঠেন মুক্তিযোদ্ধা লুতফর রহমান ফারুক, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সৈয়দ এমরান ও মৃদুল দেসহ আরও অনেকে।

ডালিম-হোটেল

যারা ভয়াবহ স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছেন কিন্তু অপেক্ষা করেছেন কবে এই নৃশংস মানুষে বিচারের মুখোমুখি হতে দেখবেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিন ১৬ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত তারা সেখানে বন্দি ছিলেন বলে জানিয়েছেন এখনও শরীরে সেই নির্যাতনের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো এই মুক্তিযোদ্ধারা।

মীর কাসেমের তখনকার অবস্থান জানিয়ে নির্যাতিতরা বলেন, তিনি হোটেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পাহারায় থাকা বদর সদস্যরা বলে উঠতেন ‘কাসেম সাব আ গ্যায়া, কমান্ডার সাব আ গ্যায়া’। বন্দিদের কাছ থেকে কোনও তথ্য না পেলে মীর কাসেমের নির্দেশে নির্যাতনের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যেত।

সাক্ষীরা এখনও কান্নায় ভেঙে পড়েন নির্যাতনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করলেই। তারা বলেন, শহরের কোথাও কোনও মুক্তিযোদ্ধা গোপনে আশ্রয় নিয়েছে খবর পেলেই মীর কাসেমের নেতৃত্বে বদর বাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের নিয়ে অভিযান চালিয়ে তাদের ধরে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসতো।

রায়ে বলা হয়, আটকে রাখা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে তাদের ওপর অত্যন্ত অমানুষিক উপায়ে নিয়মিতভাবে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হত এবং অভিযুক্ত মীর কাসেম আলী এই বর্বর ব্যবস্থাটিতে সম্পৃক্ত ছিলেন।

রায়ে আরও বলা হয়, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম, টুনটু সেন ও রঞ্জিতদাসকে হত্যাসহ এখানে (ডালিম হোটেলে) পরিচালিত সব ধরনের অপরাধেই তার (মীর কাসেম) প্রত্যক্ষ মদদ ও উৎসাহ ছিল।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.