শুধুমাত্র ধর্ম কি মানবিক মূল্যবোধ শেখায়? না। কিন্তু ধর্মও কি মানবিক মূল্যবোধ শেখায়? হ্যাঁ।
জঙ্গিবাদ যখন ধর্মের সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে কারো কারো মনে, – (সংগত ও অসংগত দুই কারণই আছে তার পেছনে; ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ যেমন অবশ্যই আছে, আবার ধর্ম ও জঙ্গিবাদকে এক করে দেখা মানুষ’ও আছে, যা সাধারণ ধার্মিকদের জন্য মনব্যথার কারণ) – তখন ধর্মের একটি সমালোচনা চলে আসে, ধর্ম তো স্বর্গের লোভ ও নরকের ভয় দেখিয়ে ধার্মিকদের ভালোমন্দ কাজ করাচ্ছে, নিঃস্বার্থ মানবিক মূল্যবোধ এখানে কোথায়?
আমি একজন মুসলিম, আর আমার ধার্মিক আলোচনায় ইসলামের নানা দিক’ই আসবে, কিন্তু ধর্মানুসারী মানুষেরা যে কোন ধর্মেরই হোক না কেন, মানবিক মূল্যবোধের উপস্থিতি আমি সবরকম মানুষেরই মাঝে দেখেছি, ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নেয়া ভালো দিকগুলো সব ধর্মেই বর্তমান। আমি এই পুরস্কার আর শাস্তির প্রভাব এই মূল্যবোধের নিরিখে একটু তবে দেখি: –
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র; – পুরস্কার ও শাস্তি সব স্থানেই মূল্যবোধ সৃষ্টির পেছনে জড়িয়ে থাকে। দুই ভাইবোন, ঝগড়া করতে করতে নাকমুখ ফাটিয়ে দিলো একে অপরের, বাবা মা কি করবে তখন? দুজনকে শাস্তি দেবে, আরেকবার যেন এমনটা না হয়। একই দুই ভাইবোনকে বলা হলো, তোমরা যদি খেলার পর সব খেলনা ঠিকমতো গুছিয়ে রাখো টানা এক সপ্তাহ, আমরা সবাই মিলে আইসক্রিম খেতে যাবো। যেন এই পুরস্কারের কারণে একটা সুন্দর অভ্যাস তৈরী হয়। দুই ক্ষেত্রেই যদি এই শাস্তি বা পুরস্কার না দিয়ে কেবল লেকচার দেয়া হয় – যেন কেন আঘাত করা ঠিক নয়, কেন খেলনা গুছিয়ে রাখা দরকার – সেটা বাচ্চাদের জন্য তেমন ফলপ্রসূ হবে না। কিন্তু যখন শাস্তির ভয়ে দুজনে মিলেমিশে থাকাটা শিখে যাবে, সেই থেকেই বন্ধুত্ব তৈরী হবে, তখন আর শাস্তির ভয়ে কিন্তু একে অপরকে মারবে না, তেমনটা হবে না, সেটা আর মাথাতেই আসবে না। যখন আইসক্রিমের প্রতি আর তেমন আগ্রহ থাকবে না, কিন্তু গুছিয়ে থাকার অভ্যাসটা তৈরী হয়ে যাবে, তখন সেটা জীবনের বাকি ক্ষেত্রে আপনাতেই আসবে, প্রত্যেক মুহূর্তে আর মূলা সামনে ঝুলতে হবে না।
স্কুলে বলা হলো, নকল করো না, যদি কেউ ধরা পড়ে নকল করা অবস্থায়, তাকে বহিষ্কার করা হবে। স্কুলে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সার্টিফিকেট বিতরণী আছে; ঠিকমতো লেখাপড়া করার পুরস্কার! – জীবনের সব ক্ষেত্রে নকল করার ক্ষেত্রে বহিস্কৃত হতে হয়না, কিন্তু বহিষ্কারের ভয়টা থেকে মৌলিক অর্জনের উপর যেন ফোকাসটা তৈরী হয়, নেপথ্যভাবনা তেমনই। ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ডে আদতে কি আসে যায়? কিন্তু এই সার্টিফিকেটের কারণে যখন লেখাপড়ার অভ্যাসটা তৈরী হয়ে যাবে, শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা তৈরী হবে, তখন সেটা মন থেকেই আসবে – জীবনের বাকি ক্ষেত্রে এই ‘ভালো করার’ মনোভাবটি কাজে দেবে।
অফিসের নিয়ম পালন না করলে চাকরি ‘নট’; ভালো করলে প্রমোশন; – শাস্তি এবং পুরস্কার। – এখন, কথা হলো, নেপথ্যভাবনা বুঝলাম, প্র্যাকটিক্যালি হয় সব ক্ষেত্রে? কোন কোন বাচ্চাকে মারতে মারতে পিঠের ছাল তুলে ফেলা হয়, কিন্তু বাবা মা আদর করে বুঝিয়ে বলেন না, ভুলটা কি আর ঠিকটা কি। কোন কোন বাচ্চার ক্ষেত্রে উল্টোটাও হয়, পুরস্কারে গড়াগড়ি, তাকে কষ্ট করে কোন কিছু অর্জন কখনোই করতে হয়না। স্কুল কলেজে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড অনেকেরই ক্ষতি করে, সেটা হতেই গিয়ে বরং এমন সুনিপুণ ভাবে নকল করে অনেকেই যে ধরাও পড়ে না। বা শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা তৈরী হয়না, মুখস্থবিদ্যার জোরে মার্ক্স্ তুলতে তুলতে আদতে কিছু শেখাই হয়না। অফিসেও পলিটিক্স হয়; ঘুষ দেয়া নেয়া হয়; অনেকে তার একটাও না করলেও কেবল মাত্র সংসার চালাতে বিরসমুখে অফিসে যান, কাজের জন্য ভালোবাসা তৈরী হয়নি।
কিন্তু এইবার একটু অন্য ছবি দেখি। দুই ভাইবোন, একে অপরের সাথে চমৎকার বন্ধুত্ব, নিজেরাও মানুষ হিসেবেও চমৎকার – পারিবারিক শিক্ষাটা পেয়েছে বলে। – শিক্ষার্থীর মাথায় নকলের ভাবনা আসেইনি কারণ স্কুল থেকে জেনেছে এই কাজটা ঠিক না; ফার্স্ট হতে চাইতে গিয়ে বইটা খুলে এমন মন দিয়ে পড়লো যে এখন সাবজেক্টটারই প্রেমে পড়ে গেলো, স্বপ্ন দেখতে থাকলো বড় হয়ে এই মাঠেই কাজ করবে সে, নিজ থেকেই বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন, ইউটিউব ভিডিও ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করলো, আরো জানার লোভে। ফার্স্ট হলো কি থার্ড হলো কিছু যায় আসে না, তার মনে এখন একটা সুন্দর স্বপ্ন ঢুকে গেছে; আর এই প্যাশনটার কারণেই তার চমৎকার রেজাল্ট করা এখন আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। – অফিসটার প্রেমে পড়ে গেছে নতুন চাকরি পাওয়া মেয়েটা। বাহ্, এখানে তো বস থেকে শুরু করে সহকর্মীরা সবাই চমৎকার; কাজ শেখারও অনেক সুযোগ; বেতনটাও সুবিধাজনক পাচ্ছি, – আচ্ছা, আমি কি করলে আরো বেটার হতে পারি? আমি কিভাবে বাকিদের সাহায্য করতে পারি, প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারি? এইভাবে ভাবতে আর কাজ করতে থাকে যে মেয়ে, একটি ‘ফেয়ার’ অফিস হলে সেখানে তার নিজের প্রমোশন কে ঠেকাবে?
এবার তাহলে ধর্মে ফিরে আসি। ধর্মও শেখায় শাস্তি, ধর্মও শেখায় পুরস্কার। কিন্তু ধর্ম কি শেখায় নিঃস্বার্থ মানবিক মূল্যবোধ? সেই প্রশ্নটির উত্তর একটু খুঁজি। – বিশ্বাসের তিন স্তর সম্পর্কে আমি নিজে শিখেছিলাম আমার কৈশোরের শেষপ্রান্তে, যা আমার ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। প্রথম স্তরের বিশ্বাসীরা চায় না তাদের নরকবাস হোক, সেই ভয় থেকে তারা কিছু কাজ করে আর কিছু করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু তাদের মন তো সংকুচিতই থাকে! তাদের থেকে পরের ধাপের বিশ্বাসীরা শ্রেয়; – যারা স্বর্গসুখের সান্নিধ্য খোঁজা থেকে ভালো করে, মন্দ থেকে বিরত থাকে। এদের দৃষ্টিভঙ্গি আরেকটু ইতিবাচক, মন আরেকটু প্রসারিত, যেহেতু এরা কিছু অর্জনের জন্য ছুটছে। কিন্তু শেষ স্তরের বিশ্বাসীরা সবচাইতে বেশি বিকশিত তাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বে। এদের মূলে থাকে ভালোবাসা – স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা। তাদের ভয়টা কেমন জানেন? তারা এমন কিছু করবে না যাতে স্রষ্টা (বা সৃষ্টি) কষ্ট পায়; আর তাদের অর্জনটা কিরকম জানেন? তারা সেটাই করবে, যাতে স্রষ্টার সন্তুষ্টি, যাতে করে আশপাশের সবার ভালো, যাতে করে সমাজের সেবা হয়। – আর এই ‘ফর্মুলা’ ফলো করলে এই পৃথিবীর মঙ্গল, আর পরকালেও পরম করুণাময়ের নৈকট্য লাভের স্বপ্নটা দেখি।
উপরের অংশটা আমি শিখেছিলাম পবিত্র কুর’আনের সূরা ইমরানের ১০২ আয়াত পড়ে: “আল্লাহকে তেমনভাবে ভয় করো যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত…”। এই ‘যেভাবে’টা কোন ভাবে? আর তারই ব্যাখ্যায় এই তিনস্তরের ব্যাপারটি আমার ভাবনার জগৎ ভীষণভাবে আন্দোলিত করেছিলো, আমি ঠিক করেছিলাম, আমার ইহজীবনে আমি শেষস্তরের বিশ্বাসী হওয়ার লক্ষ্যে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবো। – আমার নিজের মানবিক মূল্যবোধ কি কেবল ধর্ম থেকে আসে? না; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে চলার পথে কাছে পাওয়া মানুষগুলো, বই থেকে বিভিন্ন মিডিয়া, থেকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়েই আসে। কিন্তু ধর্ম থেকেও আসে, অনেকেরই আসে, এবং আসা সম্ভব আরো অনেক ধার্মিকদের মাঝেই, – যদি আমরা সবাই একটু সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হই, শিখতে ও শেখাতে আগ্রহী হই। যদি একে অপরের উপর বিশ্বাস রাখতে শিখি, যে সবরকম মানুষই আছে, যার মধ্যে ধার্মিকরাও আছে: ভালো ও মন্দ, মানবিক ও রবোটিক, মন-প্রসারিত এবং মন-বন্ধ। আর একে অপরের মধ্যে ভালোটা বের করে আনতেও আমরাই পারি, – পারি না বলুন? ![]()





