শেখ আদনান ফাহাদ । বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬
সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছিল ভারত এবং পাকিস্তানের। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের শক্তিতে। ভারত এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতা সশস্ত্র কোন যুদ্ধের মধ্য দিয়েও আসেনি। নেতাজী সুভাষ বোস ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক শক্তির অসহযোগিতায় তা আর সম্ভব হয়নি। সব নিয়ে, খেয়ে ব্রিটিশরা একপ্রকার ক্লান্ত হয়ে স্বাধীনতা তাদেরকে ভিক্ষা দিয়েছিলেন।
কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা আমরা অর্জন করে নিয়েছি। ভারত এবং পাকিস্তানের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে। তাছাড়া দুটো রাষ্ট্রেই ভয়াবহ মাত্রার বর্ণবাদ, জাত-পাতের সমস্যা রয়েছে। ভারতে গরুর মাংস খাওয়া বা ফ্রিজে রাখলেও বজরঙ্গি ভাইজানেরা মুসলিমদের হত্যা করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেনা। এই দুইদেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। আমাদের অধিকাংশ মানুষ এখন পর্যন্ত অনেক বেশি মানবিক ও নরম মনের শান্তিপ্রিয় মানুষ। কিন্তু আমরা যে একদিন ভারত-পাকিস্তানের মত সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত হব না, তার নিশ্চয়তা এখন আর আমরা দিতে পারছিনা।
সমাজে প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে এমন সব ঘটনা ঘটছে যা আমাদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রকে প্রতিভাত করেনা। বরং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের মনোজগতে এবং আচরণে এমন সব প্রক্রিয়া চলমান আছে যা আমাদের ভবিষ্যতে চরম সঙ্কটের আভাস দেয়। বিশেষ করে শিক্ষিত (?), সচেতন (?) সমাজে সাম্প্রদায়িক বিচার-বিবেচনা প্রসূত কর্মকাণ্ড বেড়ে চলেছে। আমাদের গ্রাম সমাজ তথা কৃষক সমাজ বরং শিক্ষিত সমাজের তুলনায় অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক। এরা আমাদের মত প্রতিটি কাজে নিজেকে হিন্দু বা মুসলিম মনে করেনা। হিন্দু-মুসলিম হিসেবে কৃষক সমাজের কোন বিভেদ নাই।
৭১ এ পরাজিত শক্তি জামাত ইসলামির কোন গ্রহণযোগ্যতা বা সমর্থন কৃষক সমাজে নেই। কিন্তু দেখেন, শিক্ষিত মুসলিমদের একটা অংশ এখানে জামাতের ক্যাডার-বাহিনী। ইসলামের নাম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক শক্তি জামাত এদেশে হাসপাতাল, ব্যাংক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালায়। এই তথাকথিত শিক্ষিত মুসলিমদের একটা অংশই গুলশানে, শোলাকিয়া কিংবা কল্যাণপুরে সিআইএ এবং মোসাদের ব্রেইনচাইল্ড আইএসের ব্যানারে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে বিদেশি মেহমান এবং আমাদের পুলিশ ভাইদের হত্যা করেছে।
অন্যদিকে দেখুন, বাংলাদেশের শিক্ষিত হিন্দু সমাজ, মুসলিমদের বাদ দিয়ে শিক্ষিত বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টানদের নিয়ে হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ গড়ে তুলেছে। হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের ‘সনাতন বিদ্যার্থী পরিষদ’ নামে নিজস্ব সংগঠন আছে। ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা হল/হোস্টেল রয়েছে। (এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে হল নির্মাণে হিন্দু/মুসলিম পরিচয়কে আমলে নেয়া হয়নি। ব্রিটিশ এবং হিন্দু-মুসলিম এলিট শ্রেণী মিলে যে সাম্প্রাদায়িক সমাজব্যবস্থা এখানে তৈরি করে গেছে তার শব জাবি পরিবার টেনে নিয়ে আসেনি বা টেনে নিয়ে যাচ্ছেনা)। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় যদি হিন্দু-মুসলমানের পরিচয় ভুলে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা না যায় তাহলে আর কী করার থাকে! হিন্দু বাড়িতে কোন মুসলিম পরিবার বা কাউকে ঘর ভাড়া দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে দিন দিন কমে আসছে।
আওয়ামীলীগের হিন্দু আর বিএনপির হিন্দুর মধ্যে কোন যোগাযোগ ঘাটতি নেই। চাকরি বা প্রমোশন দেয়ার ক্ষেত্রে পর্যন্ত ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়। আবার টুপি, দাড়িওয়ালা মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী বা যুদ্ধাপরাধীকে দেখে একই পোষাক বা লেবাসধারী বিশাল সংখ্যক মানুষকে শহরের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা প্রভাবশালী অংশ ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘পশ্চাদপদ’ এমনকি জামাত বলে তকমা পড়িয়ে দিচ্ছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের আরেকদল আছেন যাদের মন, মগজ, ব্যাংক ব্যালেন্স, জায়গা জমি সবই ঠাই নিয়েছে ভারতে। বিশেষ করে ঢাকার শিক্ষিত হিন্দু সমাজের কারো কারো ভারত-প্রেম অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদোহিতার রুপ নিচ্ছে।
অন্যদিকে মুসলমানদের একটা অংশে পাকিস্তান প্রত্যয় এখনো বেশ শক্ত। না হলে ঢাকার স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হলে পাকিস্তানের এত সমর্থক আসে কোত্থেকে? ৭১ এ মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মীর কাসেমের ফাঁসিতে যারা এদেশে নাখোশ হয়েছেন তাঁরাও শিক্ষিত মুসলিম! পাকিস্তানের পতাকা পর্যন্ত এদেশের তরুণ-তরুণীরা গালে আঁকিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের এক হিন্দু অভিনেত্রী তো স্টেডিয়ামে ভারতের পতাকা হাতে উল্লাস করতে করতে আরেকটু হলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।
আমাদের ঢাকার এক নামি আইনজীবী কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের হিন্দুদের বাঁচাতে ভারতীয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন বলে বিতর্ক হতে দেখেছি। আমার মতে এই শিক্ষিত হিন্দু-মুসলিমদের যে অংশটি উপরে বর্ণিত অপকর্মের বা অপপ্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তারাই এদেশের উন্নয়নের প্রধান বাঁধা। এরা আমাদের এক বিন্দুতে এসে মিলতে দেয়না। এসব পাকিস্তানী/ভারতীয় দালাল, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী।
এইসব সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বাইরে যে বিশাল সংখ্যক মানুষ এদেশে বসবাস করছে এরাই এদেশের প্রধান ধারা। এদেরকেই ধারন করে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সমাজে শক্তিশালী করতে পারলে সোনার বাংলা গড়া খুব বেশি কঠিন হবেনা।
***খোলা কলামে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং সিটিজিবার্তা২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।







