খেলাডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
শুক্রবার, ১৭ জুন ২০১৬
ইউরো চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালটা হয়ে পড়েছিল ‘মাদ্রিদ ডার্বি’। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইটা হয়েছে একই শহরের দুই দল রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের মধ্যে। ২০১৪ সালের ফাইনালেও ছিল এই দুই দল। আর সেভিয়া তো ইউরোপাটা নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে। ইউরোপের দ্বিতীয় মর্যাদার এই টুর্নামেন্টে টানা তিনবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। অর্থাৎ ইউরোপ মাতোয়ারা এখন স্প্যানিশ ফুটবলের সুবাসে। তবে এবারের ইউরো কাপে সেই স্পেনের লা লিগায় খেলা ফুটবলার মাত্র ৩৫ জন! এমনকি ইউরোয় লা লিগার চেয়ে বেশি ফুটবলার আছে তুর্কি সুপার লিগের। তা হলেই বুঝুন তুরস্কের টাকা কেমন টানছে বিদেশি তারকাদের।
ইংলিশদের জয়জয়কার
পেট্রো-ডলারের ঝনঝনানিতে অবশ্য ইংল্যান্ড পেছনে ফেলেছে সবাইকে। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা এশিয়ান ধনকুবেররা একের পর এক কিনছেন ইংলিশ ক্লাব। টাকার বস্তা নিয়ে তাঁরা কিনছেন নামি বিদেশি খেলোয়াড়দের। তাই ইউরোয় সবচেয়ে বেশি ১০৬ জন ফুটবলার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের। এমনকি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সারির টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ৩১ জন আছেন এবারের আসরে। এই সংখ্যাটা বেশি ফ্রান্সের জমজমাট লিগা ওয়ানের চেয়েও। লিগা ওয়ানের কেবল ২৩ জনই আছেন ইউরোয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৬ জন জার্মান বুন্দেসলিগার। ইতালিয়ান সিরি ‘এ’র ৪৯ আর তুরস্কের সুপার লিগের ৩৬ জন। ৩৫ জন নিয়ে তালিকার পাঁচ নম্বরে লা লিগা। তবে সংখ্যার চেয়ে মানটা বড় সব সময়ই। গত ইউরোয় লা লিগার ছিল মাত্র ৩১ জন। আর শিরোপা জিতে বার্সেলোনার বেশির ভাগ ফুটবলার নিয়ে খেলা স্পেন।
বয়স্ক দল
২০১০ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন স্পেন মোটামুটি একই দল নিয়ে আসে পরের আসরেও। কিন্তু ‘বুড়িয়ে’ যাওয়ায় ডেভিড ভিয়া, ফার্নান্দো তরেস, জাভি হার্নান্দেজদের সেই ছন্দ ছিল না আর। তাই স্পেন ২০১৪ বিশ্বকাপে বাদ পড়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের ইউরোয় তারুণ্যনির্ভর দল স্পেনের। এবারের আসরে দলের গড় বয়স মাত্র ২৮.৯ বছর, যা বেশি বয়সীদের তালিকার ৯ নম্বরে। ২৯.৩৯ বছর গড় বয়স ‘বুড়োদের’ দলের উপাধিটা রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের। ৩০ বছরের বেশি বয়সী ১১ জন ফুটবলার আছে তাদের। চেক প্রজাতন্ত্র আর স্লোভাকিয়ারও ৩০ বছরের বেশি ফুটবলার ১১ জন।
কম-বয়সী দল
সবচেয়ে কম বয়সী দুই দল ইংল্যান্ড ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। বিশ্বকাপের দল অনেকটাই বদলে ইউরোয় এসেছে জার্মানরা। তাদের গড় বয়স ২৫.৪৩। আর ২৫.৩৯ গড় বছর নিয়ে সবচেয়ে কম বয়সী দল ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড ও জার্মানি দুই দলেই ২১ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড় তিনজন করে।
কম-বয়সী টিনেজ রাশফোর্ড
এবারের ইউরোয় খেলছেন ১৮ বছরের তিন ফুটবলার। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়স ইংল্যান্ডের মার্কাস রাশফোর্ডের। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ফরোয়ার্ডের জন্ম ১৯৯৭ সালের ৩১ অক্টোবর। ১৮ বছরের অপর দুই খেলোয়াড় পর্তুগালের মিডফিল্ডার রেনাতো সানচেস ও তুরস্কের ফরোয়ার্ড এমরি মোর। সবচেয়ে কম বয়সে ইউরোয় খেলার রেকর্ডটা অবশ্য জেত্রো উইলেমসের। গত আসরে ডেনমার্কের বিপক্ষে মাত্র ১৮ বছর ৭১ দিনে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। এই লেফটব্যাকের দল নেদারল্যান্ডস সুযোগই পায়নি এবারের আসরে। ফ্রান্সে ২১ বছরের কম সবচেয়ে বেশি চারজন খেলোয়াড় অবশ্য সুইজারল্যান্ডের। তাঁদের তিনজনই আবার টিনএজার। এছাড়া একজন করে টিনএজার আছে পর্তুগাল, ইউক্রেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া ও ইংল্যান্ডের।
বুড়ো-বয়সীদের ভেল্কি
ইউরোয় এত দিন সবচেয়ে বেশি বয়সী হিসেবে খেলার রেকর্ডটা ছিল জার্মানির লোথার ম্যাথিয়াসের। তবে ৪০ বছর বয়সী দুই ফুটবলার খেলছেন এবারের ইউরোয়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের দিন হাঙ্গেরির গোলরক্ষক গ্যাবর কিরাইয়ের বয়স ছিল ৪০ বছর ২ মাস ১৪ দিন। ১৯৭৬ সালের ১ এপ্রিল জন্ম নেওয়া কিরালির পরিচিতি ‘পাজামাম্যান’ হিসেবে। কেননা এই গোলরক্ষক পুরো ক্যারিয়ার পার করে দিয়েছেন ট্রাকস্যুট পরে খেলে। ক্রিস্টাল প্যালেস, বার্নলি, ফুলহামের মতো দলের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন তিনি। হার্থা বার্লিন, বেয়ার লেভারকুসেন, ১৮৬০ মিউনিখের হয়ে খেলেছেন বুন্দেসলিগা। জাতীয় দলের হয়ে ১০০-র বেশি ম্যাচ খেলা এই গোলরক্ষক তাঁর ট্র্যাকস্যুট পরা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি মডেল নই। যে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য সেটা পরে খেলি। হাফপ্যান্টের চেয় ট্র্যাকস্যুটেই বেশি স্বচ্ছন্দ আমি।’
রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের গোলরক্ষক শাই গিভেনের জন্ম ১৯৭৬ সালের ২০ এপ্রিল। অর্থাৎ কিরাইয়ের চেয়ে ১৯ দিনের ছোট তিনি। আরেক গোলরক্ষক ইতালির জিয়ানলুইজি বুফনের জন্ম ১৯৭৮ সালের ২৮ জানুয়ারি। গোলরক্ষক বাদে আউটফিল্ডের খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বয়সী পর্তুগালের ডিফেন্ডার রিকার্দো কারভালহো। ৩৮ বছর পার করা এই ডিফেন্ডার দুই বছর আগেও খেলেছেন রিয়াল মাদ্রিদের মতো দলে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চীনের প্রাচীরই গড়েছিলেন চেলসিতে। ইউরোয় ৩৮ বছর ২৫৭ দিনে গোলের রেকর্ডটা এখনো অস্ট্রিয়ার ইভিকা ভাসতিচের। ২০০৮ সালের আসরে পোল্যান্ডের জালে বল জড়িয়েছিলেন তিনি। হাঙ্গেরি আর রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের দুই গোলরক্ষকের কেউ গোল না করলে রেকর্ডটা অক্ষুণ্নই থাকবে এবার।
লম্বা-খাটো
ইউরোপিয়ানরা এমনিতেই লম্বা। তবে উচ্চতায় সবাইকে ছাপিয়ে রোমানিয়ান গোলরক্ষক কস্তেল প্যান্তিমিলিয়ন। তাঁর উচ্চতা ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি বা ২.০৩ মিটার। কস্তেল শুধু ইউরোর নন, সবচেয়ে লম্বা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেরও। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। জো হার্টের ব্যাকআপ হলেও ২০১৩-১৪ মৌসুমে ইংলিশ লিগ কাপে সিটির একাদশে নিয়মিতই ছিলেন তিনি। সেবার জিতেছিলেন লিগ কাপের শিরোপাও। এরপর সান্ডারল্যান্ড হয়ে তিনি এখন ওয়াটফোর্ডের। এবারের ইউরোয় সবচেয়ে লম্বা চার খেলোয়াড়ের সবাই অবশ্য গোলরক্ষক। ইংল্যান্ডের ফ্রেজার ফোর্স্টার ও ক্রোয়েশিয়ান গোলরক্ষক লোরে কালিনিচের উচ্চতা সমান ২.০১ মিটার। ২.০০ মিটার উচ্চতা নিয়ে তালিকার চার নম্বরে সুইডেনের গোলরক্ষক আন্দ্রেস ইসাকসন।
‘বামনদের’ মধ্যে সবাইকে পেছনে ফেলেছেন ইতালিয়ান লরেঞ্জো ইনসিগনে। ২৫ বছর বয়সী এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি বা ১.৬৩ মিটার। নাপোলির এই খেলোয়াড় ইউরোর আগে জাতীয় দলের হয়ে ৯ ম্যাচে করেছিলেন দুই গোল। এছাড়া নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের মিডফিল্ডার জ্যামি ওয়ার্ড ১.৬৫ আর স্পেনের ফরোয়ার্ড পেদ্রো রোদ্রিগেসের উচ্চতা ১.৬৭ মিটার। দলীয় উচ্চতায় সবাইকে ছাড়িয়ে সুইডেন। তাদের গড় উচ্চতা ১.৮৬ মিটার। এরপর ১.৮৫ মিটার নিয়ে আছে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, জার্মানি, হাঙ্গেরি ও আইসল্যান্ড।
গোলের-রেকর্ড
গোল মেশিন হয়ে উঠেছেন ত্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগেও করেছেন সবচেয়ে বেশি ১৬ গোল। তাঁর সামনে সুযোগ আছে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোর চার আসরে গোল করার। মিশেল প্লাতিনির চেষ্টাতেই প্রথমবারে মতো এবারের ইউরোয় খেলছে ২৪ দল। নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই প্লাতিনিই নেই এবারের ইউরোয়। তাঁর নিজের দেশে ইউরোর সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ডটাও ভাঙতে দেখতে পারেন প্লাতিনি। রোনালদো ও জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের গোল সমান ৬টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭ গোল আছে ইংল্যান্ডের অ্যালান শিয়েরারের।রোনালদো আর ইব্রাহিমোভিচ যে ছন্দে আছেন তাতে প্লাতিনি-শিয়েরারের পেছনে পড়াটা সময়ের অপেক্ষা হয়তো।
ফিফা-র্যাংকিং
ইউরো শেষে ফিফা র্যাংকিংয়ে রদবদল হবে বড়সড়। তবে শুরুর আগে সবচেয়ে বড় লাফটা দিয়েছে অস্ট্রিয়া। ২০০৮ ইউরোয় তাদের র্যাংকিং ছিল ১০৫, যা অস্ট্রিয়ার ইতিহাসের সর্বনিম্ন। সেখান থেকে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়ানো। ২০১২ সালে ৭০ আর ২০১৪ সালে অস্ট্রিয়া উঠে আসে সেরা ২০-এ। এবারের বাছাই পর্বে কোনো ম্যাচ না হারায় ১০ নম্বরে থেকে ফ্রান্সে এসেছে তারা। বাছাই পর্বে কোনো ম্যাচ হারেনি ইংল্যান্ডও, তারা র্যাংকিংয়ে আছে ১১ নম্বরে। বাছাই পর্বে কোনো ম্যাচ না হেরে ইউরো খেলেছে মোট ৬ দল। তাদের মধ্যে কেবল স্পেন শিরোপা জিতেছিল ২০১২ সালে।
তথ্য সূত্র – ইন্টারনেট ও কালের কন্ঠ





