মঙ্গলবার,০১ আগস্ট ২০১৭
বেদনার সাথে আমার নিরবচ্ছিন্ন বসবাস । মানুষের দেশপ্রেম দেখলে কিম্বা মানুষের জন্য মানুষের মমতার চমৎকারিত্ব দেখলে হৃদয়টা কেমন যেন দ্রবীভূত হয়ে যায় । আবেগের আতিশয্যে কণ্ঠ বাষ্পরূদ্ধ হয়ে পড়ে। চোখের চারপাশ ভিজে যায় । চলচিত্র বা গল্প উপন্যাসের মানুষের জীবনের বেদনা বাস্তবের আমাকে দুর্বল করে দেয় । বয়স অনেক হলো সেই দুর্বলতা কাটানো গেল না।
দু হাজার এক সালের সরকার আমাকে দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তর দন্ড দিয়েছিলো। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথমে মহেশখালী পরে কুতুবদিয়া আমার পদায়ন হয়। দ্বীপের মানুষ নিয়ে যে যাই বলুক আমি তাদের সহজ সরল মানবিক সত্তাকে আবিষ্কার করেছি। মহেশখালীর স্বল্পকালীন অবস্থানে কিম্বা কুতুবদিয়ার দীর্ঘ সময়ে আমি দেখেছি মানুষ কতটা প্রেমময় হতে পারে । ওঁরা যতটা ভালবাসা আমাকে দিয়েছিল তার যোগ্য আমি ছিলাম না । মহেশখালীতে সন্ধ্যায় আমার বিদায় অনুষ্ঠান হয় । ঘাটে একটি স্পীডবোর্ড রেখে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম । ইচ্ছা ছিল রাতেই দ্বীপ ছেড়ে যাব।
অনুষ্ঠান শেষে যখন ঘাটের দিকে যাব বেশ কজন অফিসার আমাকে বললেন, এমপি সাহেবের সাথে আপনার বনিবনা হয়নি । কাল সকালে এমপি বা তার লোকজন ছড়িয়ে দেবে, ইউএনও সাব রাতের বেলা পালিয়ে গেছে । কথাটা আমার মনে ধরল। কিন্তু আমার করার কিছু ছিল না । খাট বিছানা পাঠিয়ে দিয়েছি। আমাকে যেতে হবে । কথাটা শুনে আধঘণ্টার মধ্যে নিজের বিছানা পালঙ্ক এনে জুড়ে দিলেন । সকালে অফিসারদের বাসা থেকে পাঠানো নাস্তা খেয়ে উঠোনে বেরিয়ে দেখি, লোকে লোকারণ্য। সবার শুভকামনা নিয়ে গাড়ীতে উঠতে যাব উপস্থিত জনতা বললেন তাঁরাও ঘাটে যাবেন। অগত্যা আমিও পায়ে হেঁটে ঘাটের দিকে যাত্রা শুরু করলাম । একটি মিছিল তার অগ্রভাগে আমি । পথে পথে মিছিলটি দীর্ঘ হয় । ঘাটে বিদায় নেবার কালে বয়স্ক মানুষগুলোর কান্না কাটি আমার ভেতরের আমিকে চুরমার করে দেয় । আমি বেদনার স্রোতে ভেসে যাই।
কুতুবদিয়ার বত্রিশ মাসের বড় জীবন শেষ করে ফেরার কালে কুতুবদিয়াবাসী আমাকে নাগরিক বিদায় সভার মাধ্যমে বিদায় জানায়। শেষ পর্বে ছিল সঙ্গীতানুষ্ঠান । শিল্পকলা একাডেমীর দুটি শিশু কান্নার জন্য গান শেষ না করে মঞ্চ ত্যাগ করে। সেদিনের সেই শিশু দুটি আজ অনেক বড় হয়ে গেছে । একজন আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। কিন্তু সেই বিদায় সভায় কান্নার গমকে গান থামিয়ে দেয়ার দৃশ্যটি মনে এলে আজো আমার চোখ বেদনার জলে ভাসে। মানুষের ভালবাসার ঋণ শোধের সাধ্য আমার নেই ।
অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা দিয়েছেন যারে
বক্ষে তার বেদনা অপার—।
জামাল উদ্দীন আহমমেদ
মহাপরিচালক,মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।



