মাসিক টাকা দিয়ে গ্রেফতার এড়াচ্ছে নাশকতা মামলার আসামিরা

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানা

সাইরুলের পথেই হাঁটছে শাহজাহান

নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট ২০১৬

পুলিশ

চট্টগ্রামঃ পরোয়ানা থাকার পরও চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানা পুলিশকে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছে নাশকতা মামলার আসামি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। পুলিশের খাতায় পলাতক থাকলেও এরা দিব্যি নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করছে। আর এ জন্য থানা পুলিশকে প্রতি মাসে দিচ্ছে পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। পুরো বিষয়টির পেছনে রয়েছেন চান্দগাঁও থানার নতুন ওসি এসএএম শাহজাহান কবির। তার সঙ্গে আছেন একই থানার ওসি (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম।

শুধু তাই নয় সন্ত্রাসীদের হাতে হামলা-নির্যাতনের শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করতে গেলে ভয় দেখিয়ে তাদেরকে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করেন ওসি শাহজাহান কবির। বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে নিয়ে নেন মোটা অংকের টাকা। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহজাহান কবির।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে চট্টগ্রামে ব্যাপক নাশকতার ঘটনা ঘটে। সিএমপির ষোলটি থানার মধ্যে অপেক্ষাকৃত চান্দগাঁও থানা এলাকায় বেশি নাশকতা হয়। জ্বালাও-পোড়াও ভাংচুরের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এসব ঘটনায় ১৬টি মামলা দায়ের করা হয় চান্দগাঁও থানায়। মামলায় প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করা হয়। এরই মধ্যে ১২টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চার্জশিটভুক্ত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ এখনও গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছে। প্রকাশ্যে ঘুরলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। নগর ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক মোশাররফ হোসেন ১১ মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।

ছাত্রদলের আরেক ক্যাডার নওশাদ ওরফে নসু। সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে সে চান্দগাঁও এলাকায় ককটেল হামলা চালিয়ে হত্যা করে রিদোয়ান নামের এক ব্যক্তিকে। এই নসুও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এইট মার্ডার মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি পলাতক শিবির ক্যাডার হাবিব খানের সহযোগী হল ওসমান।

নাশকতা মামলার আসামি ওসমানও জেলের বাইরে। তাকে দেখা যায় ফরিদার পাড়া এলাকায়। ২০১২ সালে পুলিশের সহকারী কমিশনার আবদুল মান্নানসহ তার ফোর্সের ওপর হামলা করে শিবির ক্যাডার এনামুল হাসানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। মুরাদপুরে সংঘটিত এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় ১১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ।

এ মামলার ৯ নম্বর আসামি এনামুল হাসান। চান্দগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও দুটি নাশকতার মামলা। এর আগে চান্দগাঁও থানার ওসি সাইরুল ইসলাম তাকে আটক করলেও মোটা অংকের বিনিময়ে থানা থেকেই ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ আছে।

চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার ১২ নম্বর রোডের বাসিন্দা এনামুল হাসানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও দিব্যি সে এলাকায় ঘুরে বেড়ায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ। নাশকতা মামলায় গ্রেফতার এড়ানো এ আসামি পরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজায় প্যারেড মাঠে উপস্থিত হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এত কিছুর পরও গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছে এ আসামি।

কেবল এরাই নয়, চান্দগাঁও থানার বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ে ছাত্রদল ও জামায়াত-শিবিরের একাধিক নেতা নাশকতা মামলার এজাহারভুক্ত ও চার্জশিটভুক্ত আসামি। এরই মধ্যে ১২ মামলার চার্জশিট দেয়া হলেও সাবেক মন্ত্রী মোরশেদ খানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এনামুল হকসহ অনেকের নাম বাদ দেয়া হয়েছে চার্জশিট থেকে। চার্জশিট দেয়া পর্যন্ত কোনো কোনো আসামি আদালত থেকে জামিন নিলেও চার্জশিট দেয়ার পর পুনরায় জামিন নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ১২ মামলায় অন্তত ২০০ আসামি রয়েছে- যাদের অধিকাংশই গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র অভিযোগ করছে, মূলত এসব আসামি চান্দগাঁও থানার ওসি শাহজাহান কবিরকে বিভিন্ন মাধ্যমে মাসোয়ারা দিয়েই গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হচ্ছে। সর্বনিু পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে আসামিরা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের কেউ কেউ পুনরায় একই ধরনের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া চান্দগাঁও থানা এলাকায় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত অন্তত ২০০ মেস রয়েছে। বিভিন্ন মসজিদকে কেন্দ্র করে চলছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সদস্যদের অপতৎপরতা। থানা পুলিশ রহস্যজনক কারণে এসব মেসে অভিযান চালায় না।

চান্দগাঁও আবাসিক বি-ব্লক জামে মসজিদ, খতিববাড়ি জামে মসজিদ ও বাসটার্মিনাল জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে সক্রিয় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সদস্যরা। বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ করেই এসব মসজিদে নামাজের পর ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় জঙ্গি এই সংগঠনের সদস্যরা। এ ব্যাপারে থানাকে অবহিত করা হলেও ঘটনাস্থলে যেতে গড়িমসি দেখায় পুলিশ।

জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার ওসি শাহজাহান কবির রোববার যুগান্তরকে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। ১২টি মামলায় অন্তত দুইশ’রও বেশি আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে জামিনে বের হয়ে যায় তারা।

নাশকতা মামলার ৮-১০ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা পেন্ডিং আছে দাবি করে তিনি বলেন, এদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। কিন্তু আসামিরা বারবার স্থান বদলের কারণে তাদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না।

জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত মেসে অভিযান পরিচালনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিএমপি জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত মেসের তালিকা নিয়ে ব্লক রেইড করছে। তারাও মেসের তালিকা করেছেন। নির্দেশনা পেলে অবশ্যই ব্লক রেইড পরিচালনা করা হবে। তার থানা এলাকায় কয়েকজন হিজবুত নেতা থাকলেও তারা গ্রেফতার হয়েছে।

সূত্র জানায়, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য, নাশকতা মামলার আসামিদের গ্রেফতার না করা, আটকের পর ছেড়ে দেয়া, সাধারণ মানুষকে হয়রানিসহ নানা অভিযোগ ওঠায় এর আগে চান্দগাঁও থানার ওসি সাইরুল ইসলামকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। এরপর যোগ দেয়া নতুন ওসি শাহজাহান কবিরও সেই সাইরুল ইসলামের পথে হাঁটছেন। এ কারণে থানার সার্বিক আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। তথ্যসূত্র যুগান্তর

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.