“উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জলাবদ্ধতা সংকট রাতারাতি নিরসন সম্ভব নয়”
আমার কাছে আলাদীনের চেরাগ নেই: আ জ ম নাছির উদ্দীন
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আলহাজ্ব আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছেন, ‘আমার কাছে আলাদীনের চেরাগ নেই যে চাইলেই রাতারাতি স্থায়ীভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জলবদ্ধতার সংকট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারবো। সমস্যা নিরসনের আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি শুধু নয়, চট্টগ্রামকে বিশ্বমানের সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলবো বলেও তিনি দাবি করেন।
সোমবার (১৩ জুন) বিকেলে ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে নগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পর এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এসব কথা বলেন।
নগরীতে গত মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয় এ বৃষ্টিপাত। রবিবার রাত থেকে থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে। সোমবার ভোর সকাল থেকে শুরু হয় টানা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় নগরীর নিচু এলাকার সড়ক, বাই-লেইন হাটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে।
নগরীর অধিকাংশ খাল, নালা নর্দমা ভরাট ও বেদখল হয়ে যাবার কারণে অতিবৃষ্টিতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনে বিঘ্ন ঘটায় জলাবদ্ধতা এখন নগরবাসীর নিত্য দুর্ভোগের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বৃহত্তর বাকলিয়া এলাকা, সিডিএ এভিন্যুর ষোলশহর ২ নং গেইট থেকে মুরাদপুরের মধ্যবর্তী এলাকা, চান্দগাঁও বি-ব্লক, চকবাজার, শুলকবহর, নগরীর প্রধান ভোজ্যপণ্যে বাজার এলাকা খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, বানিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের সরকারি কমার্স কলেজ, হোটেল আগ্রাবাদ, হালিশহর মোগলটুলি, পাথারঘাটা এলাকার বিভিন্ন সড়ক হাঁটু পানিতে ডুবে গেছে।
যার ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন বন্দর নগরীর কর্মব্যস্ত মানুষ থেকে শুরু করে সর্বসাধারণ।
নগরীতে বর্ষা মৌসুমের আগে এ জন-দুর্ভোগের কারণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও মাটি উত্তোলন ও নালা-নর্দমা সংস্কারের নামে দু’বছরে ২০ কোটি টাকা খরচ করেছে চসিক কতৃপক্ষ। কিন্তু এরপরও নগরবাসী জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি পায়নি।
নগরীর দুর্ভোগ বিষয়ে জানতে চসিক কার্যালয়ে মেয়র বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি ১১ মাস হলো। জলাবদ্ধতা হচ্ছে এ নগরীর পুরোনো সমস্যা। উত্তরাধিকার সূত্রে এটি আমি পেয়েছি। আমার হাতে আলাদীনের চেরাগ নেই যে চাইলেই রাতারাতি স্থায়ীভাবে জলবদ্ধতা সংকট থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারবো। তবে আশার কথা হচ্ছে, অন্যান্যবারের মতো এবার জলাবদ্ধতা হচ্ছে না। কারণ আমরা প্রতিদিনই খাল ও নালা খনন করছি।
তিনি বলেন, একাধিক কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমাদের নালা-নর্দমাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়নি। ড্রেনেজ সিস্টেম নেই বললেই চলে। আমরা নিয়মিত নালা পরিষ্কার করছি। কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। ফলে আগে পানি নিষ্কাশনে যেভাবে বাধা পেত এখন তা নেই। কিছু কিছু এলাকায় সারা রাত আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কাজ করছে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা যায় আবার বর্জ্য ফেলে নালা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। তাই নগরবাসীর সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করেছি আমরা।
চট্টগ্রামকে ব্যতিক্রম শহর উল্লেখ করে মেয়র বলেন, এ নগরী হচ্ছে সারা দেশে ব্যতিক্রম। পাহাড়-নদী-সাগর-অরণ্যে সমৃদ্ধ এমন নগরী দেশে দ্বিতীয়টি নেই। এখানে নির্বিচারে বৈধ-অবৈধভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে এখন সব পাহাড় ন্যাড়া। বাতাসের সাথে ধূলিবালি উড়ছে। বড় একটি অংশ সিলট্রেশন হচ্ছে। আপনারা দেখবেন বৃষ্টিপাত বন্ধ হলে সড়কের ওপর বালির আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে। এটি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্যে বড় সমস্যা। জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছি।
পরিকল্পনা বিষয়ে মেয়র বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে অনুরোধ করেছি মদুনাঘাট থেকে পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও ২৬টি খালের মুখে রেগুলেটরসহ স্লুইসগেট নির্মাণ করতে। সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ আমরা তিনজন সরেজমিন এলাকাটি পরিদর্শন করেছি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ডিপিপির খসড়া করেছে। আমাকে প্রেজেন্টেশন দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে নদীপাড়ের বড় একটি অংশ বন্দর ও নৌবাহিনীর সংরক্ষিত এলাকা। এ দুই কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নগরীর কিছু এলাকা আছে অমাবস্যা-পূর্ণিমার ভরা জোয়ারের সময় প্লাবিত হয়। কয়েকদিন আগে বলীরহাটে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি অবস্থা। জোয়ারেই প্লাবিত হচ্ছে বড় একটি এলাকা। দীর্ঘস্থায়ী সমাধান ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশনের যা আর্থিক অবস্থা তাতে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাহায্য চেয়েছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। আশাকরি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে এ বছর মেগা প্রকল্পটি পাস হবে।
তিনি বলেন, আমি আশাবাদী। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি শুধু নয়, চট্টগ্রামকে বিশ্বমানের সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলবো।
বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ওয়াসা একটি স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান করছে। আমরা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও ২৬টি খালের একটি ডিপিপি তৈরি করছি। একই সঙ্গে সিলট্রেশন থেকে খাল-নালা রক্ষার জন্যে পাহাড়ের ক্ষয়রোধ করতে হবে। প্রতি বর্ষায় পাহাড় ধসে অনেক সম্পদ ও প্রাণহানি ঘটে। পাহাড়ের পাদদেশে গাইডওয়াল নির্মাণ করতে হবে। গ্রাফটিং করতে হবে যাতে পাহাড়ের ক্ষয় রোধ করা যায়। নিয়মিত খাল খনন করা অনেক ব্যয় সাপেক্ষ। তাই জাইকাকে গাইডওয়াল নির্মাণে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছি।
বিভিন্ন পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন, নকশা ইত্যাদি দেখভাল করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। যদি অননুমোদিত কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠে তাহলে আমি দাবি জানাবো জরুরি ভিত্তিতে যেন ভেঙে ফেলা হয়।
এদিকে চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা শেখ হারুনর রশিদ সিটিজিবার্তা কে বলেন, ‘বর্ষার শুরুতেই মৌসুমী বায়ু প্রবেশ করতে পারে, বায়ু চাপের তারতম্যের কারণে সাগরের সঞ্চালনশীল মেঘমালায় সৃষ্টি হয়েছে। ওই সঞ্চালনশীল মেঘমালার কারণে সাগরে ঝড়ো হাওয়া বইছে। আর এতেই পড়ছে টানা বৃষ্টি।
এদিকে লঘুচাপের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সম্ভাবনা রয়েছে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির। গত ২৪ ঘন্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস কেন্দ্রে ৫০ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

