
চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জে মীর গ্রুপের বিরুদ্ধে চড়া মূল্য চিনি বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম, চট্টগ্রাম : জেলা প্রশাসনের পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী রমজানে বাজার মনিটরিংয়ের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে অভিযান চালিয়ে চিনিতে কারসাজির অভিযোগে মীর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম ও সেলস ম্যানেজার জানে আলমকে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাদের সহযোগিতা করে র্যাব-৭ এর একটি দল।
বুধবার (৮ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছোলা ও চিনির ডিলার এবং আড়তে অভিযান চালানো হয়।অভিযানে মীর গ্রুপের অফিস সিলগালা করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান, আবদুস সামাদ ও হাসান বিন আলীর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানটি পরিচালিত হয়।
অভিযানের শুরুতেই র্যাবের এএসপি জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক র্যাব সদস্য নিয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হমিলুর রহমানসহ তিন ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম হানা দেন মীর গ্রুপে। আগে থেকেই ভ্রাম্যমান আদালতের কাছে তথ্য ছিল তারা চট্টগ্রামের স্বনামধন্য একটি চিনি কারখানা থেকে কম দামে চিনি ক্রয় করে বেশি দামে বিক্রি করছে।
এমন অভিযোগের সত্যতা মিলে ভ্রাম্যমান আদালতের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, তারা কর্ণফুলীর ওপারের একটি চিনি কারখানা থেকে ৪৬ টাকা ৮০ পয়সায় চিনি কিনে পাইকারি বাজারে ৫৮ টাকা ৫০ পয়সা বিক্রি করছে।
চিনি নিয়ে এ ধরনের কারসাজির অভিযোগে মীর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম ও সেলস ম্যানেজার জানে আলমকে ১০ লাখ টাকা করে মোট ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এছাড়া আদালতকে অসহযোগিতা করায় হিসাব সহকারী মফিজুল হক ও সজল সেনগুপ্তকে এক সপ্তাহ করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে মীর গ্রুপের অফিস সিলগালা করে দেয় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান। এসময় ক্যাব সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌসসহ বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মীর গ্রুপের মেসার্স হাজি মীর আহমেদ সওদাগর নামের প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে কর্ণফুলীর ওপারের একটি চিনি কারখানা থেকে ৪৬ টাকা ০৮ পয়সায় চিনি কিনে পাইকারি বাজারে ৫৮ টাকা ০২ পয়সায় বিক্রি করছে। প্রতি কেজিতে তারা ১২ টাকা লাভ করছে। চিনি নিয়ে এ ধরনের ইচ্ছেকৃত কারসাজির অভিযোগে মীর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালাম ও সেলস ম্যানেজার জানে আলমকে ১০ লাখ টাকা করে মোট ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তারা দুই টাকা লাভে চিনি বিক্রির মুচলেকা দেন। এ ছাড়া আটক দুই কর্মচারী মফিজুল হক ও সজল সেনগুপ্তকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বৃহত্তর চট্টগ্রামের বড় একটি অংশের চিনির ভোক্তাদের জিম্মি করে রেখেছিল মীর গ্রুপ। তারা আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত কারখানা থেকে ১০টি লটে ২০ হাজার মেট্রিকটন চিনি কিনে রেখেছে প্রতিকেজি ৪৬ টাকা ৮ পয়সা দরে। অথচ বাজারে চিনি বিক্রি করছে ৫৮ টাকা কেজি। তাদের দুটি গুদামে মজুদ আছে ১১২ টন চিনি। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে একেকটি লটে তারা ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করে। পরিবহন, গুদাম ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক ঋণের সুদ ইত্যাদি বাবদ ৪০ লাখ টাকা বাদ দিলেও ২ কোটি টাকা লাভ করছে।’
এব্যাপারে মীর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুস সালামের কাছে সাংবাাদিকরা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে তিনি বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকালে আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমরা যে চিনি ৪৬ টাকা কিনেছি সেগুলো এখনো মিল থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়নি। এখন যে চিনি বিক্রি করছি তা ৫০ টাকা কেনা। পরিবহন, গুদাম, সুদ ও অন্যান্য খরচ মিলে চার টাকা খরচ আছে কেজিতে। তাই ৫৮ টাকা বিক্রি করতে হয়েছে।’
তিনি সাংবাদিকদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘ঢাকার যেসব বেসরকারি চিনির মিল চিনি উৎপাদন করে তাদের সঙ্গে মিল রেখেই চিনির দর ওঠানামা করে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র চার ঘণ্টার। সেখানে যদি কম দামে চিনি পাওয়া যায় তবে ব্যবসায়ীরা বেশি দামে আমার কাছ থেকে কেন কিনবে? আমরা নিজেরাই ভোক্তা সাধারণের সুবিধার্থে ন্যায্যমূল্যে ৪৫ টাকা দরে ১০টি পয়েন্টে চিনি বিক্রি করছি।’
একই দিন একই এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমানের নেতৃত্বে অপর অভিযানে কম দামে ছোলা-ডাল কিনে বেশি দামে বিক্রি করায় আশরাফ হোসেন মাসুদের মালিকানাধীন মাসুদ ব্রাদার্সকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সতর্ক করা হয় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার রূপন দাশকে। এছাড়া একতা স্টোর, আদর্শ ভাণ্ডার, মুক্তা স্টোর ও লক্ষ্মী ভাণ্ডারের কেনাবেচার রশিদ পরীক্ষা করা হয়।
এর আগে গত ৩১ মে চট্টগ্রামের আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় আসন্ন রমজান মাসে ছোলা, তেল, চিনি, ডাল প্রভৃতি পণ্যের বাজারে দামবৃদ্ধির কারসাজিতে ধরা পড়লেই জরিমানার পরিবর্তে সরাসরি জেলখানায় পাঠানো হবে বলে ব্যবসায়ীদেরকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন।
রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। রোজার প্রথম দিনের ভ্রাম্যমান আদালত নগরী কাজীরদেউড়ি ও রেয়াজউদ্দিন বাজারে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে তিন ব্যবসায়িকে দন্ড দেওয়ার পাশাপাশি চার ব্যবসায়িকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
মূল্য তালিকা না টাঙ্গানো, পাইকারি পণ্য কেনার সময় রশিদ না দেওয়া এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রিতে কয়েকগুণ পার্থক্য থাকায় তাদের সাজা ও জরিমানা করে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/ জেএ/ এমকে




