সিটিজি বার্তা২৪ ডটকম
মিজানুর রহমান খান
মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যা মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা ধরা পড়েছিল। তারা জবানবন্দি দিয়েছে। নানা স্বীকারোক্তি দিয়েছে। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, তদন্ত নিয়ে এখন আর আলোচনা নেই। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বাবুল আক্তারের চাকরি।
জাতীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে, ‘মাহমুদার স্বামী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার নিজেও এ নিয়ে কিছু বলছেন না।’
তার মানে, বাংলাদেশ এখন কি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইনের আপন কোনো গতি নেই? সেটা চলে কর্তাব্যক্তিদের হুকুমে। এত দিন শুধু এটাই জানতাম। কিন্তু এখন দেখছি, আইনের আপন গতিতত্ত্ব নবতর মাত্রা লাভ করেছে।
সেখানে ভিকটিম পরিবারের সদস্যকেই দায়ী করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, ‘বাবুল আক্তার নিজে এ নিয়ে কিছু বলছেন না।’ আইনের কোন ধারায় আছে যে তাঁকে স্ত্রী হত্যার বিচার চাইতে হবে। এর আগে আমরা জানলাম যে একজন সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে!
এখন আমাদের ধারণা হচ্ছে, মিতু হত্যাকাণ্ড এমন একটি হত্যাকাণ্ড, যার তদন্ত ও বিচার কারও চাওয়া বা না-চাওয়ার ওপর কিছুটা হলেও নির্ভরশীল।
বাবুল আক্তারকে আগে আমরা সরকারের সব স্তর থেকে নায়ক হিসেবে চিত্রিত করতে দেখেছি।
যখন মিতুকে আমরা রাস্তায় রক্তাক্ত ঢলে পড়তে দেখেছিলাম, পুলিশের বড় কর্তারা তখন বলেছিলেন, এই হত্যার সঙ্গে জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে। সাহসী বাবুল আক্তার ছিলেন তেমনই ডাকসাইটে পুলিশ অফিসার, যিনি জান বাজি রেখে জঙ্গি ডেরায় বারংবার হানা দিয়েছেন, তাই জঙ্গিদের কোনো গোষ্ঠী তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করে বদলা নিয়েছে। এরপর বিশেষ অভিযানে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলো।
আমরা লক্ষ করব, এই গ্রেপ্তারের অভিযানে পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও হয়রানির যে চিরাচরিত অভিযোগ ওঠে, সেটা তুলনামূলক কম ছিল।
কারণ, মিতুর রক্তাক্ত নিথর দেহ জনগণকে স্তম্ভিত করেছিল। সেই ১০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে নিশ্চয় সন্দেহভাজন জঙ্গিরা ছিল, তাদের কবে কার বিচার হবে, এর মধ্যে কবে কার আদালতে শুনানি শেষ, সাক্ষ্য গ্রহণের পরে দোষী সাব্যস্ত হবে, তা আমরা জানি না।
আইনের আপন গতি এটা আমাদের জানতে দেবে, এমন রাষ্ট্র আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। এমনকি এর মধ্যে কত লোককে ইতিমধ্যে কী বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বা তার মধ্যে কতজন জামিনে বেরিয়েছে, তাও আমরা জানতে পারি না। সরকারি কৌঁসুলিরা (পিপি) কখন কার জামিনের বিরোধিতা করেন, কখন নীরব থাকেন, কখন ‘মৃদু বিরোধিতা’ করেন, তা আমরা জানি না।
বাবুল আক্তারকে আমরা দুভাবে কল্পনা করতে পারি। প্রথমত, তিনি একজন সদ্য স্ত্রীহারা স্বামী, যিনি ব্যথিত ও মর্মাহত। তাঁর শ্বশুর সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাঁর মেয়ের সঙ্গে তাঁদের কোনো মনোমালিন্যের পূর্বাপর কোনো খবর তাঁদের কাছে নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি আইনের চোখে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। এই দুটি সম্ভাব্য অবস্থার কোনোটিই এই যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে না যে তাঁকে দ্রুত পদত্যাগ করতে হবে। শোক প্রকাশের জন্য তাঁর পদত্যাগ জরুরি নয়। নিজকে আড়াল করতেও তাঁর পদত্যাগ জরুরি নয়। কারণ, পদত্যাগ তাঁকে তদন্ত থেকে নিস্তার দিতে পারে না।
বাবুলের ‘পদত্যাগ’ মিতুহত্যার তদন্তের গতিকে বাধাগ্রস্ত বা প্রভাবিত করার কথা নয়। বাবুলকে কেউ পদত্যাগে বাধ্য করলেও মিতু হত্যার তদন্তের গতিকে বাধাগ্রস্ত বা প্রভাবিত করার কথা নয়। এখন ওপরের যেকোনোটি সত্য হলেও তা পুলিশ প্রশাসনকে কোনো দায়মুক্তি দেবে না। যেকোনো ছুতানাতায় মিতু হত্যার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করা হলে তা আইন কিংবা জনগণের চোখে গ্রহণযোগ্য হবে না।
যদি দাবি করা হয়, দেশে আইনের শাসন আছে, তাহলে এর প্রবক্তাদের মানতে হবে যে বাবুলের পদত্যাগ তাঁকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা নয়। পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেছেন, বাধ্য করা হয়নি, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।
যদি আইজিপির কথাই সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমরা এই ঘটনার একটি পৃথক তদন্ত দাবি করব। কারণ, বাবুলের পদত্যাগ বা তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করার দাবি জনমনে বিস্তর জল্পনাকল্পনা সৃষ্টি করেছে। পুলিশের প্রশাসন থেকে আমরা একটা ব্যাখ্যা চাই যে বাবুল কেন পদত্যাগ করেছেন। আর কেনই-বা তিনি এখন তাঁর চাকরি ফিরে পেতে চাইছেন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘বাধ্য করার প্রশ্নই ওঠে না। অনেক দিন অপেক্ষা করে সেই পদত্যাগপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’ আইজিপি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে পুলিশের প্রতি জনগণের যাতে সমীহ ও মর্যাদা বেড়ে যায়, সেটা দেখা তাঁর কর্তব্য।
আইজিপির ‘অনেক দিন অপেক্ষা’ করার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে বাবুল আক্তার মানবিক বিবেচনা লাভ করার যোগ্য একজন মানুষ। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত শেষ না হতেই পুলিশ বিভাগ বাবুল আক্তারকে নিয়ে আরও বড় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
যে বাবুল আক্তারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে আইজিপিকে ‘অনেক দিন অপেক্ষা’ করতে হয়, এতটা মানবিকতা যার জন্য, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে প্রথম আলো রিপোর্ট বলেছে, ‘আলোচিত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। স্ত্রী হত্যার বিচারের বিষয়ে স্বামী বাবুল আক্তার এখন পর্যন্ত মুখও খোলেননি। তবে চাকরি ফিরে পেতে এখন তিনি তৎপর হয়ে উঠেছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।’
মিতু হত্যার বিচার আরও লাখো বিচারাধীন মামলার ভিড়ে হারিয়ে যাবে বা পদত্যাগী বা পদচ্যুত বাবুল আক্তারও হারিয়ে যাবেন, অথচ তার বিশ্বাসযোগ্য কারণ আমরা জানব না-এর কোনাটিই আইনের শাসনের ধারণাকে সমুন্নত করে না।
তাঁকে ১৫ ঘণ্টার নাটকীয় জিজ্ঞাসাবাদ, সেই সময়ে তাঁর পদত্যাগ, পরে তাঁর কাজে যোগদানের অভিযোগ অগ্রাহ্য, আবার তাঁর জন্য মানবিক কারণে দেড় মাস অপেক্ষা, আবার আড়াই মাসে তদন্তের খোঁজ না নেওয়ার জন্য আফসোস-সব মিলিয়ে নিহত মিতুর চেয়ে জীবিত বাবুল আক্তার সব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসছেন।
তবে বাবুল আক্তারের উপাখ্যান গোটা পুলিশের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাই তাঁর পদত্যাগের কারণ উদ্ঘাটনে প্রশাসনের বাইরের কাউকে দিয়ে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানাই। সূত্র প্রথম আলো





