কেন এসব হত্যাকান্ড???

নিউজ ডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

বৃহস্পতিবার,  ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

deaths

ছেলের আগুনে বাবার মৃত্যু, মায়ের হাতে শিশুপুত্র খুন, ছেলের বঁটির আঘাতে মা খুন-এসব ঘটনা সামাজিক পরিস্থিতি ও আপনজনদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

গত কয়েক মাসে গণমাধ্যমে এ ধরনের শিরোনামগুলো বারবার এসেছে। অনেকে ব্যথিত হয়েছেন, মুষড়ে পড়েছেন, স্তব্ধ হয়ে ভেবেছেন-এও কি সম্ভব!

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের গত আট মাসের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে ৪৩ শিশু মা-বাবার হাতে হত্যার শিকার হয়। ১০টি পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

এ প্রতিবেদনে অবশ্য ছেলেমেয়ের হাতে কত মা-বাবা খুন হলেন, এ তথ্য নেই। তবে প্রতিদিনের বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের খবর সূত্র বলছে, এ সংখ্যা নেহাত কম নয়।

নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ একমাত্র ছেলে ফারদিন হুদা মুগ্ধর দেওয়া আগুনে দগ্ধ বাবা ফরিদপুরের ব্যবসায়ী এ টি এম রফিকুল হুদা (৪৮) সাত দিন মৃত্যুর যন্ত্রণায় চটপট করতে করততে অবশেষে মারা গেছেন। বুধবার ২১ সেপ্টেম্বর ভোর সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান তিনি। তিনি সাবেক নির্বাচন কমিশনার এ টি এম সামসুল হুদার ছোট ভাই।

১৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে সাত বছরের শিশুসন্তান শাহরিয়ার আলম কাব্যকে কুপিয়ে হত্যার পর মা তাসলিমা খাতুন (৪৫) আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত শেখ রাসেল মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল। পরে প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই মা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছিলেন।

এর এক দিন আগে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশের সকল গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চট্টগ্রামের গোসাইলডাঙ্গায় মা কুমকুম চৌধুরীকে (৪৩) কুপিয়ে হত্যার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ছেলে সুমিত চৌধুরী (২১)।

এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সুমিত ‘মানসিক সমস্যায়’ ভুগছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ মায়ের মানসিক অবস্থাও ভালো ছিল না।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনশ্রীতে নুসরাত আমান ও আলভী আমানকে তাদের মা মাহফুজা মালেক খুন করেছেন বলে যখন অভিযোগ পাওয়া যায়, তখন তা নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই মাকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

৩ মার্চ র‍্যাব প্রেস ব্রিফিং করে জানায়, দুই শিশুর মা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। হত্যার কারণ হিসেবে সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে মায়ের উদ্বেগের কথা জানানো হয়।

চলতি বছরের মে মাসে দেড় বছরের সন্তান নেহাল সাদিককে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মা ফাহমিদা মীর। ঢাকার মহানগর হাকিম এস এম মাসুদ জামান ওই নারীর জবানবন্দি রেকর্ড করে তাঁকে করাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। নেহাল সাদিককে তার মা ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করেন। পরে তিনিও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

চলতি বছরের মার্চ মাসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে খুন হয়েছেন বাবা। আনোয়ারুল কবির তাঁর বাবা এমদাদুল হককে (৬৫) নিজ ঘরে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে হাতুড়িপেটা করে গুরুতর আহত করেন। পরে এমদাদুল মারা যান।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানের হত্যাকাণ্ড। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাঁদের মেয়ে ঐশী নিজেই তাঁর মা-বাবাকে খুনের কথা স্বীকার করেছেন। মা-বাবাকে খুন করে স্বাধীন হতে চেয়েছিল সে। এটি ২০১৩ সালের ঘটনা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম মনে করেন, সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে যথাযথ প্যারেন্টিংয়ের অভাবের কারণেই এমনটা ঘটছে। মাদকাসক্তি, মানসিক রোগ, দারিদ্র্যসহ অন্যান্য সমস্যা তো রয়েছেই। তাঁর মতে, পরিবার ও সমাজের ভেতরের মনিটরিং-ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সবার চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।

কারও আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে, মাদকাসক্ত হলে তাঁর দিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ঘটনা ঘটে গেলে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীকে যুগান্তকারী শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম খান বলেন, এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে, সেভাবে এর কার্যকারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি। চারপাশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোনো একটা মুহূর্তে মা-বাবার সন্তানের প্রতি বা সন্তানের মা-বাবার প্রতি যে মমত্ব বা ভালোবাসা থাকে, তা আর থাকছে না। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে জীবনকে কিছু পাওয়ার অস্ত্র হয়েছে দেখছে বেশির ভাগ মানুষ। বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। দারিদ্র্য, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের চাপ, ধৈর্য কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।

আপনজনের ওপর সেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। সন্তানের জন্য জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বা মা-বাবার জন্য জীবনে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত-এ ধরনের মনোভাব তৈরি হচ্ছে।

আইন বা নীতি দিয়ে এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন। কাউন্সেলিংয়ের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জীবনটা শুধু প্রাপ্তির জন্য নয়, জীবনে কিছু দিতে হবে-এ দর্শন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে হবে।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তনের ফলে একাকিত্ব, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, আপনজনের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘোচাতে হবে। মূলকথা হলো, আত্মোপলব্ধি ছাড়া আর বিকল্প কিছু নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির কেস ম্যানেজার ফাহমিদা আক্তার বলেন, অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য নতুন নতুন অপরাধের জন্ম হচ্ছে। অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সবাই বুঝবে যে এ অপরাধ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু এ ধরনের নজির তৈরি হচ্ছে না বিভিন্ন কারণে।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.