রোকেয়া রহমান । ২৭ আগস্ট ২০১৬
গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে শুধু এ নিয়েই আলোচনা। পত্রিকার পাতাগুলো ভরে যায় জঙ্গি হামলা-সংশ্লিষ্ট খবর, মতামত ও নিবন্ধে। এসব খবর ও নিবন্ধ পড়ে বেদনায় নীল হতে থাকি আমরা। কী করে সম্ভব হলো এমন ঘটনা আমাদের দেশে। যেসব ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল, তাঁরা কিনা জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এমন ঘটনাই ঘটালেন যে নিজেদের প্রাণটাই চলে গেল। আমরা ভেবেছি ছেলেরাই কেবল জঙ্গি হচ্ছেন। তাঁদের এমন পরিণতি দেখে হতাশায় ভরে হয়ে ওঠে মনটা।
এরপর জুলাই মাসের শেষ দিকে পত্রিকার পাতায় একটি খবর পড়ে মনে মনে প্রচণ্ড ধাক্কা খাই। খবরটি হচ্ছে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল থেকে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সাত নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের তিনজন আবার জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্র, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও উগ্র মতবাদের বই। তাঁদের বয়স ১৯ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তাহলে শুধু ছেলেরা নন, মেয়েরাও জঙ্গি হচ্ছেন!
এরপর ১৫ আগস্ট পুলিশ চার নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করার পর আমরা যেন মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলি। এই চার নারী সম্পর্কে একের পর এক তথ্য আমাদের বিস্মিত করে। তাঁদের একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। বাকি তিনজন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তাঁরাও নাকি জেএমবির সদস্য! তাঁদের কাছে পাওয়া গেছে উগ্র মতবাদের বই। পাওয়া গেছে আরও ২৭ জন নারী জঙ্গির সন্ধান। র্যাব ও পুলিশ তাঁদের হামলার লক্ষ্য। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তাঁরা তহবিল সংগ্রহ করছিলেন।
বোঝা গেল, সবাই ঘটা সম্ভব এ দেশে। হয়তো আরও অনেক নারী জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, যাঁদের খবর এখনো আমরা পাইনি। কী করে এমনটা হচ্ছে সঠিক জানি না। কিন্তু ওই মেয়েদের এটা বুঝতে হবে যে এই পথ তাঁদের নয়। এই মেয়েদের জীবনের লক্ষ্য নিশ্চয়ই জঙ্গি হওয়া ছিল না। তবে এখন কেন এমন পথ বেছে নিয়েছেন তাঁরা? জানতে ইচ্ছে করে ‘কেন তাঁরা এমন পথ বেঁচে নিলেন, যে পথে রয়েছে মরণফাঁদ।’
২০ আগস্ট প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে এক নারীর স্বপ্ন পূরণের গল্প। তাঁর নাম সুপর্ণা দে। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ৩৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পরীক্ষার আগের দিন প্রসবব্যথা উঠল। রাতে নেওয়া হলো হাসপাতালে। ভোর সাড়ে চারটায় তাঁর কোলজুড়ে এল ছেলে। সকাল ১০টায় পরীক্ষা। হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে কেন্দ্রে গেলেন। তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়ে ফিরলেন নবজাতকের কাছে। তাঁর এই কষ্ট বৃথা যায়নি। সুপর্ণা দে এখন বিসিএস ক্যাডার। ৩৫তম বিসিএসে (প্রাণিসম্পদ) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম হয়েছেন তিনি। ১৭ আগস্ট এই ফল প্রকাশিত হয়েছে।
যেসব মেয়ে আজ জঙ্গিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের সামনে সুপর্ণা আজ জলজ্যান্ত একটি উদাহরণ। লক্ষ্য পূরণের জন্য কত কষ্টই না স্বীকার করেছেন তিনি।
এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে, যা উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতো। একটু পেছনে ফিরে তাকাই। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের বেশে তিনি অংশ নেন। এ রকম কজন করতে পারেন! শিরিনের মতো আরও বহু নারী আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা যুদ্ধ করেছেন। তাঁরা আজকের নারীদের অনুসরণীয় হতে পারেন।
আমাদের দেশের মেয়েরা আজকাল কি না করছেন? তাঁরা পাইলট হচ্ছেন, তাঁরা ট্রেন চালাচ্ছেন, চিকিৎসক হচ্ছেন, প্রকৌশলী হচ্ছেন, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
পুলিশ যেসব নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা তো সে পথেই হাঁটছিলেন। তাহলে কেন এই পদস্খলন? এসব ছেড়ে এ কোন ভয়ংকর পথে হাঁটছেন তাঁরা? তাঁরা তো সবাই মেধাবী। এই মেধাকে ভালো কাজে না লাগিয়ে কেন ধ্বংসাত্মক কাজে মেতে উঠেছেন?
ভয় হয়, না জানি আরও কত নারীর জঙ্গি হয়ে ওঠার খবর পাব আমরা। সর্বনাশের বীজ বুনেছেন কেউ একজন। সেগুলোই এখন চারা হচ্ছে। আস্তে আস্তে বৃক্ষে পরিণত হবে। মেলবে ডালপালা। এখনই সময় এই চারা উপড়ানোর।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক





