জেলে যাবার খবর প্রচার হওয়ার পর হঠাৎ করে স্ট্যাটাসটি উধাও

সোমবার,২৯ মে ২০১৭

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত স্থায়ী ক্যাম্পাস খুলে প্রতারণার অভিযোগে বৃহস্পতিবার কারাগারে যান আশরাফুল ইসলাম সজীব। কিন্তু শুক্রবার রাত ১১.৩১ মিনিটে নিজের ফেসবুকে আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি জানান, ‘আর্জেন্টলি কুয়ালালামপুর যেতে হচ্ছে, দোয়া করবেন, জয় বাংলা।’
শনিবার তার প্রতারণা ও জেলে যাবার খবর প্রচার হওয়ার পর হঠাৎ করে সেই স্ট্যাটাসটি আবার উধাও হয়ে যায়। আর এসময়ের মধ্যে তার মালয়েশিয়া যাত্রায় শুভ কামনা জানিয়ে অসংখ্য লাইক ও কমেন্ট পড়ে।
প্রশ্ন উঠেছে, আশরাফুল ইসলাম সজীব জেলে গিয়ে মালয়েশিয়া যাবার কথা বলে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণ কী। প্রকৃত ঘটনা আড়াল কিংবা মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে চেয়েছিলেন সজীব? তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তার জেলে যাবার খবর গোপন থেকে যাবে। ভবিষ্যতে জেল থেকে বের হওয়ার পর মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন-এমন কথা বলার একটা ক্ষেত্র তৈরি করতেই জেলখানায় বসে তার নিজস্ব আইডি থেকে এই স্ট্যাটাস দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন সজীব।
শনিবার ভুক্তভোগীদের কাছে সজীবের জেলে যাওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর তার প্রতারণার আরেকটি কৌশল প্রকাশের পাশাপাশি এ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এইচ এম শওকত নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ধরে নিলাম উনি ২৫ তারিখ বৃহস্পতিবার সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নিজেই আত্মসমর্পণ করলেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ২৬ তারিখ শুক্রবার রাত ১১:৩১ মিনিটের সময় উনার নিজস্ব ফেইসবুক আইডি থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে বললেন আরজেন্টলি তিনি কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন। বাহ্ চোরের আবার সাহসিকতা! চোরের মত এই মিথ্যাচার করলেন কেন! নাকি তার চোখে চট্টগ্রাম জেলখানা কুয়ালালামপুর! মানুষ এখন সবই বুঝে, শুধু বুঝে না চোরেরা!
এদিকে, শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য যুবককে পথে বসানোর অভিযোগে আশরাফুল ইসলাম সজীব কারাগারে যাওয়ার পর কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়ায় রোববারও মিষ্টি বিতরণ করেছে ভুক্তভোগী জনগণ।
এছাড়া শিক্ষা ও আদমপাচার নিয়ে তার প্রতারণার শিকার অনেকেই নতুন করে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। হোছাইন মোহাম্মদ শওকত নামের এক ভুক্তভোগী তার প্রতারিত হওয়ার বিষয় নিয়ে রোববার ফেসবুকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেন।
সেখানে তিনি লিখেন, আমি ভুয়া ড. আশরাফুল ইসলাম সজীবের কাছে কী দোষ করেছিলাম? কেন উনি মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার লোভে আমার জীবনটাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেন!
আশরাফুল ইসলাম সজীব ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি নিজস্ব অফিসে পার্টটাইম জব, কয়েকমাস পরে সেখান থেকে ইউরোপের দেশে ট্রান্সফার- এরকম নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে মালয়েশিয়া পাঠান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি উনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, আমি তার কাছে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হলাম।
এরপরও আমি উনার সাথে যোগাযোগ করলাম, বললাম ভাই আপনি আমাকে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন এটা তো বিশ্ববিদ্যালয় না, তাছাড়া এখানে কোনো শিক্ষক তো দূরের কথা ক্লাস নেওয়ার মতও একটা রুম নেই। তিনি আমাকে বলেন, তুমি অপেক্ষা কর সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি বললাম ভাই আপনি তো জানেন আমি একজন নিয়মিত ছাত্র, আপনি আমাকে যে কলেজে পাঠিয়েছেন সেখানে তো ছাত্রের নামে শ্রমিক আনা হয়, সেখানে তো কোনো পড়াশুনা নাই এবং এইটা নাকি মালেশিয়াতে মানবপাচারকারী লিস্টে উঠেছে। আপনি জেনে শুনে আমাকে কেন এখানে পাঠালেন।
পরে তাকে ফোন দিলে আর রিসিভ করেন না, মাঝে মধ্যে ফোন ধরে বলেন তুমি অমুখের সাথে যোগাযোগ কর, পরে তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমাকে দুইশ রিঙ্গিত দাও। আমি বললাম, আপনাকে কেন টাকা দিব? তিনি জানান, তাকে নাকি সজীব বলেছেন আমাকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিতে, আর মালেশিয়াতে চাকরি নিতে নাকি দুইশত টাকা দালালকে দিতে হয়। আমি বললাম, ভাই আমি তো জব করতে আসিনি, পড়াশুনা করতে এসেছি। আমি তো মনে করেছি উনি আপনাকে আমার সমস্যা সমাধানের জন্য পাঠিয়েছে। পরে আস্তে আস্তে উনি আমার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এমনকি আমাকে অনলাইনের সব যোগাযোগে ব্লক মেরে দেন।
আমি যখন নিরুপায় হয়ে, আবারও পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশে চলে আসতে চাই তখন উনি আমার পার্সপোর্ট আটকিয়ে রাখে এবং আমাকে মেরে ফেলার জন্য কয়েকবার ডাকাত লাগিয়ে দেয়। পরবর্তীতে মালেশিয়া আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় আমি পাসপোর্ট নিয়ে ৪৫ দিনের মাথায় দেশে চলে আসি।
এখানে একটা কথা বলতে চাই, উনি আমাকে মালেশিয়া পাঠানোর আগে ভুয়া ডিগ্রি ভুয়া কলেজে ভর্তি করিয়ে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেন এবং পরবর্তীতে মালেশিয়া থেকে সুইজারল্যান্ড পাঠানোর কথা বলেন। তার কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে তিনি আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন।
আমি এর বিচার আপনাদের কাছেই দিলাম। সজীব কেন আমার জীবনের এত বড় সর্বনাশ করল? তিনি শুধু আমার না, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আমার মত হাজার হাজার সন্তানের জীবন নষ্ট করেছে।
চিঠিতে তিনি সজিব ওয়াজেদ জয় ও সুচিন্তার বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ এ আরাফাতের কাছেও বিচার প্রত্যাশা করেন। একইসাথে তার সঙ্গে প্রতারণার কিছু কাগজপত্র সংযুক্ত করে প্রশ্ন রাখেন- আমি উনার (সজীব) বিরুদ্ধে মামলা করব নাকি গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে মরে যাব! নাকি নিজ হাতে ওকে খুন করে আমার জীবন নষ্টের বদলা নিব?
এছাড়া মোহাম্মদ হারুনর রশিদ জীবন নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, তিনি আমার সম্পর্কে চাচা হন, আমার সাথেও তিনি প্রতারণা করেছেন। আমাকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে গিয়ে আমার স্টুডেন্ট লাইফ থেকে তিনটা বছর নষ্ট করেছেন।
প্রসঙ্গত, সুইজারল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশ ক্যাম্পাস উল্লেখ করে চট্টগ্রামে শিক্ষার নামে রমরমা ব্যবসা শুরু করেছিলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক ও সুচিন্তা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক আশরাফুল ইসলাম সজীব। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় নাম কিংস্টোন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন কাগজপত্র ও বিজ্ঞাপনে। আর এর নামে ভুয়া ডিগ্রি, ভুয়া পিএইচডি দেয়ার নাম করে অসংখ্য যুবককে পথে বসিয়েছেন। এধরনের একজন ভুক্তভোগীর মামলায় বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে সিএমএম আদালতে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একুশে পত্রিকা।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image