বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
মাকসুদুর রহমান : রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জঙ্গিদের সমন্বয়ে শতাধিক স্লিপার সেল গজিয়ে উঠেছে। এসব সেলের সদস্যদের শিক্ষা-দীক্ষা না থাকলেও তারা যেমন সাহসী তেমনই মানুষ হত্যায় (কতল) বেশ পারদর্শী। প্রতিটি সেলে তিন থেকে চারজন সদস্য থাকে। জেএমবি, হুজি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গিরাই সেলগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে। একের পর এক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দারা এমন তথ্য পেয়েছে।
স্লিপার সেলের অস্তিত্ব স্বীকার করে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, এদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত আছে। সেলের যে কজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কেননা তারা একে অপরকে কখনোই দেখেনি বা চেনে না। এ কারণে ভয়ংকর এসব জঙ্গিদের গ্রেফতার করতে সবগুলো সংস্থা কাজ করছে। এ কথাও সত্য যে, তারা যত ভয়ংকরই হোক না কেন, আর আগের মতো সুযোগ পাবে না। কেননা তাদের নেটওয়ার্ক গোয়েন্দাদের নজরদারিতে আছে।
গোয়েন্দা পুলিশের জঙ্গি ইউনিট সূত্র বলছে, সেলের জঙ্গিদের মাদ্রাসা, বাসা-বাড়ি কিংবা নির্জন কোনো স্থানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে অন্য কোনো অস্ত্র নয়, দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কীভাবে মানুষকে অতি সহজে হত্যা (কতল- জঙ্গিদের ভাষা) করা যায়, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতিম, গরিব কিংবা অশিক্ষিত পরিবার থেকে তারা এখানে এসেছে। আর মানুষকে কেন হত্যা করা হবে, সেজন্য উগ্র মৌলবাদের আদলে মগজধোলাই করা হয়। প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে তাদের আল কায়েদার দুর্ধর্ষ জঙ্গির মতো হিংস্র করে তোলা হয়। খাওয়া-দাওয়া কিংবা পরিবারের কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না। প্রশিক্ষণ শেষ হলেই তাদের কিলিং মিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মিশন সফল করার আগে তারা দুই থেকে তিন মাস পরিকল্পনা করে। একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য দুটি টিম মাঠে কাজ করে। তারা কখনোই একে অপরকে চেনে না বা কিছুই জানাতে পারে না। এ কারণে একজনের ব্যাপারে আরেকজন তথ্যও দিতে পারে না। টার্গেটের ব্যক্তি কোথায় আছে, তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ১০ বার রেকি করে। দুটি টিমই পৃথকভাবে রেকি করে থাকে।
ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যাকান্ডের তদন্তে নিয়োজিত গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে খুন করা হয়। এ সময় জিকরুল্লাহ ও আরিফুর রহমান নামের দুই জঙ্গিকে আটকের পর তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এরপরই সেলের সন্ধান পাওয়া যায়। ভাবনায় কখনোই ছিল না যে, জঙ্গিরা স্লিপার সেল গঠন করবে।
তিনি আরো জানান, প্রতিটি হত্যাকান্ডের জন্য জঙ্গিদের জন্য দুই হাজার টাকা বাজেট দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬০০ টাকা দিয়ে ৩টি চাপাতি কেনা হয়, ৪০০ টাকা যাতায়াতের জন্য। আর তিন দিন থাকা-খাওয়ার জন্য বাকি টাকা ব্যয় করা হয়। তবে তারা পোলাও-কোরমা খায় না। অনেকে আবার ফুটপাতেও রাতযাপন করে।
র্যাবের জঙ্গিবিরোধী ইন্টেলিজেন্সের একটি সূত্র জানায়, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি), জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যায়। তবে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে জঙ্গি কার্যত্রম পরিচালনা করে অতি গোপনে। এর মধ্যে কারাগার থেকে বের হয়ে আসা বোমারু মিজানসহ আরো কয়েকজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এদের নেতৃত্বে ছিল মাওলানা জসিমউদ্দিন। যদিও সে এখন কারাগারে আটক আছে। তবে সবগুলো সেলের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে রানা নামের এক মাওলানা। সে বেশিরভাগ সময় আফগানিস্তান কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশে অবস্থান করে। এর বাইরে আর কোনো তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে নেই। তার নির্দেশে দেশে সেল গঠন করা থেকে এর কর্মী সংগ্রহ, অর্থ সরবরাহ এবং সেলে অংশ নেওয়া জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মানুষ কতল করার জন্য ইসলামের নানা ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে উগ্রবাদী হিসেবে গড়ে তোলা হয় জঙ্গিদের। তাদের মগজধোলাই এমনভাবে করা হয় যে, অন্য কোনো যুক্তি বা আদর্শ তারা বিশ্বাস করে না। সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলতে পারে, এ শঙ্কায় তারা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হয় না। কেননা তারা সবসময় মনে করে, মিশন শেষ হওয়ার আগে কোনোভাবেই ধরা দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে অন্যদের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।











