নারী বলেই কি এতো অবহেলা!!!

সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম

বৃহস্পতিবার,  ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

lina-pervin

লীনা পারভীন: অনূর্ধ্ব ১৬ নারী ফুটবলারদের সাফল্য নিয়ে আমাদের উৎসব এখনো শেষ হয়নি। চলছে টেলিভিশন, পত্রিকাজুড়ে প্রশংসাসূচক খবর আর লেখালেখি। হবেইবা না কেন? বাংলাদেশের মতো একটি আপাত: পিছিয়ে থাকা সমাজব্যবস্থায় নারীরা আজ দাপুটে খেলোয়াড়। সমাজের অনেক আধুনিক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত কয়েকজন কিশোরী আজ আমাদেরকে আশার আলো দেখাচ্ছে এশিয়ার সেরা ফুটবল দল হবার। আনন্দে আমরা এতটাই মগ্ন যে এই বাচ্চাগুলো যে কবে কখন কীভাবে ফিরে গেলো তাদের বাড়ি সে খবরও আমরা জানি না।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এবং হৃদয়ভাঙ্গা খবরটি দেখলাম ফেসবুকে। আমার এক বন্ধু শেয়ার করেছে টেলিভিশনের খবরে প্রচারিত সেই কলঙ্কজনক দৃশ্য। দেশের মুখ উজ্জ্বল করা মেয়েদের ভাগ্যে জুটেছে লোকাল বাসে করে তাদের আপনালয়ে ফেরা। তবে কী তারা আজো দেশের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেনি? যদি তাই হবে তবে কেন তাদের যাতায়াতের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?

ঠিক একই সময়ে আমাদের ছেলেরাও খেলে এসেছে ফুটবল। তবে দেশে নয়, বিদেশে এবং বিদেশী কোচের আন্ডারে। মেয়েদের সাফল্যের নীচে চাপা পড়ে গেছে ছেলেদের ব্যর্থতার গ্লানি। সেই গ্লানি নিয়ে ফিরে আসা ছেলেদের ফুটবল দলের কোচ দু:খভরা মনে বলছিলো, মেয়েদের মধ্যে আমি সিরিয়াসনেস দেখেছি। তারা অন্তত জানে কীভাবে গোল করতে হয়। আমাকে অন্তত একজন কাউকে দাও যে গোল করতে পারে।

কোচের পাশে বসে থাকা একজনকে দেখিয়ে তাকে বলতে শুনলাম “এমনকি এই ব্যক্তিটিও যদি গোল করতে পারেন তবে তাকে দলে নিতেও আমার সমস্যা নাই”। এই ছেলেদের পোছনে প্রচুর বিনিয়োগ। বিদেশী কোচ। কত কিছুই না করছি আমরা। আর যারা দেশী কোচের আন্ডারে ট্রেইনিং নিয়ে, প্রত্যাশিত লেভেলের অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা ছাড়াই দেশকে নিয়ে গেলো বিশ্বের দরবারে, বয়ে এনে দিলো অমন সম্মান, তাদের দেখার কেউ নাই।

bd-women-u16-football-players

ময়মনসিংহের সেই কলসিন্দুর গ্রামের একই জায়গা থেকে আমরা পেয়েছি ৯টি সোনার টুকরা। আর তাদেরকেই আমরা উপহার দিলাম লক্করঝক্কর মার্কা বাসের ঝাঁকুনি। এখানে যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন এই অবহেলা?আসলেই জানতে চাই, কেন এই অবহেলা? তবে কী বাজেট ঘাটতি? তা কী বিশ্বাস্যোগ্য? একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনে ফান্ড থাকবে না তা হতেই পারে না। তবে কী? কোথায় গেলো সেই টাকা? তাহলে ধরে নিতে পারি কেবল নারী বলেই এতো অবহেলা!!।

নারী বলেই তাদের সাথে যেমন তেমন অবহেলার আচরণ করা যায়? নাকি, এইসব গরীব পিচ্চি পিচ্চি মেয়েদের পেছনে আবার কেন এত টাকা খরচ? ময়মনসিংহের কোন এক অজানা জায়গা থেকে ঢাকায় থেকেছে, খেয়েছে সেই অনেক বেশী বলে মনে করেছে আয়োজকরা? মেয়েরা প্রতিবাদ করে না বা এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলো প্রতিবাদের কিছুই বোঝে না এই ধারণা কাজ করেছে?

football

এমন অনেক প্রশ্নই আজ রাখতে চাই। ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্বশীলদের পক্ষে উত্তর দেয়াটা এখন গোটা বাংলাদেশের দাবী। এই মেয়েগুলো এখন আর কলসিন্দুরের মেয়ে নয়। প্রতিটা মেয়ে এখন আমাদের আত্মার আত্মীয়, নিকটজন। তাদের ভালো রাখা, ভালো থাকা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা দেয়াটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র তাদের সকল প্রকার দায়িত্ব নেবে এমনটাই আশা আমাদের। হতাশার কথা হচ্ছে পত্রিকার পাতা জুড়ে কেবল সেইসব কিশোরীর কষ্টের খবর। কোথাও দেখছি ওদের সবাইকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেয়া হচ্ছে, কোথাও দেখছি একজন ফুটবলারের বাবাকে পিটানো হয়েছে। একটা প্রবাদ আছে “যে দেশ গুনীর কদর করতে পারে না, সে দেশে নাকি গুনী জন্মায় না”। তবে কী বাংলাদেশের জন্য সেই নিয়তি অপেক্ষা করছে?

আমি নিয়তিতে বিশ্বাসী নই, তাই নিয়তি বলে মানতে পারছি না যে আমার প্রিয় স্বদেশ গুনী মানুষের জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু মানুষের কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে গোটা দেশ ভুক্তভোগী হতে পারে না। নারী বলে যেন তারা কোন প্রকার বৈষম্যের সম্মুখীন না হয় সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ফুটবলের কর্তাব্যক্তিদের। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবার থেকে এসেছে বলে যেন তারা কোন প্রকার বৈষম্যের মুখোমুখী না হয়। এই দায়িত্ব কোন অজুহাতেই এড়িয়ে যেতে পারেন না তারা।

bd-win-10goals-ctgbarta2420160831

বাফুফের ব্যাখায় দেখলাম, মেয়েরা এসি বাসে চড়তে পারে না তাই তারা নিজের ইচ্ছাতেই লোকাল বাসে যাতায়াত করেছে। এটা কোন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা হিসাবে গণ্য হতে পারে না। এই মুহূর্তে যদি আমরা সেইসব কিশোরীর এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি তবে ভবিষ্যতে হয়তো ২০১৭ সালের ফুটবল দল গড়ে তোলাটাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। বাফুফে কী তাই চায়? উনাদের মগজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই কী উনাদেরকে আটকাচ্ছে এইসব মেয়েদেরকে ভালো রাখতে?

জানি না, বিশ্বাস করতে চাই না তবে মনের অজান্তেই প্রশ্নটা থেকেই যায়, আসলেই কী আমরা খুশী হয়েছি মেয়েদের ফুটবলে সাফল্য দেখে? আমরা কী আদৌতে মেনে নিতে পারছি যে এইসব গাঁওগেরামের মেয়েরা সামনের বছরে বিদেশে পাড়ি জমাবে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে? যদি মেনে নিতে পারি, যদি মনে করি ওরা মেয়ে নয় ওরা ফুটবলার, ওরা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সম্পদ তাহলে অচিরেই এদের প্রতিপালনের দায়িত্ব আমাদের রাষ্ট্রকেই নিতে হবে, বাফুফের এই অবহেলাকে আনতে হবে উপযুক্ত জবাবদিহিতায়।

তবে সবকিছু ছাড়িয়ে আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে এই ১২ জন খেলোয়াড় পাচ্ছে তাদের অনুশীলনের জন্য অনুকুল পরিবেশ ও সুযোগ সুবিধা, তাদের পরিবার পাচ্ছে যথার্থ নিরাপত্তা। মেয়েগুলোর পড়াশুনায়ও যেন কোন বিঘ্ন না ঘটে। আমরা এদের প্রত্যেককে দেখতে চাই ২০১৭ সালের এ এফ সি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে।

*** সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম এর খোলা কলাম ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত সংবাদ লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত। সিটিজিবার্তা২৪ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত খোলা কলামের সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

আপনার মতামত দিন....

এ বিষয়ের অন্যান্য খবর:


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.