BREAKING NEWS
Search

মুসলমানরা কেন রোজা রাখে?

মঞ্জুর চৌধুরী,  সিটিজিবার্তা২৪ডটকম

মুসলমানরা কেন রোজা রাখে?

রমজান মুবারক

অতি সহজ একটি প্রশ্নের অতি সরল উত্তর হচ্ছে, “যাতে আমরা ক্ষুধার্থ ও তৃষ্ণার্তের যন্ত্রণা বুঝতে পারি। যাতে আমরা ওদের কষ্টে সাহায্য করতে পারি।”

উত্তর এতই সহজ, কিন্তু শিক্ষাটা এত সহজ হলে কোন কথাই ছিল না। আমরা ইফতারের নামে কত খাবার যে অপচয় করি! জিলাপিতে এক কামর দিয়ে ভাল লাগলো না, ফেলে দিলাম। পিয়াজু একটু ঠান্ডা হয়ে গেছে, ফেলে দিলাম। ছোলাটা মন মতন হয়নি, সেটাও ফেলে দিলাম। আর পানি? রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি অপচয় ঘটে বুঝিবা পানির। এক চুমুক দিয়ে বোতল যেখানে সেখানে রেখে দিলাম। তারপর আবার যখন প্রয়োজন হলো, আরেকটা বোতল খুলে আরেক চুমুক দিলাম।

বাহরে বাহ সংযম!

কথা যখন উঠেছেই, তখন কিছু কথা বলে ফেলা যাক।

রোজা রাখার মূল ব্যপারটি কী? খাদ্য-পানীয় গ্রহণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

শুধু কী তাই? না। সাথে এও বলা হয়েছে, যেকোন পাপকর্ম থেকেও নিজেকে বিরত রাখতে হবে।

এখন পাপ বলতে আমরা কী বুঝে থাকি? মিথ্যা বলা, চুরি করা, খুন করা, ব্যভিচার ইত্যাদি। কিন্তু যেখানে সেখানে, বিশেষ করে রাস্তায়, যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করে, সেখানে থুথু ফেলাও যে পাপ, আমরা কী তা মানি?

রেফারেন্স লাগবে? মদিনার সংবিধান গঠনের সময়ে নবীজির (সঃ) স্পষ্ট হাদিস আছে, “সেই ব্যক্তি জাহান্নামী যে অন্যের চলার পথে অথবা বিশ্রামের স্থানে মল-মুত্র ত্যাগ করে।”

আমাদের দেশের ফুটপাথের পাশেই মল-মুত্র দেখা যায়, এবং তারচেয়ে বড় কথা, রমজান মাসে মানুষের কাশ-কফ-স্যাপ ইত্যাদিতে পা না দিয়ে ঢাকা শহরে হাঁটা যায় না। কফ আর মলের মধ্যে মিল হচ্ছে দুইটাতেই জীবানু থাকে। এবং পার্থক্য হচ্ছে একটা মুখ দিয়ে বেরোয়, আরেকটা…..জানেনই তো। বলার দরকার কী?

বাঙালির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এরা খুব সহজেই জাজ করে বসে।

“ও দাড়ি রাখেনা, ও কাফের।”

“ও পর্দা করে না, ও কাফের।”

কেউ হয়তো শারীরিক অসুস্থতার জন্য রোজা রাখতে পারছে না। রোজা রাখলে সে অসুস্থ হয়ে যায়। ঈদের পরে তাই কাফফারা দিতে হয়। এইসব না শুনেই সিদ্ধান্তে চলে আসা, “ও কাফের!”

অথচ যে নারী আপাদ মস্তক বোরখায় ঢেকে লোকের নামে কুৎসা রটিয়ে অন্যের সংসারে আগুন লাগিয়ে বেড়ায়, তার কোন দোষ নেই। কারণ সে পর্দানশীল।

কিংবা এক হাত লম্বা দাড়িওয়ালা লোক, নামাজ পড়তে পড়তে যার কপালে পার্মানেন্ট দাগ বসে গেছে, তিনি যখন একবস্তা চালের মধ্যে এক কেজি কংকর মিশিয়ে দেন, তবুও তিনি ভাল, কারন তিনি নামাজি।

ভাই। জাজ করার অভ্যাস ত্যাগ করেন। জাজ করাটাও ইসলামী দৃষ্টিতে পাপ। বুঝার চেষ্টা করেন কোন মানুষ “কী” করছে। বেশ্যা নারীর কুকুরকে পানি খাওয়ানোর ঘটনার কথা মনে আছে? তাহলে আপনি মানুষকে দেখেই “কাফের” ফতোয়া দেয়ার কে?

“আল্লাহ জ্বিন ও মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”

অতি সহজ সরল আয়াত, যা সবচেয়ে বেশি অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে।

আল্লাহর ইবাদত মানে কী শুধুই মসজিদে বসে জিকির আসগার করা? জ্বিনা। মানুষের সেবা করাও আল্লাহর ইবাদত। পশুপাখির যত্ন নেয়াও আল্লাহর ইবাদত। বৃক্ষরোপনও আল্লাহর ইবাদত। মোট কথা, যেকোন সৎ কাজ করাই আল্লাহর ইবাদত। এবং তারচেয়ে বড় কথা, যেকোন অসৎ কাজ থেকে দূরে সরে থাকাটাও আল্লাহর ইবাদত।

সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে যে দুর্নীতিগ্রস্থ ফাইলটা রিলিজ করে দেয়া যায়, সেই ফাইলটা যদি কেউ জেদ ধরে আটকে রাখে এবং ফাইল না শোধরানো পর্যন্ত রিজেক্ট করতেই থাকে, সেই লোকটি হয়তো জানেই না তিনি কিভাবে আল্লাহর ইবাদত করে চলেছেন।

রাস্তায় ক্ষুধার্থ একটি কুকুরকে দুইটা বিস্কিট ও এক বাটি পানি এগিয়ে দেয়া লোকটিও জানেনা সে শুধু এই কাজের বিনিময়েই আল্লাহর কতখানি কাছাকাছি চলে গেছে।

অসহায় এতিমের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়ার চেয়ে বড় ইবাদত পৃথিবীতে খুব বেশি একটা কী আছে?

একবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে জিডি করতে সিলেট কোতয়ালী থানায় যেতে হয়েছিল। কর্তব্যরত পুলিশ জোর করে পাঁচশ টাকা আদায় করে নিলেন। ঈদের বাজার!

ট্রেনে করে সিলেট থেকে ঢাকা আসবো। ঈদ আসতে তখনও অনেক দেরী। মা বোন্ সাথে যাচ্ছে বলে আস্ত স্লিপিং বার্থ রিজার্ভ করলাম। সাতশ টাকার মত লেগেছিল। এক হাজার টাকা দিলাম। টিকেট মাস্টার পুরোটাই রেখে দিলেন। ঈদের বাজার।

“ঈদের বাজারে” এমন হামেশাই ঘটছে।

অন্যের গলা কেটে উৎসব উদযাপন। এই ঈদের কোন মূল্য আছে?

সবচেয়ে বিভৎস ঘটনার সাক্ষীতো গত বছরই হলাম। সেহরী খেয়ে, সারাদিন রোজা রেখে একটি শিশুকে (রাজন), একটি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীকে পিটিয়ে হত্যা করে ইফতার খেতে বসে মোনাজাত করা, “ইয়া আল্লাহ! আমার রোজা কবুল কর!”

এদেরকে সৌদি স্টাইলে ধরে ধরে শিরচ্ছেদ করা উচিৎ। কোন কথা নাই।

আরে ভাই, রোজা রেখেও যদি পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে না পারো, হত্যা থেকে শুরু করে পরনিন্দা, পরচর্চা, গিবত থেকে নিজেকে সামলে রাখতে না পারো, অন্যের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে আটকাতে না পারো, তাহলে তুমি শুধু শুধুই সারাটা মাস না খেয়ে থাকলে।

তোমার আত্মার পরিশুদ্ধির জন্যই আল্লাহ তোমাকে রোজা রাখতে বলেছিলেন। তোমার খাওয়া না খাওয়ায় তাঁর কিছুই আসে যায় না।

রমজান চলে গেলেও পুরানো বদভ্যাস যেন ফিরে না আসে। পাপ, সে যে মাসেই করেন না কেন, পাপ হয়ে থাকে।

এই কথাটিকে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল একটি উর্দু গানে। যার তর্জমা হচ্ছে, “আমাকে শরাব খেতে দে মসজিদে বসে,

আমাকে শরাব খেতে দে মসজিদে বসে,

নাহলে এমন কোন স্থান দেখিয়ে দে যেখানে খোদা না আছে।”

সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা।।

মঞ্জুর চৌধুরী –  অসংখ্য গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য পরিচিত। ফেইসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ক্যানভাসের প্রতিষ্ঠাতা এবং একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে ফিনান্সিয়াল এনালিস্ট হিসেবে বর্তমানে আমেরিকাতে কর্মরত আছেন। উক্ত লিখার সাথে সিটিজিবার্তা২৪ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতিমালার কোন সম্পর্কিত নেই। লেখকের একান্ত মতের মুক্ত আলোকে প্রকাশিত।।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image