রনিয়া রহিম, সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম
শনিবার, ২৭ আগস্ট ২০১৬
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে? এটা খুব অদ্ভুত আর অহেতুক এক তর্ক।’ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হলো। তার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক ডাকের প্রয়োজন হয়, যে কোন কার্যক্রমের আগে যেমন একটি ঘোষণা দিয়ে শুরু করা লাগে।
বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি, তা নিয়ে বুঝি তর্কের প্রয়োজন? একাত্তরে তাঁরই নেতৃত্বে আমাদের দেশ যুদ্ধে নেমেছিল, তাঁরই দেখানো স্বপ্নটা অনুসরণ করে বিজিত হয়েছিলাম।
আনুষ্ঠানিক আহ্বান এসেছে দু দফায়। (আমি ৭ই মার্চের ভাষণকে এই লেখাটিতে আনছি না; সেটি প্রতীকী এক আহ্বান হিসেবে ভাবাই যায়, এই লেখাটি আনুষ্ঠানিক ডাকটি নিয়ে)। পঁচিশে মার্চের কালোর রাতের কথা আমরা সবাই জানি। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানে। গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের নির্দেশ দিয়ে যান: “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।”
তাঁর পক্ষ থেকে ২৬শে মার্চে দুপুরে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এম. এ. হান্নান। মেজর জিয়াউর রহমান সেই ঘোষণাটি পাঠ করেন পরের দিন: “On behalf of our great national leader, the supreme commander of Bangladesh Sheikh Mujibur Rahman, do hereby proclaim the independence of Bangladesh. Joy Bangla.”
আমার অফিসে আমার বস যদি আমাকে কোন প্রেসেন্টেশন করতে ডাকেন কোন ক্লায়েন্টের সামনে, আমি সেখানে আমার প্রতিষ্ঠানকে রিপ্রেসেন্ট করবো, আমার নিজেকে তো না। যদি কোন ঘোষণা দেই আমি, আমি আমার বসের হয়ে দিচ্ছি- ঘোষণাটি তো আমার না। জিয়াউর রহমান নিজে সেটি জানতেন- একাত্তরে সবাই সেটি জানতো- কারো মাথাতে এই প্রশ্নটা আসেই নাই ‘ক্রেডিট’ টা কার। তখন অস্তিত্বের ব্যাপার, জীবনমরণের ব্যাপার, তখন আমাদের জিততেই হবে, এই পাকিস্তানী শোষকদের তাড়াতেই হবে- এইসবই ছিলো ভাবনা; তখন মুক্তিকামী মানুষেরা সবাই একতাবদ্ধ ছিলো, নাহলে কি ৯ মাসে আমরা ‘সাধারণ’ যোদ্ধারা শোষকদের তাড়াই?
১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত কিন্তু এই তর্কবিতর্ক কিছুই হয়নি। ২০১৬ সালে এসে যদি করতে হয় তো মহা দুঃখজনক।
- এই লেখাটি লিখতেও আমার অহেতুক লাগছে, কিন্তু কিছু মানুষের মাথায় এই বিভ্রান্তিটি এমন জোরালো ভাবে গাঁথা, যে ভাবলাম লিখি।
তাছাড়া, আজকে এই দলিলটুকু দেখে মুচকি একটু হাসিও পেয়ে গেলো; আজকে আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা, CIA,তাদের কয়েক বছরের ব্রিফিং উন্মুক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৯৭১ সাল’ও আছে*। ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ সালের ব্রিফিং-এ লেখা: “The clandestine radio claims that Mujib has proclaimed East Pakistan independent as the People’s Republic of Bangla Desh (the Bengali Nation).” – তখনকার পাকিস্তান-বান্ধব আমেরিকান সরকারও বাকি বিশ্বের মতোই বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতার জনক বলুন, বা ঘোষক, সেভাবেই স্বীকৃতি দিয়েছে; – কারণ সেটা তখনকার মহা সরল একটি সমীকরণ ছিলো!!
আজ এতো বছর পরে সেই স্বাধীন দেশের মানুষগুলোই এই নিদারুণ ধোঁয়াশাতে থাকি, কী অদ্ভুত না ব্যাপারটা??!!?
রনিয়া রহিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্প সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
খোলা কলম ক্যাটাগরির লিখাটি লেখকের একান্ত ব্যাক্তিগত অভিমত এর সাথে সিটিজিবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম এর সম্পাদকীয় নীতির কোন সম্পৃক্ততা নেই। এরদায় লেখকের একান্ত সিটিজিবার্তা২৪ডটকম এর কোন দায় নেবেনা।





