মঙ্গলবার, ০৮ মার্চ ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম : গত ১৫ আগষ্টের ঘটনা । জাতীয় শোক দিবসের প্রোগাম চলছে বিভিন্ন স্থানে । কাজের চাপ একটু কম ।
সবার ছুটির দিন হলেও পুলিশের তো ছুটি বলে কিছু নেই ! তবে এইসব ছুটির দিনে অফিস করলেও সিভিল ড্রেস পরা যায় এইটুকুই যা প্রাপ্তি।
অফিস থেকে দুপুরে খাওয়ার জন্য বাসায় ফেরার আগে চান্দনা চৌরাস্তায় ট্রাফিক বক্সে ঘুরে আসাটা প্রায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । বরাবরের মতো ট্রাফিক বক্সে গিয়ে বসলাম । সার্জেন্ট ইকবাল দায়িত্ব পালন করছিলো । বক্সে বসা ছিলো আমাদের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর(টি.আই) আবুল হোসেন । গিয়ে দেখি বড় একটা ডিশে কাঙ্গালী ভোজের খিচুরী । আমি সাধারণত ট্রাফিক বক্সে খুব বেশি হলে এক কাপ চা খাই । । টি.আই আবুল হোসেন বললেন, স্যার খিচুড়ী খান আমাদের সাথে । আমাদের সবার খাওয়ার জন্য ট্রাফিক বক্সে খিচুড়ী দিয়ে গিয়েছে।
সবার সাথে খেলে আন্তরিকতা বাড়ে । দ্বিমত না করে বললাম, ঠিক আছে । আমার ড্রাইভার, বডিগার্ড সবাই সহ বসলাম খাওয়ার জন্য । প্রস্তুতি শুরু হলো ।
এমন সময় সাথে একটি ছোট ছেলে সাথে নিয়ে একজন মহিলা বক্সে এসে কান্নাকাটি শুরু করলেন ।
”স্যার, আমার বাবা মারা গেছে । আমারে কিছু টাকা দ্যান । আমি বাড়ি যামু ।”
চান্দনা চৌরাস্তায় এমন বহু প্রতারক চক্র ঘুরে বেড়ায় আর মেকি অভিনয় করে টাকা পয়সা কামায় । আমার কিছু সন্দেহ হলো । কান্নাকাটি করলেও চোখে তেমন পানি ছিলনা । সাথের ছেলেটাও কাদঁছে না ।
আমি পরীক্ষা করার জন্য বললাম, আপনি কি করেন ?
গামের্ন্টস এ চাকরী করি স্যার ।
টাকা দিতে পারবো না । সাজের্ন্টকে বলে দিচ্ছি গাড়িতে তুলে দিবে ।
সাধারণত প্রতারক হলে গাড়ীতে তুলে দেয়ার কথা বললে আর কথা না বলে চলে যায় । কারণ প্রতারকদের দরকার টাকা ।
আমাদের অবাক করে দিয়ে মহিলা বললো, স্যার, আমার বাড়ি রংপুর । আমাকে রংপুরের গাড়ীতে তুলে দেন । বাবা মারা গেছেন । সকালে খবর পাইছি । বাড়ি যাবো টাকা নাই । মাসের অর্ধেক আজকে । বেতনও দিবে না ।
খেয়াল করলাম মহিলার চোখ কাদঁতে কাদঁতে শুকিয়ে গেছে । ছোট একটা ভাই নিয়ে বিপদে পড়েছে । সাজের্ন্ট ইকবালকে দায়িত্ব দিলাম তাকে যে করেই হোক রংপুর পৌছাঁনোর ব্যবস্থা করতে হবে ।
হঠাৎ মনে হলো, আরে এরা তো অনেক দূর যাবে । নিশ্চয়ই খাওয়া হয় নাই পিতার মৃত্যুর খবর শুনে ।
বললাম, কোন চিন্তা নাই । আপনি বসেন । সব ব্যস্থা আমরা করছি । আপনি ছোট ভাই সহ কিছু খেয়ে নেন । অনেক দূরের পথ যাবেন ।
সেই খিচুড়ী আমরা পোষাক শ্রমিক মহিলা আর তার ছোট ভাই সহ সবাই মিলে বসে খেলাম । ছোট ভাই টা পেট ভরে খেলো । কিন্তু পোষাক শ্রমিক বোনটি খেতেই পারলো না । খাওয়ার মাঝে হুহু কাদঁছে । এমন পারিবারিক পরিস্থিতিতে খাওয়াও যায় না !
সার্জেন্ট ইকবাল খবর নিয়ে জানালো যে চৌরাস্তা হয়ে রংপুরের গাড়ি যাবে রাতে । সাথে সাথে সিদ্ধান্ত হলো তাকে চন্দ্রায় পাঠিয়ে দেওয়ার যাতে সেখান থেকে রংপুরের গাড়ি পায় । ইকবাল নিজের পকেট থেকে ৪০০ টাকা বের করে মহিলাকে দিলেন । মহিলা ঘটালেন অভুতপূর্ব দৃশ্য ! দৌড়ে এসে পা ধরে সালাম করতে চাইলেন । আমি বাধা দিতেই দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে আমাদের জন্য দোয়া করতে লাগলেন ।
আমার ৫ বছরের পুলিশ জীবনে দেখা সবচেয়ে স্বপ্নময় দৃশ্য । পুলিশের জন্য হাত তুলে কা্ন্নাকাটি করে দোয়া করছেন একজন ।
ভালো লাগায় মনটা ভরে গেলো । একজনকে তো উপকার করা গেলো ! কিছুটা বিস্ময় কাটিয়ে ছবিটা তুলে রাখলাম স্মুতি রাখার জন্য ।
মহিলাকে চন্দ্রা যাওয়ার গাড়িতে তুলে দিলেন সার্জেন্ট ইকবাল।চন্দ্রায় দায়িত্বরত সার্জেন্ট শাহ আলমকে বাকি দায়িত্ব দেয়া হলো ।
চন্দ্রায় পৌছাঁনোর পর রংপুরের গাড়ির কাউন্টার ম্যানেজারকে ফোনে ধরিয়ে দিলেন সার্জেন্ট শাহআলম । আমি সব বললাম । তিনিও খুব ভালোভাবে রেসপন্স করলেন । বললেন, স্যার আপনি চিন্তা করবেন না । আমি আপনার পাঠানো পোষাকশ্রমিক মহিলা ও তার ভাইকে রংপুর পাঠানোর দায়িত্ব নিলাম । সার্জেন্ট শাহআলমও নগদ কিছু টাকা পোষাক শ্রমিক বোনটির হাতে তুলে দিলেন ।
রংপুর পৌছেঁ যাতে জানায় সেজন্য সার্জেন্ট শাহ আলমের দিয়ে দেয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করে কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি ।
”স্যার আপনাদের এই উপকারের কথা সারাজীবন মনে রাখবো ।”
আজ বিশ্ব নারী দিবস । মিছিল, মিটিং, র্যালী, সেমিনার, আলোচনাসভা, টিভিতে টক শো কত কিছুই হবে । এসবের কতটা সত্যিকারের উপকারে আসে জানি না ।
এ্ইসব লোক দেখানো আড়ম্বড়তার মধ্যে নয়. সত্যিকারের ভালো লাগার মানসিক তৃপ্তি কিন্তু বিপদে কাউকে সাহায্য করার মধ্যেই |
যেসব পোষাক শ্রমিকরা জীবনের হাজারও প্রতিকূলতা সত্বেও আমাদের অর্থনীতি সচল রেখেছেন সেই সব পোষাক শ্রমিক বোনদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ।
সাখাওয়াত হোসেন
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার
গাজীপুর ট্রাফিক।
