সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০১৬ বুধবার ০২:১৮ ঘন্টা
বকেয়া পাওনাসহ ৫ দফা দাবিতে খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৭ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা গতোকাল মঙ্গলবার রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালনের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারের পর খুলনার ৯০ দশকের জনপ্রিয় গায়ক এবং সারাদেশে বেনসন এন্ড হেজেস স্টার সার্চ ২০০০ সালে দুই ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া একমাত্র গায়ক আহাতার টিটু কি কারনে সঙ্গীত জগত থেকে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন সে গঠনার কথা জানালেন তার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
আতাহার টিটুর গতোকাল নিজের ফেসবুকের স্ট্যাটাসে জানান কিভাবে রাস্ট্রায়ত্ব পাটকল মিল-কারখানার মালিকদের নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের শ্রমিক মজদুরেরা।
আজ কেনো রাজপথে তারা নিজেদের ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য আন্দোলনে বাধ্য হন। মিল-কারখানার মালিক উদ্বতন কর্মকর্তাদের লোভ লালসার শিকার হতে হয় তাদেরি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের রক্তের শ্রমদিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়ার পরও শ্রমিক মজদুরদের বকেয়া পাওনা থাকে এবং নিজের প্রাপ্য আদায়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সহ্য করতে হয় জেল জুলুমের অমানবেতর নির্যাতন।
গায়ক আতাহার টিটুর স্ট্যাটাসটি নিচে হুবহু সিটিজিবার্তা২৪ডটকম পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।
খুলনার মৌলভীপাড়ায় নানার বাড়িতে আমার জন্ম। বাবার চাকরীর সুবাদে আমার বয়স যখন ২ বছর মা-বাবা আর আমার ছোট ভাই সহকারে চলে আসি প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস্ এর কলোনীতে। ওখানেই আমার কেটেছে শৈশব, কৈশোরের থেকে ৩৫ টি বছর। আমার অস্থিমজ্জা, সমস্ত শরীর বেড়ে উঠেছে পাটকলের শ্রম দিয়ে অর্জিত অর্থের বিনিময়ে। এখনও আমার শরীরের ভেতর থেকে কুষ্টা/পাট এর গন্ধ বেরহয়। আমার বাবা সুপারভাইজার(অফিসার) পদে নিয়োগ পাওয়া স্বত্তেও নিজেকে কর্মকর্তার পদ থেকে প্রমোশনের যায়গায় ডিমোশন করে নিয়েছে শুধুমাত্র নিজেকে শ্রম আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করার জন্য, নিজেকে শ্রমিকের কাতারে নিয়ে আসেন।
আমার নিজের জীবন বলতে আমার কাছে মেহনতি সম্মানিত শ্রমিক ভাই, চাচা, উনারাই আমাদের জীবন। আমার কাব্য, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত সবটাই জুড়ে একমাত্র এই লোকগুলো।উনারাই আমার বাবার হাতে নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছেন। উনাকে সম্মানিত স্থানে পৌছিয়েছেন। এ জন্যেই আমার নিজের কাছে আজ সবকিছুর উর্ধ্বে সর্বপ্রাণ এই মেহনতি শ্রমিক শ্রেণীর মানুষগুলো।
বাবা, ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন… সকল প্রকার ছাত্র আন্দোলন সহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ছাত্রজীবন শেষ করে কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন, সেই থেকেই শ্রমিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত এবং আজ পর্যন্ত শ্রমিকেদের ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য তিনি অকুতোভয় প্রাণ…।
‘শ্রমিক শ্রেনীর হয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই বাঁচতে হয়েছে। আমার বাবাকে জেল, জুলুম, হুলিয়া কাঁধে নিয়ে চলতে হয়েছে সারাটি জীবন। তাকে হুলিয়ার জন্যে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে বছরের পর বছর। জেল খাটতে হয়েছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। সাথে সামরিক বাহিনীর টর্চার, পুলিশের টর্চার, এতো নির্যাতন যা বলার মতোন ভাষা আমার জানা নেই’। “তাকে সিলভারের গামলায় বৈদ্যুতিক সংযোগ লাগিয়ে প্রশ্রাব করানো হতো, পা উপরে ঝুলিয়ে পেটানো হতো দিনের পর দিন, গিরায় গিরায় পেটানো হতো, বরফ চাপা দিয়ে রাখা হতো, গোপনাঙ্গে শুকনা মরিচের গুড়া পর্যন্ত দেয়া হয়েছিলো”। যা কিনা এখনও অমাবস্যা, পুর্ণিমার রাতে ব্যাথা ওঠে, ব্যথায় মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলেন যা কিনা পেইনকিলার দিয়েও মাঝে মাঝে কাজ হয়না। ‘
খুব ছোটবেলা থেকেই মায়ের কোলে চেপে জেলখানার বারান্দায় অগনিতবার গিয়েছি বাবা কে দেখতে। তখন আমার বয়স ৬ বছর আর ছোট ভাইটির তখন ৪ বছর। তখন এক সময় হলো কি, জেল কতৃপক্ষ জানিয়ে দিল পরিবারের কারো সাথে আর দেখা করতে দেবেনা… কতবড় অন্যায় এবং মানবতাহরন করা হয়েছে আমাদের সাথে। পরক্ষনেই আমার মা চলে গেলেন জেলা প্রশাসকের বাসায় উনার সঙ্গে কথা বলতে…। তিনিও অনঢ়, অর্ডার নেই পরিবারের সাথে দেখা করাবার…। খুব আকুতি মিনতি করে চোঁখের জলেও তাকে বোঝানো গেলনা…।
হুট করে আম্মার মনে পড়লো, কোর্টের দোতলায় গেলেতো জেলখানার ভিতরটা দেখা যায়…। সাথে সাথে আমাদেরকে নিয়ে চলে গেলেন কোর্টের দোতলায়, বেশ কিছুক্ষন পর দেখতে পাই বাবা হেটে বেরিয়ে এসে হাঁটছেন জেলখানার উঠোন ধরে। আমরা বেশ কয়েকবার ইশারা করার পর, জেলের একজন কয়েদি, বাবা কে দেখিয়ে দেন আমাদের। অমনি বাবা হাত নাড়েন, ওখানেই ইশারায় কথা হয় আম্মার সাথে অনেকক্ষন। উনাদের ইশারার মাধ্যমে সময় ঠিক হয় সকাল ১০ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত বাবা ঐ যায়গায় থাকবেন, যেদিন ইচ্ছে হবে দেখা হবে কোর্টের দোতলা হতে ঐভাবে ইশারায় একেঅপরের সাথে কথা বলবে। এভাবেই ইশারায় কেটে গেলো জীবনের অনেকটা বছর। স্বামীর আদর-সোহাগ কি জিনিস সেটি বুঝতে না বুঝতেই বৃদ্ধ হয়ে গেলেন আমার আম্মা…। আমাকে এবং আমার ছোট ভাই কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে, আম্মা জানালার গ্রিলটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন সারাটারাত, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস…।
স্বামি হয়তোবা রাতে ঘুমোতে পারবেনা শরীরের ব্যথায়, হয়তোবা তিনি মাটিতেই ঘুমাবে। সেইভেবে মা’ নিজেকেই ইচ্ছে করে কষ্ট দিতেন স্বামীর টানে রাত জেগে জেগে…। এভাবেই কেটে গেলো মায়ের সারাটা জনম…। ঈদ বা ঈদের জামা কাপড় যে বাবা কিনে দেন সন্তানদের, স্বামী যে ঈদের শাড়িটা অন্তত কিনে দেন স্ত্রী কে, এ আনন্দটুকু বুঝিনি আমরা কখনও…। সবকিছুই পুরন করেছেন আমার নানা-নানী…। পরিবারের সবাই মিলে বাবার সাথে এক টেবিলে বসে যে খাবার খেতে হয়, তা বুঝিনি বছর ১০ আগে পর্যন্ত…। বছর ৯ হলো বাবা কিছুটা ঘর নিয়েছেন..।
আমার প্রথম একক এ্যালবাম “সুখ নাই” রিলিজ হবে ১০ দিন পর, সেই উপলক্ষে সাউন্ডটেক কোম্পানীর কর্ণধার সুলতান মাহমুদ বাবুল ভাই প্রেস কন্ফারেন্স কনফার্ম করে ফেললেন, এ্যালবাম রিলিজের ৫ দিন আগে হবে প্রেস কন্ফারেন্স…।
‘সবকিছু কনফার্ম, ২ দিন পর ফোন আসে খুলনা থেকে, শ্রম আন্দোলনের জন্যে বাবা কে ধরে নিয়ে গিয়েছে জেলে…..।’
‘সব ফেলে চলে এলাম খুলনা কোর্টে, জেল থেকে মুক্ত করার জন্যে….।’
‘একজন মেহনতি শ্রমিকের পরিবারের বড় কোন স্বপ্ন দেখতে নেই, জীবনটাই যে ত্যাগের।’
‘এতগুলো কথা বলার একটাই উদ্দেশ্য, একজন মেহনতি শ্রমিকের কষ্ট কেউ বুঝবেনা… বোঝে তার পরিবার এবং সে… একজন শ্রমিক কখন রাজপথে নামে জানেন’..???
“যখন তার পেটে ভাত থাকেনা, সন্তান একমুঠো ভাতের জ্বালায় চিৎকার করে কাঁদে, চিকিৎসার অভাবে চোঁখের সামনে ছটফট করে দাপাতে দাপাতে মারা যায় তাঁর কলিজার আদরের সন্তান…।”
এ যে কত বড় বেদনার, তা কাছে থেকে দেখতে হয়েছে প্রতিনিয়ত… এ কষ্ট উপরতলার মানুষগুলো বুঝবেনা…।
এ জন্যেই বলি, রাষ্ট্রযন্ত্র তুমি মানুষ হও… প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে দেখ একটিবার, পৃথিবী সুন্দর…।

১৭ জুন ২০০০ সালে “বেনসন এন্ড হেজেস্ ষ্টার সার্চ” বেষ্ট ভোকালিষ্ট এবং বেষ্ট সলো আর্টিস্ট, এই দুইটি এ্যাওয়ার্ড বিজয়ী আতাহার টিটু পপ সঙ্গীতের গুরু প্রয়াত আজম খানের হাত থেকে পুরষ্কার গ্রহন করছেন।
বেনসন এন্ড হ্যাজেস স্টার সার্চ ২০০০ সালের বেস্ট সলো ভোকালিস্ট এবং বেস্ট সলো আর্টিস্ট চ্যাম্পিয়ন।
উল্লেখ্য এই দুই ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন এবং দেশের ব্যান্ড সঙ্গীত জগতে ৯০ দশকের লিজেন্ডদের মিক্সড এ্যালবাম এবং বাংলাদেশের পপ সঙ্গীত জগতের গুরু প্রয়াত আজম খানের কাছ থেকে সীকৃত এ গায়ক আজ বড় অভিমানী সেই যে খুলনায় ফিরে গেছেন বাবার গ্রেফতারের সংবাদে আজো ফিরেনি সঙ্গীতের জগতে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীত জগতের লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু ভাই থেকে শুরু করে অগনীত ভক্তরা যার মাজে আমি নিজেও এখনো তার পুরনো গান শুনে কবে প্রিয় আতাহার টিটুর নতুন গান শুনতে পাবো কবে হবে তার সঙ্গীত জগতে প্রত্যাবত্তনের পথ চেয়ে আছে সকল ভক্তের মনে।
মাহাবুবুল করিম
প্রকাশক: www.ctgbarta24.com
ইমেইল : ctgbarta24.com@gmail.com
