চট্টগ্রামে গন্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন।
রাশেদুল করিম, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
শনিবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৬ ১৭:৩৫ ঘন্টা

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে শনিবার বিকেলে ‘গন্ডামারা বাঁচাও আন্দোলন কমিটি’র’ নেতাদের সাথে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখছেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। গন্ডামারা বাঁচাও কমিটির সমন্বয়ক সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি : আজীম অনন সিটিজিবার্তা২৪ডটকম।
চট্টগ্রাম : বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারা ইউনিয়নে এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বিরোধকে ঘিরে সংঘর্ষে ৪ জন গ্রামবাসীর নিহতের ঘটনায় ইউএনও শামসুজ্জামান এবং ওসি স্বপন কুমার মজুমদারের প্রত্যাহারের স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘জনগনের ক্ষতি করে কোনো পাওয়ার প্ল্যান্ট হবে না। পর্যাপ্ত ক্ষতিপুরণ ছাড়া কাউকে তাঁর জায়গা থেকে সড়ানো হবে না। কোনো প্রকার কারো ক্ষতি করে উন্নয়ন নয়। জনগনের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই উন্নয়ন হবে।’
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে গন্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের সাথে অনুষ্ঠিগ এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয়দের দাবীর প্রেক্ষিতে তিনি তাদেরকে আশ্বস্থ করে এসব কথা বলেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ১ হাজার ৫০ একর খাস জমি ১ টাকা মূল্যে লিজ দেওয়ার প্রস্তাব পাঠায় উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ও বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকার মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে। এরপর হাদির পাড়া সাইক্লোন সেন্টার মাঠে সমাবেশের ডাক দেয়। আগে থেকে কোন ঘোষণা ছাড়াই ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশকে গুলির নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে সংঘর্ষে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের মামলার আসামি করে হয়রানি করে ওসি। থানায় লাশ রেখে আহতদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের।
গন্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি শওকত চাটগামী বলেন, বাঁশখালীতে হত্যাকাণ্ডের এতোদিন পর আপনারা আমাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বসেছেন। বাঁশখালীর সাধারণ মানুষের এই আলোচনা আগে করা হলে ৪ জন গ্রামবাসীর প্রাণ হারাতে হতো না।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে শনিবার বিকেলে গন্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের সাথে জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় সভায় স্থানীয়দের প্রতিনিধি হয়ে অভিযোগ তুলে ধরেন গন্ডামারা ইউনিয়নের এক বাসিন্দা।
শওকত চাটগামী বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বাঁশখালীর ইউএনও এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়ী। তারা জনবান্ধব কর্মকর্তা নন।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মাস্টার মফজল আহমদ বলেন, ঘটনার দিন ৪ এপ্রিল বাঁশখালী থানার ওসি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই জনগণের ওপর গুলি করা হয়েছে। গুলিতে ৪ জন গ্রামবাসী নিহত হয়েছেন। আমরা সারা রাত লাশ নিয়ে উঠোনে বসে থাকলাম। কিন্তু প্রশাসনের কেউ এলেন না। এমনকি ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিতেও কেউ আসেননি। আমরা নিজের কাঁধে করে লাশ থানায় নিয়ে গেলাম। ময়নাতদন্তের হলো, হাজার হাজার মানুষ নিয়ে জানাজা হলো। কিন্তু একজন চেয়ারম্যান, মেম্বর এমনকি সংসদ সদস্যও জানাজায় অংশ নিলেন না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওসির সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে ডিসি বলেন, আপনাদের হৃদয়ের কথা শুনেছি। সেখানের অবস্থা এত খারাপ সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। কারণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাঁশখালী থানার ওসি বিষয়টি তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে আগেই মতবিনিময় করলে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতো না উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণ্ডামারায় যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হচ্ছে সেটি বেসরকারি অর্থায়নে হচ্ছে। তারা জায়গাও নিজেদের মতো করে কিনেছে। সরকারের সঙ্গে কোন সম্পৃক্ততা নাই। যেহেতু সেটি একটি উন্নয়ন প্রকল্প তাই প্রকল্পটি হোক সেটা সরকার চায়।
জেলা প্রশাসক বলেন,‘ প্রথমে আমরা বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি গণ্ডামারায় জমির মালিকরা প্রকৃত মূল্য পায়নি। মাঝখান থেকে কিছু বাটপার-দালাল টাকা নিয়ে গেছে। ফলে আপনাদের মনে ক্ষোভ জন্মেছে। বিষয়টি এখন আমরা পরিস্কার বুঝতে পারছি।’
গণ্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনে দেওয়া ৯ দফা দাবির প্রথম দাবির বিষয়ে ডিসি বলেন, পুলিশ আর কাউকে গ্রেফতার করবে না। এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত দিয়েছি। এছাড়া যারা গ্রেফতার আছে তাদের জামিন চাইলে জামিনের ব্যবস্থাও আমরা করে দেব। এছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
জনগণকে সন্তুষ্ট রেখেই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। এ কেন্দ্রের জন্য কোন গভীর নলকূপ করতে পারবে না। কারণ এখানে মিঠা পানির সংকট আছে সেটা আমরা জানি। প্রকল্পের জন্য সাগর থেকে পানি এনে পরিশোধন করে ব্যবহার করবে।
প্রয়োজনের বেশি খাস জমি এস আলম গ্রুপ নিয়ে নিচ্ছে এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনের বেশি খাস জমি প্রকল্পের জন্য নেওয়া হবে না। বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করবো। এছাড়া যাদের থেকে নেওয়া হবে তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এলাকাবাসীর দাবি পূরণে জেলা প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারাও সরকারকে সহযোগিতা করবেন।
গণ্ডামারা ইউনিয়ন বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের বক্তব্য দেখে মনে হচ্ছে এটি প্রাইভেট হলেও সরকারের। তাহলে জনগনকে কেনো বোঝানো হলোনা। হাজার মানুষের জীবন জীবিকা ওই এলাকার উপর নির্ভর করে। কোন যুক্তিতে ওই ১ হাজার ৫০ একর জমি লিজ দেওয়ার প্রস্তাব করা হলো। এমন প্রস্তাব কিসের ভিত্তিতে ? কারা পাঠালো? কারা ওই দিনের পরিস্থিতি তৈরী করলো? ’
তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে গুলি করে, অন্যদিকে ১৪৪ ধারা জারি করবে তা হয়না। যারা আইনের ইমপ্লিমেন্ট করবে তাদের মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ ছিলো। সমাবেশ হতেই পারে তাঁরা কি ডাকাত ? ওই স্থরের কর্মকর্তাদের নিয়ে আমার মন্তব্য করা মানায় না। জেলা প্রশাসক মহোদয় আছেন তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।’
এসময় তিনি গ্রেপ্তারকৃতদের ছেড়ে দেয়াসহ গণ্ডামারা ইউনিয়ন বাঁচাও আন্দোলন’র ৯ দফা মেনে নেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিন ধরনের ছাড়পত্র দেখানো ও জনগনের সকল অভাব অভিযোগ পুরনের আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে দেয়া হবেনা।’
সভায় গণ্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত মর্তুজা আলী ও মো. আনোয়ারের বড় ভাই বদি আহমেদ বলেন, আমি আমার ভাই হত্যার সঠিক বিচার চাই। আমার দুই ভাই নিহত হলো অথচ আমার ছেলে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেল।
সভায় গণ্ডামারা বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, এনামুল হক মানিক, আব্দুল মালেক, আব্দুর রহমান, সরল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুর রশিদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/ অনন/ জেএ / আরকে
