৮ মাত্রার ভূমিকম্প, ১০ মাত্রার হার্ট!
পাঠকর আরো জানতে বিস্তারিত এখানে পড়ুন :
https://www.ctgbarta24.com/2016/04/16/ভয়াবহ-ভূমিকম্প-ঝুঁকিতে-চ/
আমি জীবনে প্রথম ভুমিকম্পের সাথে পরিচিত হই ১৯৮৯ সালে। আমি তখন যশোহরে একটা স্কুলে পড়ি। একদিন দুপুর বেলা- আমি এক বন্ধুর বাসায় বসে দাবা খেলছি। হঠাত কেঁপে উঠলো ঘরটি-যার এক পাশের কোনা বহুবছর ধরে ধসানো ছিল। দেখলে মনে হতো ইটগুলো ঝুলে ঝুলে পড়ছে। সেদিনও ভবনটির কিছু হয়নি। তারপর জীবনে অসংখ্যবার ভুমিকম্পের সাথে সাথে নিজেও দুলেছি। কখনো কোন অঘটন ঘটেনি।
ভূমিকম্পের সাথে আমার দ্বিতীয়বার পরিচয় হয় ২০০৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী। ঢাকা থেকে সবে সাউথ ইস্ট লন্ডনের উলউইচ নামক একটি পাহাড়ি অঞ্চলে একটি রুম ভাড়া নিয়েছি। একদিন রাতে হঠাত লক্ষ করছি দোচালা বাড়িটি এদিক ওদিক দুলছে। মাথার ওপর ঝুলানো একটা বাল্ব দেখে মনে হলো এটি বৈশাখ মাস। বৈদ্যুতিক বাল্বটি পাকা আমের মতো দুষ্টু ঝড়ের কবলে পড়েছে। একবার মনে হলো, কাঠের বাড়ি বলে কেউ হয়তো পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে। বেশ ভৌতিক একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষন পর থেমে গেলো। সেদিনও আমি খুব বেশি ভয় পাইনি। সকালে বাইরে বের হয়ে জানলাম, এটি ছিল মাঝারি মানের একটা ভূমিকম্প।
লোকে বলে, ব্রিটেনে কোন ভুমিকম্প হয় না। কথাটা সঠিক না। হয়তো কম মাত্রার ভুমিকম্প হয় বলে এই ধারনাটা তৈরী হয়েছে। অথচ আমার কাছে মনে হয়েছে লন্ডন হচ্ছে একটি ভুমিকম্পের শহর-যেখানে কাটিয়ে দিয়েছি পাঁচ বছরের বেশি। বলা চলে লন্ডন শহর প্রতিনিয়ত কাঁপছে। এর মুল কারন আন্ডারগ্রাউন্ড টিউবগুলোর প্রতি মুহুর্তে ছুটে চলা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক কারনে। আর বেশিরভাগ বাড়িঘর গুলো হচ্ছে কাঠের তৈরী। ফলে দুই তিন মাত্রার কম্পনের ফলেও সেগুলো ছোট্ট শিশুর মতো হেলে দুলে নেচে ওঠে। টিউব সার্ভিসের কারনে বোঝাও মুশকিল কোনটা প্রাকৃতিক ভুমিকম্প আর কোনটা ম্যান মেইড প্রযুক্তিগত ভূমিকম্প। তবে সিসমোগ্রাফের ভাষায় হিসাব করলে দেখা যাবে, সেগুলো গড়ে চার মাত্রার ভূমিকম্প। ব্রিটেনে সারা বছর গড়ে তিনশটি ভূমিকম্প হয় বলে তথ্য রয়েছে। লন্ডনের এই অভিজ্ঞতা আমার ঢাকায় বেশ ফল দিচ্ছে।
আরো পড়ুন :
https://www.ctgbarta24.com/2016/01/05/বড়-ভূমিকম্প-মোকাবেলায়-অপ/
বাংলাদেশের আধুনিক মানুষগুলো ভূমিকম্পের সাথে মুলত পরিচিত হয়েছে ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। সেদিন সিকিমে ৬.৮ মাত্রার ভুমিকম্পের কারনে ঢাকাসহ দেশের অনেক অঞ্চল ব্যাপক ঝাঁকুনির মুখে পড়ে। আর সেদিনকার ভূমিকম্পটাই বলা চলে, বাংলাদেশের মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে একটা নতুন ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়।
আর তারপর থেকে প্রতিযোগিতা চলছে ভূমিকম্প নিয়ে কার গবেষনা, কার আতঙ্ক আর ভয়ার্ত পরামর্শ কতটা চটকদার এবং শীর্ষে। গবেষনা আর পরামর্শের ফাঁকে ফাঁকে আতঙ্ক না হলে-সেটা আবার খবর হয় না।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত আরো সংবাদ এ লিংকে পড়তে পারেন :
২০১১ সালের পর থেকে দেশের মানুষ, বিশেষ করে ঢাকার বাসিন্দারা এক ধরনের আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করছে। তবে আমার বিশ্বাস আতঙ্কের পাশাপাশি তাদের মনটাও আস্তে আস্তে শক্ত হচ্ছে। ডাউকি ফল্টে যেমন শক্তি বাড়ছে। একই হারে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে আমাদের মনেও। তা নাহলে এতো বড় বড় ভূমিকম্পের পরও মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারতো না।
আমার দশ বছরের মেয়েটি আগে কান্নাকাটি করতো। ভয়ে কাঁপতো। গত দুটি ভূমিকম্পের সময় মনে হলো তার অস্থিরতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন ভূমিকম্প হোক আর না হোক-সে মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হচ্ছে বলে মনে করে একটা বালিশ নিয়ে দৌড়ে বীমের নিচে চলে যায়। আমরা বাসার ভেতর তিনটা জায়গা চিহ্নিত করেছি। গত দুটি ভূমিকম্প হয়েছে রাতে-ফলে আমরা সবাই বাসায় ছিলাম। এক সাথেই আমরা আমাদের চিহ্নিত জায়গায় গিয়ে আমি সবাইকে ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি। আমরা কখনো দৌড়ে রাস্তায় কিংবা দরজা পর্যন্ত খুলিনি। আমি সবাইকে এক জায়গায় নিয়ে বলতে থাকি-কিচছু হবে না। আমাদের ভবনটি ভেঙ্গে পড়লে ঢাকার ৯০ ভাগ ভবনই ভেঙ্গে পড়বে। মারা যাবে লাখ লাখ মানুষ। এতো মানুষ যেখানে মরবে, সেখানে আমাদের বাঁচতে ইচ্ছা হবে না। কাজেই মরতে হলে নিজেদের ঘরে, আরাম আয়েশেই মরবো। হুড়ো হুড়ি করে বাইরে পরের ঘরের নিচে, সরকারি নড়বড়ে বৈদু্্যতিক খুঁটি আর তারের নিচে পিষ্ট হয়ে মরার কোন দরকার নেই।
আমার বাসার দেয়াল কিংবা উচুঁ কোন স্থানে এমন কোন বস্তু নেই-যা মাথার ওপর পড়তে পারে। আমি আমার বাসাটিকে অযথা ফার্নিচারের দোকান বানাতে চাইনি। একান্ত দরকারি জিনিস ছাড়া আমার বাসায় অযথা আসবাবপত্র নেই। ইচ্ছে মতো আমরা ঘরের ভেতর দৌড়াদৌড়ি করতে পারি।
বিস্তারিত আরো সংবাদে পড়ুন :
https://www.ctgbarta24.com/2016/04/19/ভূমিকম্পের-আতঙ্কে-চট্টগ্/
এখন আমাদের মনের জোর ডাউকির জোরের চেয়েও বেশি মনে হয়। ডাউকিতে যদি থাকে ৮ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী কম্পন শক্তি, তো আমাদের মনে আছে ১০ মাত্রার চেয়েও বেশি। দেখা যাক-কার জোর কতটুকু! মরলে মরবো-এই সুন্দর বাংলাদেশে!
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম/শ.ই.জী/ এমকে

