একজন জুলহাজ মান্নান আর আপনার মোমবাতি

ctgbarta24.com
Share

রনিয়া রহিম: আমি গতকাল কোথাও বসে আছি, আশপাশে একটি সমকামী যুগল ছিলো। আমার ঠিক পাশেই ছিলো, তাদের কথোপকথন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। একটু পর আমি নিজেও আড্ডাতে যোগ দিলাম। বেশ মজার মানুষ তারা, বুদ্ধিদীপ্ত কথার পিঠে কথা, তার মাঝেও একে অন্যের প্রতি টান সুস্পষ্ট; বেশ মিষ্টি লাগছিলো আমার এই যুগলটাকে।

আমি আমেরিকায় যখন আসি, যে বয়সে আর যে দশকে আসি , সব মিলিয়ে কোনটা এদেশীয় নরমাল আর কোনটা না, একদম শুরুতে ঠাহর করতে পারতাম না। বাংলাদেশে যেমন একটাই ক্লাসরুম, শিক্ষকরাই যেতেন আর আসতেন! আমেরিকান হাইস্কুল কলেজ/ইউনিভার্সিটির মতো; এক ক্লাসের পর আপনাকেই কক্ষ পাল্টাতে হয়, একেক শিক্ষকের ক্লাসে ক্লাসে যেতে হয়। সব সহপাঠীর সব ক্লাস একসঙ্গে থাকে না; কাউকে কাউকে কমন পাবেন, অনেককেই আবার না।
আমাদের সবাইকে নিজস্ব একটা লকারও দেয়া হতো, যেন সারাক্ষণ ভারী ভারী সব বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতে না হয়। আমার লকারটা সে বড় স্কুলে এমন একটা স্থানে ছিলো যে প্রত্যেকটা ক্লাসের পর যাওয়া পোষাতো না, সময়ে মিলতো না, তাই লাঞ্চ ব্রেক আর স্কুলছুটিতে যেতাম।
স্কুলছুটিতেই তাড়া থাকতো সবচাইতে বেশি। আমাকে বাস ধরতে হবে, ৫/১০ মিনিটে না পৌঁছালে ছেড়ে চলে যাবে; গাড়ি চালাবার বয়স না আমার, থাকলেও প্রথম প্রথম আমেরিকায় আসার সুবাদে সে সামর্থ্য আমাদের পরিবারের নেই বাড়তি গাড়ি কিনবার। বাবা তখন কাজে ব্যস্ত, আমাকে নিতে আসার সুবিধা নেই। অতএব, ঐ বাসটাই ভরসা- মিস করা যাবে না কিছুতেই!!
আমার ঠিক পাশের লকারটাই ছিলো আমেরিকান টিনএজ সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে অপরূপ আকর্ষনীয়া এক কন্যার! সোনালী চুল, হালকা নীল চোখ, চিকনী চামেলি চিয়ারলিডার স্কুলের আমেরিকান-ফুটবল গ্রুপের। তার বয়ফ্রেন্ড তার জন্য একেবারে পারফেক্ট: সে হচ্ছে ফুটবল প্লেয়ারদের একজন, এধরণের জুটি হাইস্কুলে একদম ম্যাচ মেইড ইন হেভেন!
ওদের জুটি নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই; সমস্যা হতো যখন স্কুলশেষে ছেলেটা প্রতিদিন সেই মেয়েটার লকারে আসতো, তার ঠোঁট/দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো, আর সেই তুমুল ভালোবাসার সুনামী আমার মতো গোবেচারা মানুষের লকারের উপরেও এসে পড়তো!! – অনেক সময়ে দেখা যেতো যে আমি আমার লকার খোলার সুযোগই পাচ্ছি না, তাদের উন্মাতাল চুম্বন চলছে ঠিক আমার লকারের সামনেই, আমি যে তালা পর্যন্ত পৌঁছাবো সে নাগালই পাচ্ছি না!! আর এদিকে আমার বাস মিস হয়ে যেতে পারে, আমি কি করি, কি করি???
তখন আমার বয়স ১৪, আমি আমেরিকায় এসেছি মাত্র দুই তিন মাস! আমি এখন বুঝি যে এদেশে পাবলিক চুম্বন ভ্রুকুটির কারণ না হলেও, সময় এবং স্থান কমবেশি সবাই মেনে চলে। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে দিতো রামধমক: তোমরা বাবাজি যা খুশি তাই করো আমার অসুবিধা না করে!- কিন্তু আমি ভাবতাম, এটাই যদি এখানকার “নরমাল” হয়, তাহলে আমি উড়ে এসে জুড়ে বসা কে যে তাদের থামাই ?? তাই, কি করি, গাধী আমি, অস্বস্তি নিয়ে বহুদিন এমন হয়েছে দাঁড়িয়ে আছি আমারই লকারের সামনে, তাদের প্রেমাতাল ঝড় থামবার প্রতীক্ষায়! আর তারাও পেয়ে গেছে মজা, আমি যেহেতু কিছুই বলি না, অতএব, করো যা খুশি তা!!

এই আমেরিকান প্রেম/সমাজের সমীকরণেই আমার প্রথম সমকামের সাথে পরিচয়। নব্বই দশকের শেষে আর দু’হাজারের শুরুতে খোদ আমেরিকানরাই, বিশেষ করে বেটার না জানা বাচ্চারা, গালি বা ক্ষেপানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো সমকাম-সংক্রান্ত শব্দ। (এখনো অনেকেই করে; সচেতন সমাজেও প্রেজুডিস যেতে সময় লাগে)। আপনিও সবার সাথে মিশে যাওয়ার প্রয়াসে সে গালি নিজে না দিলেও প্রতিবাদও করছেন না, পাছে উল্টো আপনাকেই পরে ক্ষেপানো হয়!
আমিও সেখানেই ছিলাম একসময়! বিপরীত লিঙ্গের পাবলিক চুম্মাচাটি দেখতে যেমন বিব্রতবোধ করতাম, কিন্তু পাছে কোন “নর্ম” ভেঙ্গে ফেলছি তাই কিছু বলা উচিত হবে কিনা বুঝতাম না, সেরকমই দ্বিধা ছিলো আমার সমকামী যুগলদের নিয়ে। – কিন্তু সেসব তো বহু, বহু বছর আগের কথা! টিনএজ বয়সে যদি উটপাখির মতো মরুতে মাথা গুঁজে থাকি, বড় হয়েও যদি একই কাজটা করি সেটা কি মানায়??
বড় হতে হতে কতরকম প্রশ্ন আসলো মনে! বিজ্ঞান থেকে ধর্ম…, কিন্তু সব ছাপিয়ে গেলো আশপাশের মানুষকে দেখা, চেনা, বোঝা। এই লেখাটি কোন বিতর্কের জন্ম দেয়ার অভিপ্রায়ে লিখছি না, ভালো/মন্দ/জায়েজ কি জায়েজ না সে আলোচনার জন্যেও না। এই আমেরিকাই আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে লেবেলের মুখোশটা সরিয়ে মানুষটাকে দেখার, আর সেই বোধটাই আমার লেখালেখিতে ছড়িয়ে দেয়ার এক ছেলেমানুষী সাধ আমার! আমার মেশার সুযোগ হয়েছে অনেকের সাথে; আমি প্রেজুডিস যেমন দেখেছি, সামাজিক অন্যায় থেকে মানসিক নিপীড়ন দেখেছি, আর দিনশেষে দেখতে আর বুঝতে শিখেছি, সবাই আসলে একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতেই তো চাইছে নিজের মতন! কেউ যদি কারো সমস্যা না করে থাকি তাহলে সে সুযোগটুকু কেন রোধ করে দেবো আমার আশপাশের মানুষের? না, এটা আমার দয়া বা মহানুভবতা নয়, এটা এই ভাগযোগ করে থাকা পৃথিবীতে আমাদের প্রতিটা মানুষেরই অধিকার!!
received_m_mid_1461735409288_a0b572df9ff98ae597_0
আমি আজকের আগে কখনও জুলহাজ মান্নানের নাম শুনিনি। আজকে যে প্রেক্ষিতে শুনলাম সেটা বড় বেদনার: তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, খুব সম্ভবত তাঁর এই “অপরাধে” যে তিনি সমকামীদের স্বাধিকারের স্বপক্ষের শক্তি ছিলেন।
এই কুপিয়ে হত্যা করা কি এখন নতুন কিছু বাংলাদেশে?? একটা লেবেল দিয়ে দেবেন, আর কোপ বসানো খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে! নাস্তিক, সাধু, প্রফেসর…. সর্বশেষ: সমকামীদের পত্রিকার সম্পাদক!
এইসব খবর দেখতে দেখতে যখন প্রচন্ড হতাশ লাগছিলো, যখন দেশপ্রধানও কঠোর অবস্থান নিতে নারাজ, যখন দিনে দিনে বৃদ্ধি পাওয়া এই একই ধাঁচের হত্যাগুলোকে “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” হিসেবেই বারবার আখ্যায়িত করা হয়, তখন এই অপারগ হাহাকার বোধ না করাই অস্বাভাবিক। প্রথমে ভেবেছিলাম কিছুই লিখবো না – কি হবে লিখে?- তারপর একজনের একটি বাক্য পড়ে একটু হলেও আশান্বিত হলাম:
“When the heroes fall, speak of what they stood for. Don`t get cowered by Death, get inspired by their lives instead!”
একজন জুলহাজ মান্নান সবাইকে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা শেখাতেন, সেটাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিলো আর সেটাই তাঁর রেখে যাওয়া লিগাসি! সন্ত্রাসীদের কোপ ছিলো তাঁর লেবেলের প্রতি, সেটার বাইরে গিয়ে তাঁকে দেখুন; আশপাশের সব মানুষগুলোকেই দেখুন, – আপনার মত করে আপনি যতদুর পারুন আরেকজনকে সুযোগ করে দিন তাঁকে তাঁর সম্মানটুকু নিয়ে বাঁচতে!!
চারপাশে যখন শ্বাসরোধ করা আশাহীন অন্ধকার, আপনার মত করে আপনি মোমবাতিটা জ্বালতে থাকুন; এর বেশি “ট্রিবিউট” আপনি বা আমি কীই বা দিতে পারি, বলুন!?

 রনিয়া রহিম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সত্যিকারের গল্প গুলো সংগ্রহ এবং প্রচারেক তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

সিটিজি বার্তা ২৪ এ প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ

“রাজধানীতে বাড়ছে অনৈতিক সম্পর্ক”... পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিউজডেস্ক, সিটিজিবার্তা২৪ডটকম সোমবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৬ অনৈতিক সম্পর্কের প্রতীকি ছবি সংগ্রহীত রু...
ফটিকছড়িতে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, ২৪ এপ্রিল ২০১৬, রোববার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির (৫০) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উপজেলার ভূজপ...
ফটিকছড়ির ১৪ ইউপির নির্বাচনে নৌকা ১১, বিএনপি ১ ও স্বতন্ত্র ২ প্রার্থীর জয়... Description Description Description Description Description Description গতকাল শনিবার ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে  ২নং দাতমারা ইউ...
ফটিকছড়ি আ‘লীগের ৭, স্বতন্ত্র ৩ ফটিকছড়ি প্রতিনিধিঃ  ফটিকছড়ির ১০ টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আ‘লীগের ৭, স্বতন্ত্র ৩ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। শনিবার ভোটে আ.লীগের নৌকার ৭ প্রার্থী বিজয়ী হয়...
বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রামের অভিষেক ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ... Description Description Description আনোয়ারুল আজীম অনন ● চট্টগ্রামঃ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ...



Leave a Reply