মাহাবুবুল করিম। ৭ জুন ২০১৬
চট্টগ্রামে অপরাধ নিয়ন্ত্রনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়িত করেন এসপি বাবুল আক্তার। রবিবার (৫ জুন) সকালে জিইসিতে সেই পুলিশ সুপারের স্ত্রী কে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার দু’দিন পার হলেও শনাক্ত করা যায়নি খুনিদের। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ অস্পষ্ট থাকায় খুনিদের ব্যাপারে এখনো অন্ধকারে পুলিশ। খুনিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে সন্দেহভাজন চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সিটিজিবার্তা২৪ডটকমে গতকাল থেকে সিসিক্যামেরায় অস্পস্ট ফুটেজ সংবাদ প্রকাশের পর ভিডিওটি দেখে ভাবলাম নিশ্চয় তথ্যগুলো পুলিশের তদন্তের কাজে আসতে পারে।
খুনের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে :
১/ সিসিক্যামেরার ভিডিওতে কালো চিহ্নের মাঝে যে ছেলেটা ও কিন্ত ওয়েল পার্কের দিকে তাকিয়ে আছে, ওয়েল পার্কে কি কোন সিসিক্যামেরা নেই?
২/ মোটরসাইকেল টা কিন্তু গোলপাহাড় এর দিকে যাচ্ছে। গোলপাহাড় মোড়ে কিন্তু ৪টা সিসিক্যামেরা আছে। ওগুলোতে কি পাওয়া যাই না মোটরবাইক ওয়ালারা কারা?
৩/ ভিডিওটিত দেখা যায় মোটরবাইকের পিছনে কিন্তু একটা মাইক্রো আসছে। হোন্ডার পেছনে পেছনে কিন্ত মাইক্রো টা চলে যাচ্ছে। সেই মাইক্রো টা ও কি সন্দেহের তালিকায় পড়ে না?
৪/ মোটাবাইক টা তো জিইসির মোড় দিক থেকে আসছে। যদি এইটা ২নাম্বার গেইট দিয়ে আসে তাহলে হোটেল লর্ডস ইন এর সিসিক্যামেরা আছে। যদি ওয়াসা দিয়ে আসে তাহলে হোটেল পেনিনসুলার সিসিক্যামেরা আছে। আর ফয়েসলেক দিয়ে আসলে তো ইউএসটিসি এর সিসিক্যামেরায় নিশ্চয় ধরা পড়বে। প্রিমিয়ারের ক্যামেরা দিয়ে মুখ ঝাপসা দেখালে ও অন্যসব ক্যামেরা দিয়ে কি ঝাপসা দেখাবে?
আর একটা বিষয় লক্ষ্য করার যে হত্যাকান্ডের ঘটনার সময় কিন্তু কোন যানবাহনের চলাচল দেখা যাচ্ছে না। ঘটনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে কিন্তু সেই মাইক্রোটার পেছনে অন্য গাড়ি আসা শুরু হয় আপনাদের কি মনে হয় না মাইক্রোটা অন্য গাড়ি গুলোকে আটকিয়ে রাখে ঘটনার আগে থেকে?
এদিকে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার হলেও নাম্বার প্লেটে ব্যবহারর করা নম্বরটি ভুয়া এবং সেটির প্রকৃত মালিককে পাওয়া যায়নি। উদ্ধার করা যায়নি নিহত মাহমুদা খানম মিতুর মোবাইল ফোনটিও। এ ফোনেই খুনিরা ভুয়া খুদে বার্তা পাঠিয়ে মিতুকে নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘর থেকে বের করে এনেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এদিকে, হত্যার পর রাতে পাঁচলাইশ থানার এক এসআইকে দিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে মামলার করার সিদ্ধান্ত হলেও গতকাল বাবুল আক্তার নিজে বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করছি। বাবুল আক্তার এর আগে যেসব অপরাধীকে গ্রেফতার করেছেন, তারা কেউ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিনা কিংবা কারাগারে বসে এর পরিকল্পনা করেছে কিনা, তাও তদন্ত করছি।’
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘খুনের ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাত তিন ব্যক্তিসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি গভীরতর তদন্তের স্বার্থে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের নম্বর ভুয়া:
পুলিশের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটে রয়েছে ‘চট্ট মেট্রো-ল-১২-৯৮০৭’। বিআরটিএ চট্টগ্রাম কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, এই নম্বরের গাড়ির মালিকের নাম মো. আবদুর রহিম। পিতা-মৃত সৈয়দ আহমেদ। ঠিকানা-১৮/১৯ টেরিবাজার, সিটি টাওয়ার, চট্টগ্রাম। ২০১৪ সালে মোটরসাইকেলটির নিবন্ধন করা হয়।
জানতে চাইলে নিজেকে টেরি বাজারের কাপড়ের ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে আবদুর রহিম বলেন, ‘আমার গাড়ি আমার কাছে রয়েছে। কেউ হয়তো আমার গাড়ির নম্বর ব্যবহার করেছে।’ তাঁর গাড়ির নম্বর ব্যবহার করে এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে দুর্বৃত্তরা খুন করার কথা তিনি জানেন না।
পুলিশের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন নম্বর (আইপি ৫০ এফএমজি-২-এ-১২৯৯৪৬৫) এবং চেসিস নম্বর হলো (বিআরবিএই-১০১০০০০৪২)। বিআরটিএ নিবন্ধন অনুযায়ী মোটরসাইকেলটি নম্বর হচ্ছে চট্ট মেট্রো-হ-১৩-১৫৯৭। অথচ ঘটনার দিন দুর্বৃত্তরা গাড়িটিতে অন্য নম্বর প্লেট (চট্ট মেট্রো-ল-১২-৯৮০৭) ব্যবহার করেছিল।
বিআরটিএ নিবন্ধন অনুযায়ী চট্ট মেট্রো-হ-১৩-১৫৯৭ নম্বরের মোটরসাইকেলটির মালিক নগরীর জামাল খান এলাকার মৃত গোলাম শরীফের ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন। ২০১০ সালে গাড়িটি নিবন্ধন করা হয়। জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১১ সালে এক দালালের মাধ্যমে তিনি মোটরসাইকেলটি ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এরপর তিনি গাড়িটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক আবদুল করিম গতকাল তাঁর কার্যালয়ে বলেন, পুলিশের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটের সঙ্গে ইঞ্জিন চেসিস নম্বরের মিল নেই। অন্য একটি গাড়ি নম্বর এতে লাগানো হয়েছে। নম্বর প্লেট ভুয়া হলেও গাড়ির ইঞ্জিন চেসিস নম্বর দিয়ে প্রকৃত মালিকানা যাচাই-বাছাই করা যায়।
আবদুল করিম আরও বলেন, মোটরযান আইন অনুযায়ী মালিকানা হস্তান্তরের ৩০ দিনের মধ্যে ক্রেতাকে মালিকানা পরিবর্তনের জন্য এবং বিক্রেতাকে ১৪ দিনের মধ্যে তা বিআরটিএকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। মালিকানা হস্তান্তরের পর ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ তা না করে থাকলে প্রথমে গাড়িটি যাঁর নামে নিবন্ধন হয়েছে, তাঁর নামই থাকবে বিআরটিএ নথিতে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার মো. ইকবাল বাহার বলেন, আইন না মানাটা অপরাধ। কেন বিক্রির পর বিক্রেতা বিষয়টি বিআরটিএকে জানাননি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আবার কেনার পর অপরাধ করার উদ্দেশ্যেও কেউ বিআরটিএতে নিবন্ধন না করাতে পারেন।
গত নয় মাসে জঙ্গিদের আস্তানা থেকে নিবন্ধনহীন দুটি মোটরসাইকেল ও একটি ভুয়া নম্বর প্লেট উদ্ধার করে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ।
মিতুর মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠাল কে?
নিহত মিতুর মোবাইলটি উদ্ধার না হওয়াতে এখনও অনেক রহস্য অজানা তদন্তকারীদের কাছে। মোবাইল ফোনটিতে গত শনিবার রাতে মিতুর ছেলে মাহিরের স্কুল থেকে খুদে বার্তা দেওয়া হয়।
প্রতিবেশী কয়েকজন নারী জানান, মিতু শনিবার রাতে তাদের সঙ্গে আলাপের সময় বলেছিলেন, স্কুল থেকে খুদে বার্তা দিয়েছে, রবিবার স্কুলে সমাবেশ আছে, তাই স্কুলবাস তাড়াতাড়ি আসবে।
তবে এ ব্যাপারে মাহিরের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ কর্নেল আবু নাসের মো. তোহা জানান, স্কুল থেকে কাওকে কোন খুদে বার্তা পাঠানো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে মাহমুদা খানমের মুঠোফোনটি পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছে, তারা কোনো খুদে বার্তা পাঠায়নি। বাবুল আক্তারকে হুমকি দিয়ে কেউ কোনো চিঠি দেয়নি বলে সিটিজিবার্তা২৪.কম কে জানান পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, পুলিশের পরিবারের সদস্যদের বাড়তি নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ওআর নিজাম রোডের ওই বাসা বদলে ফেলার ইচ্ছার কথাও এক প্রতিবেশীকে বলেছিলেন মিতু।
মোটরসাইকেল থেকে আলামত পাওয়া গেছে!
গতকাল সকালে দুই ঘণ্টা ধরে মোটরসাইকেলটি পর্যবেক্ষণ করে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম। তারা মোটরসাইকেলে একটি হেলমেট ও একটি মাস্ক পান। এ ছাড়া মোটরসাইকেল থেকে পাওয়া যায় তিনটি চুল।
ডিএনএ পরীক্ষার জন্য এরই মধ্যে চুল সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সিআইডির পরিদর্শক মিতোশ্রী বড়ূয়া।
তিনি আরও বলেন, ‘মোটরসাইকেল থেকে আরও অনেক কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আলামতগুলো পরীক্ষা করে মোটরসাইকেলের ব্যবহারকারীদের ব্যাপারে জানা যাবে।’
সন্দেহের তলিকায় জামাত-শিবির!
মিতু হত্যায় জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশসহ সব জঙ্গি সংগঠনের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররাও জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকা শুলকবহর থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের পর এবং বাবুল আক্তারের অতীতের জঙ্গি ও নাশকতাবিরোধী অভিযান বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, ‘পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, খুনিরা মোটরসাইকেল নিয়ে জিইসি এলাকার ঘটনাস্থল থেকে গোলপাহাড় মোড়-কাতালগঞ্জ হয়ে বাদুড়তলা পর্যন্ত গেছেন। এলাকাটি জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত। নিজেদের নিরাপদ মনে না করলে খুনিরা কীভাবে ওই এলাকা দিয়ে পালাতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘শিবিরের প্রাক্তন কর্মীরাই এখন জেএমবিতে যোগ দিয়েছে। তাই এ খুনের ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
তদন্ত প্রসঙ্গে সিএমপি পুলিশ কমিশনার!
তদন্তে আজ মঙ্গলবারের মধ্যে বড় অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন সিএমপি কমিশনার। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খুনের ঘটনায় চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের আটক কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনে এই মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে।
কিসের ভিত্তিতে চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় দেখা ভিডিওচিত্রের সঙ্গে তাঁদের অবয়বের কিছুটা মিল থাকতে পারে। অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদ শেষে চারজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়
চারজনের পরিচয় কী, তাদের কোথা থেকে কখন ধরা হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করেননি পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে কিছু বলা যাবে না। পরে প্রয়োজন হলে আটক দেখিয়ে নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হবে।’
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনকে চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, এটিকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। দেশবাসী ও আমার পুলিশ সদস্যদের জন্যও এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন জরুরী হয়ে পড়েছে। এটি একটি ক্যাচি অ্যান্ড টাসি ইস্যু। এর রহস্য উদঘাটন আমরা করবই।
মঙ্গলবারের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে দাবি করে বাবুল আক্তারের সাবেক এ বস বলেন, ইতোমধ্যে আমরা মোটর সাইকেলটি উদ্ধার করেছি। সেটির মালিকানা যাচাই চলছে।
ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সব মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা সারা চট্টগ্রাম শহরের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছি। মোটর সাইকেলটি কোথায় থেকে রওনা হয়েছে। আর কোন দিক দিয়ে শুলকবহরে এসেছে সেটি আমরা জানার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে, কালকের মধ্যে কিছু একটা আপনাদের সামনে বলতে পারব।

